
রয়টার্স
- জ্বালানি সমঝোতায় অসন্তুষ্ট ইউক্রেন
- ডিজেল ছাড়ের পরই ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ১২
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি অনুযায়ী, মস্কো অবিলম্বে বিশ্ববাজারে তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ শুরু করবে। এরপর আগামী নভেম্বরে আরো পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী ধাপে অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, এই পদক্ষেপের ফলে আমেরিকানদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ডিজেলের দাম দ্রুত ও রেকর্ড পরিমাণে কমে আসবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ার জ্বালানি প্রবেশে অনুমোদন দিয়ে একটি সাময়িক লাইসেন্স জারি করে। ইরানের সাথে সামরিক সঙ্ঘাত শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ চাপে পড়ে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দল। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) হিসাব মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেল বিকোচ্ছে ৬ দশমিক ২৮ ডলারে, যা সেপ্টেম্বরের শেষভাগে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছিল।
দ্বিপক্ষীয় এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি উল্লেখ করেন, ডিজেল ও সার্বিক জ্বালানি খাতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অন্য দিকে এ উদ্যোগের তীব্র সমালচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ক্রেমলিনের ওপর থেকে বিধিনিষেধ শিথিল করে এভাবে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ করে দেয়া কার্যত মস্কোর হাতকেই শক্তিশালী করবে এবং চলমান সঙ্ঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে। তার মতে, পুতিনকে এমন সুবিধা দিয়ে কখনো শান্তি আনা সম্ভব নয়; বরং সংগৃহীত অর্থ দিয়ে রাশিয়া সহিংসতার মাত্রা আরো বাড়াবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ডিজেল উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।
পুতিন-ট্রাম্প জ্বালানি সমঝোতায় অসন্তুষ্ট ইউক্রেন : পুতিন-ট্রাম্প জ্বালানি সমঝোতায় যুদ্ধ চলাকালে মস্কোকে এমন বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্তকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছে ইউক্রেন। এই সমঝোতার খবরে ইউক্রেনজুড়ে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কিয়েভের আশঙ্কা, ক্রেমলিনের ওপর এই আন্তর্জাতিক ছাড় মস্কোর যুদ্ধ তহবিলকে নতুন করে পুষ্ট করবে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পদক্ষেপে গভীর হতাশা প্রকাশ করে একে শক্তিশালী মিত্রদের একটি দুর্বল অবস্থান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, এই সুযোগ পুতিনকে ইউক্রেনীয়দের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিপীড়ন ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতেই সহায়তা করবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনীয়দের ওপর মস্কোর বিমান হামলা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের অপ্রতুলতার সুযোগ নিয়ে চালানো এসব হামলায় বেসামরিক প্রাণহানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে; সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনের এক বাসস্টপে হামলাতেই ৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামরিক হামলা কমানোর আহ্বান উপেক্ষা করেই চলতি সপ্তাহেও রাশিয়ার ৪টি তেল শোধনাগারে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এই সমঝোতার সময়কাল নিয়েও বড় ধরনের কূটনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল যখন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ফ্লোরিডার মায়ামিতে অবস্থান করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশিংটন-ক্রেমলিন শীর্ষ সংলাপ সম্পন্ন হলো। জেলেনস্কির মতে, কিয়েভের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে ক্রেমলিন প্রধানের সাথে এমন বাণিজ্যিক সমঝোতা আন্তর্জাতিক টেবিলে ইউক্রেনের অবস্থানকে ক্ষুণœ করে।
ট্রাম্পের ডিজেল ছাড়ের পরই ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ১২ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কোর ওপর থেকে ডিজেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানোর পরপরই ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিল্প নগরী জাপোরিজ্জিয়ায় রাশিয়ার প্রাণঘাতী হামলায় তিন শিশুসহ ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল শনিবার ভোরে শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায় একযোগে বর্ষিত গ্লাইড বোমার আঘাতে একটি বহুতল আবাসিক ভবনের একাংশ ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। খবর রয়টার্সের। উদ্ধারকর্মীরা ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে ছয় বছর বয়সী এক কন্যা সন্তানের লাশ সাদা ব্যাগে মুড়িয়ে বের করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বৃদ্ধ দাদা আনাতোলি চমনিয়, যার চলতি মাসের শেষে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া বাসিন্দাদের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদের মধ্য দিয়েই উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয় এবং হামলায় আরো ১৪ জন মারাত্মকভাবে আহত হন। যুদ্ধরেখা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আক্রমণের মুখে থাকলেও সম্প্রতি এর তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুদিনের রুদ্র হামলায় প্রায় ৮০ জন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারান।
এই ভয়াবহ হামলার পর হোয়াইট হাউজের গৃহীত নীতির বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দেয়ার পুরস্কার হিসেবে রাশিয়া জাপোরিজ্জিয়ার নিরীহ নাগরিকদের ওপর পাঁচ-পাঁচটি বোমা ফেলে তার জবাব দিলো। মস্কোর প্রতি যেকোনো শিথিল মনোভাবকে তারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সঙ্কেত হিসেবে গ্রহণ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মূলত ইরানের সাথে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে মার্কিন বাজারে পেট্রোলিয়ামের দাম অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতেই ট্রাম্পের প্রশাসন রাশিয়ার ডিজেল রফতানির ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেছে। তবে মস্কোকে সংলাপে বাধ্য করতে চাপ আরো বাড়ানোর পক্ষে ছিল কিয়েভ। ট্রাম্প এর আগে ইউক্রেন কর্তৃক রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, যা তার মতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বিপরীতে কিয়েভ উভয় পক্ষের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, বিশেষ করে যখন একের পর এক রুশ আঘাতে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজধানী কিয়েভের মেট্রো চলাচল চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। সঙ্কট নিরসনে মিয়ামিতে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের সাথে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলের কূটনৈতিক বৈঠক চলাকালেই ট্রাম্প আকস্মিকভাবে এই চুক্তির কথা জানান, যা কিয়েভকে হতভম্ব করে দেয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনার পরও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সাফ জানিয়েছেন যে, মস্কোয় ইউক্রেনীয় ড্রোন আক্রমণের কারণে এই মুহূর্তে শান্তি আলোচনা পুনরারম্ভের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দিকে পূর্ব ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রিত লুহানস্কে ইউক্রেনীয় হামলায় চারজন নাগরিকের মৃত্যু এবং পাঁচজন আহত হওয়ার দাবি করেছে স্থানীয় রুশ প্রশাসন, যদিও কিয়েভের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








