উপকূলীয় বনের সৌন্দর্য ছৈলাফুল
উপকূলীয় বনের সৌন্দর্য ছৈলাফুল।

রফিকুল হায়দার ফরহাদ

Advertisement

ছৈলাফুল। বাংলাদেশের উপকূলীয় বনাঞ্চলের অন্যতম সুন্দর ফুল এটি। প্রথম এ ফুলের সাথে পরিচয় ২০২৩ সালের শুরুতে ভোলার চরফ্যাসনের বিখ্যাত পর্যটন স্পট চর কুকরি মুকরিতে। ফোটার অপেক্ষায় থাকা একটি কলি ভেঙে আমাকে এ ফুল সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দিলেন স্থানীয় একজন।  কলির গোড়ার অংশ ভেঙে কিছুটা খেলেন সে ব্যক্তি।  বললেন খেতে মিষ্টি। তবে ফুলটি আর আমার দেখার সুযোগ হয়নি। ফুল দেখানোর জন্য নিয়ে গেলেন বনের অন্য অংশে। সেখানে অবশ্য ততক্ষণে কলি থেকে ব্রাশের মতো থাকা দণ্ডগুলো ঝরে পড়েছে। এর ফলও বা কেমন সেটাও দেখা হয়নি। তবে শুনেছি এ ফলটি পাকলে স্থানীয়রা লবণ মরিচ দিয়ে বানিয়ে খায়। কিন্তু পরিপূর্ণ ছৈলা ফল দেখার সুযোগ হচ্ছিল না। আসলে এ ছৈলা ফল যখন বনের গাছে ধরে তখন আর যাওয়া হচ্ছিল না।  আবার যেখানে বনের সব জায়গায় ছৈলা ফল ধরে সেখানেও যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। শেষ পর্যন্ত এ বছর জানুয়ারিতে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজের সামনে তপসীর চরে দেখা পেলাম এ ছৈলা ফল। ক্যারিং বোটের মালিক শহীদুল ইসলাম  এ ছৈলা গাছের সন্ধান দিলেন। স্রেফ এ ছৈলা ফল দেখার জন্যই চর হেয়ার থেকে তপসীর চরে যাওয়া। পরে অবশ্য দেখলাম চর মোন্তাজের স্লুুইজের গেটের পাশে সাথী ভাইয়ের হোটেলের সাথে খালের পাড়ে একটি ছৈলা গাছ। যেখানে ফলও ধরেছে। এখন সে গাছটি আর নেই। কেটে ফেলা হয়েছে।
এ ছৈলা ফল স্বাদে টক। পাকলে স্থানীয় মানুষ এ ফল খায় লবণ মরিচ দিয়ে। আবার টক রান্না করেও খাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন উপকূলীয় এলাকার মানুষরা। ঠিক কেওড়া ফলেরই মতো দেখতে এ ফল। কেওড়া সাইজে হয় আমলকির মতো। আর ছৈলা আরো বড়। বড় সাইজের চেপ্টা টমেটোর মতো। আবার অনেকটা বড় ডুমুর ফলের মতোও দেখতে। বানরেও প্রিয় খাবার এ ছৈলা ফল। পাকার পর মাটিতে পড়লে মহিষও খায় এটি। গোলাকৃতির ছৈলা গাছের পাতা হরিণেরও প্রিয়। বানর এ গাছের পাতা যখন গাছ থেকে ছিঁড়ে নিচে ফেলে তখন হরিণ তা খায়। ফলগুলো যখন গাছে থাকে তখন বেশ দৃষ্টিনন্দন। তবে সবচেয়ে সুন্দর এ ফুল। উপকূলীয় বনের অন্যতম সুন্দর ফুল এটি। বলই ফুল, করমজা ফুল, পশুর গাছের ফুলের মতোই সুন্দর এ ছৈলা ফুল। মৌমাছির মধু সংগ্রহের অন্যতম উৎস এ ছৈলা ফুল।
উপকূলীয় ভূমি রক্ষার জন্য এ ছৈলা গাছ বেশ কার্যকরী। এর শেকড় মাটির বেশ গভীরে চলে যায়। ফলে ঝড়ে উপড়ে পড়ে না। তবে এ গাছের কাঠ ততোটা টেকসই নয়।  ছৈলা ফুলের কলি বেশ শক্ত ও মোটা। ফুলের কলি ঠিক কুল বরই এর মতো সাইজের। ফোটা ফুলে পাপড়ির বদলে ব্রাশের মতো অসংখ্য দণ্ড থাকে। মাঝে বড় একটি দণ্ড থাকে। ফল বড় হওয়ার সাথে সাথে অন্য দণ্ডগুলো খসে পড়ে গেলেও বড় দণ্ডটি ফুলের সাথেই লেগে থাকে। সাদা আর গোলাপি রঙের মিশ্রণ থাকে এ দণ্ডতে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হয় ছৈলা গাছে ফুল ফোটা। ডিসেম্বর মাসেও এর ফুল ফোটে। জানুয়ারি মাস পর্যন্ত থাকে এর ফল গাছে পাওয়া যায়। এ তথ্য দিয়েছেন রাঙ্গাবালির চর মোন্তাজের লোকজন। তবে চর কুকরি মুকরির রাশেদ হাওলাদার তথ্য দেন, তাদের এলাকায় দফায় দফায় এ ছৈলা ফুল ফোটে। জুন মাসে শুরু হয় এ ফুল ফোটা। ডিসেম্বর- জানুয়ারিতেও ফুল ফোটে। মাঝারি ধরনের চির সবুজ গাছ এ ছৈলা।  ছৈলা গাছের বাকল ধূসর ও বাদামি। গাছের উচ্চতা ১৫-২০ মিটারের মতো। ফলটি কচি অবস্থায় সবুজ থাকে। পাকলে হালকা হলুদ রং ধারণ করে। ফলটি মানুষও খায়। রাশেদ হাওলাদার জানান, পাকার পর আমরা পুরো ফলটিই লবণ মরিচ দিয়ে ভর্তা করে এর পর খাই।’ ফলের ভেতরে বিচি থাকে। উপকূলীয় নদী ও খালের ধারে জন্মায় এ গাছ। ভূমি রক্ষার্থে বিশেষ কার্যকরী এ ছৈলা গাছ। কাচা অবস্থায় তিতা লাগে এ ফল। যে গাছ পানির ধারে থাকে সে গাছের ফুল দেরিতে আসে। আর যে গাছ অপেক্ষাকৃত শুষ্ক স্থানে থাকে সে গাছে ফুল আগে ফোটে। জানান চর মোন্তাজের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম।