
মো: আজিজুল হক গাজীপুর
গাজীপুরের কাপাসিয়ার ধাঁধার চরে রেকর্ডভুক্ত কৃষিজমির ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ, খাজনা ও নামজারি কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় একই মৌজার ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আবেদন করেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। খাসজমির তালিকায় নদী, বালুচর ও নালা শ্রেণীর জমি থাকায় প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব এবং বন্দোবস্তযোগ্য জমির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধাঁধার চর মৌজার শতাধিক কৃষক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে গিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ চালুর দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত জমির খাজনা-খারিজ এবং ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, পাশাপাশি জমির মালিকরা স্বাভাবিক ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়ছেন।
কৃষকরা জানান, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন, ব্যক্তিমালিকানাধীন রেকর্ডভুক্ত জমির রাজস্ব কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও একই মৌজার বিপুল পরিমাণ খাসজমি বেসরকারি প্রকল্পে বন্দোবস্ত দেয়ার উদ্যোগ কেন নেয়া হচ্ছে? এ জটিলতার পেছনে প্রকল্পের আবেদনকারীর কোনো প্রভাব বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন কেউ কেউ। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ধাঁধার চর মৌজার ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর অকৃষি খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে একটি আবেদন যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।
দুর্গাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নূর আলম বলেন, ধাঁধার চরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমি খাস। ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতজমি ও সরকারি খাসজমির সীমানা নির্ধারণ বা ডিমার্কেশন না থাকায় তার দায়িত্ব নেয়ার আগ থেকেই রাজস্ব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে খাজনা বন্ধের সাথে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আবেদনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ধাঁধার চর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে নদী শ্রেণীর ৩০ দশমিক ৯৫ একর, বালুচর ১৩ দশমিক ৫৩ একর, সিকস্তি ৪৩ দশমিক ৬ একর এবং নালা শ্রেণীর জমি ১৫২ দশমিক ৪৪ একর। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা শেষে এসব জমির বড় অংশে ধান, আলু, শাকসবজি, পেয়ারা, কলা ও লেবুসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়।
শীতলক্ষ্যা ও পুরনো ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে পলি জমে গড়ে ওঠা প্রায় ২৫০ একর আয়তনের ধাঁধার চর চার পাশে নদীবেষ্টিত সবুজ ভূমি। এখানে রয়েছে গাছপালা, ঝোপঝাড়, পাখি, সরীসৃপ ও দেশীয় উদ্ভিদের আবাসস্থল। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো: মনির হোসেন বলেন, ধাঁধার চরে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ, দেশীয় উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার প্রস্তাব, চরটি বেসরকারি বন্দোবস্তের পরিবর্তে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো: সালাহউদ্দিন আইয়ূবী জাতীয় সংসদে ধাঁধার চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে গাছপালা কাটা পড়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৯৯৫ সালের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালায় নদী, খাল, নালা, জনগণের ব্যবহার্য রাস্তা, পুকুর, বাঁধ, কবরস্থান, পার্ক ও খেলার মাঠসহ নির্দিষ্ট শ্রেণীর জমি বন্দোবস্তের বাইরে রাখার বিধান রয়েছে। ফলে ধাঁধার চরের কোন জমি বন্দোবস্তযোগ্য আর কোনটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: নাহিদুল হক বলেন, খাস খতিয়ানের তথ্যানুযায়ী, ধাঁধার চরের জমির শ্রেণী নদী, শিকস্তি, নালা, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত। প্রকল্পের আবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
কৃষকদের দাবি, আগে রেকর্ডভুক্ত জমির ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ চালু এবং সরকারি খাস ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এর পরই চরের ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। তাদের মতে, বিষয়টি শুধু রাজস্ব আদায়ের নয়, এর সাথে কৃষকদের জমির অধিকার, সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নদী-নালার সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নও জড়িত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








