বিষাক্ত নদীর পাড়ে পিপাসার্ত ঢাকা
বিষাক্ত নদীর পাড়ে পিপাসার্ত ঢাকা।

  আব্দুল কাইয়ুম

Advertisement
  •  শিল্পবর্জ্যে রুদ্ধ ৪ নদী, দিনে পড়ছে ৩৩০ টন বর্জ্য
  •  তৈরি হচ্ছে নিরাপদ পানির তীব্র সঙ্কট
  •  ভূগর্ভের পানি নেমেছে ১০৯ মিটার গভীরে

রাজধানী ঢাকার দুই কোটি মানুষের নিত্যদিনের পানির হাহাকারকে দীর্ঘদিন ধরে কেবল ‘সরবরাহ ও বিতরণের ঘাটতি’ হিসেবে দেখে আসছে কর্তৃপক্ষ। কোথাও কলের পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ, কোথাও ঘোলাটে বা হলুদাভ তরল, আবার কোথাও ড্রেনের নোংরা পানির সংমিশ্রণ। সঙ্কট মেটাতে একের পর এক গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে পাম্পের সক্ষমতা এবং নেয়া হয়েছে হাজার কোটি টাকার ব্যয়বহুল শোধনাগার প্রকল্প। কিন্তু পর্দার আড়ালের মূল সত্যটি হলো- ঢাকার বর্তমান পানি সঙ্কট শুধু স্বল্পতার বিষয় নয়; এটি একই সাথে সুপরিকল্পিতভাবে রাজধানীতে পানির সব ক’টি প্রাকৃতিক উৎস চিরতরে নষ্ট করে ফেলার এক আত্মঘাতী বাস্তবতা। 
সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাজধানীর চারপাশ ঘিরে থাকা প্রাণপ্রকৃতির চার ধমনি- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রতিদিন পড়ছে প্রায় তিন লাখ ৩০ হাজার কেজি বা ৩৩০ টন কঠিন ও তরল বর্জ্য। নদীগুলোর তীরে চিহ্নিত ৪২৪টি প্রকাশ্য বর্জ্য নিঃসরণ পয়েন্ট দিয়ে দিনরাত এই বিষাক্ত বর্জ্য নামছে। অথচ নদীদূষণ ঠেকাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর অভিযান, কোটি কোটি টাকার জরিমানা কিংবা আদালত থেকে ইউটিলিটি সংযোগ কাটার নির্দেশের পরও বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা বন্ধ হচ্ছে না। 
আবার নদী মেরে ফেলে বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি তুলতে গিয়ে পাতালকে করা হয়েছে শূন্য। এক দিকে নদীগুলো শিল্পবর্জ্যরে নর্দমায় রূপ নিয়েছে, অন্য দিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গিয়ে মাটির ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জনস্বাস্থ্যকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক যৌথ সমীক্ষায় ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে বর্জ্য প্রবেশের একটি সুস্পষ্ট মানচিত্রে দেখা গেছে, নদীগুলোর তীরে মোট ৪২৪টি স্থায়ী বর্জ্য নিঃসরণ কেন্দ্র বা আউটলেট সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪টি সরাসরি ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্পকারখানার সাথে যুক্ত। বাকি পথগুলোর মাধ্যমে সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ড্রেন দিয়ে বর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। 
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদী সবচেয়ে দূষিত ও সঙ্কটাপন্ন, শুধু এই নদীটিতেই ১৬৬টি বর্জ্য নিঃসরণ পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ওয়াসারই ৫৭টি প্রধান নর্দমা সরাসরি বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য ফেলছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৯টি নর্দমা এবং পোস্তগোলা ক্যান্টনমেন্টের দু’টি নালা বুড়িগঙ্গার সাথে সরাসরি যুক্ত। স্থানীয় সরকারের আওতায় কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি, কালিন্দীর দু’টি, শাক্তের দু’টি এবং জিনজিরার একটি নালা দিয়ে প্রতিদিন অবিরত বর্জ্য নামছে এই নদীতে।
তুরাগ নদীতে ৫৮টি বর্জ্য নিঃসরণস্থল চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা পরিচালিত নয়টি ড্রেন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৫টি প্রধান নর্দমা গিয়ে পড়েছে তুরাগে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চারটি নর্দমা, কৌন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি নালা এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বড় নর্দমা তুরাগের মূল প্রবাহে অপরিশোধিত বিষ ঢালছে। এ ছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩৭টি ড্রেন সরাসরি অপরিশোধিত পয়ঃ ও শিল্পবর্জ্য ফেলছে। অন্য দিকে বালু ও ধলেশ্বরী নদী শিল্পাঞ্চলের ড্রেন ছাড়াও গাজীপুর ও টঙ্গী খালের শত শত সংযোগ দিয়ে অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য নিয়মিত এই নদীগুলোতে গিয়ে মিশছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, নদীতে প্রতিদিন যে ৩৩০ টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত ক্ষতিকর বর্জ্য। ঢাকার নদীদূষণের প্রায় ৬০ শতাংশের সরাসরি উৎস বিভিন্ন শিল্পকারখানা। এ ছাড়া প্রায় ৩০ শতাংশ দূষণ আসে ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর পরিচালিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং বাকি ১০ শতাংশের উৎস গৃহস্থালির কঠিন বর্জ্য ও নৌযান।
এ দিকে ঢাকার নদীগুলোর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। বিআইডব্লিউটিএর একটি কর্মপরিকল্পনায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, এই সাত হাজার কারখানার প্রায় ৯৯ শতাংশেরই কোনো বর্জ্য শোধন কেন্দ্র বা ইটিপি নেই। যেসব কারখানায় নামকাওয়াস্তে ইটিপি রয়েছে, সেগুলোর একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ বিল ও রাসায়নিক খরচ বাঁচাতে কেবল পরিদর্শনের সময় চালু রাখে এবং রাতের আঁধারে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য গোপন পাইপ দিয়ে নিকটস্থ খাল ও নদীতে ফেলে দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদফতরের আইনি পদক্ষেপের পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে ভারী মনে হলেও বাস্তবে তা অপরাধ দমনে কার্যকর কোনো ভয় তৈরি করতে পারছে না। পরিবেশ অধিদফতর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মামলা এবং প্রায় কোটি কোটি টাকা জরিমানা আদায় করছে। কিন্তু বারবার একই অপরাধ করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রথমবারের অপরাধীর চেয়ে বেশি কঠোর শাস্তি দেয়ার কোনো নজির বা কঠোর বিধান প্রয়োগ করা হয় না। ফলে শিল্পমালিকদের কাছে লাখ টাকার জরিমানা প্রদান করা কার্যত এক ধরনের ‘দূষণের ছাড়পত্র’ বা নামমাত্র পরিচালন ব্যয়ে পরিণত হয়েছে। জরিমানা দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ থাকায় তারা কোটি টাকার ইটিপি প্ল্যান্ট সার্বক্ষণিক চালু রাখার প্রয়োজন বোধ করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উপরিভাগের পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠায় বিকল্প হিসেবে ঢাকা ওয়াসা দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচের পানির ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই নির্ভরতা এখন শহরটিকে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ঢাকা ওয়াসার তথ্য মতে, রাজধানীর সরবরাহকৃত পানির প্রায় ৭৪ শতাংশ এখনো ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে এবং মাত্র ২৬ শতাংশ আসে শোধিত পৃষ্ঠজল থেকে। ২০০১ সালে যেখানে ঢাকার মাটির নিচে পানির স্তর ছিল গড়ে প্রায় ৪০ মিটার গভীরে, ২০২৪ সালে তা নেমে গেছে ১০৯ মিটারেরও বেশি গভীরে। শহরের কিছু কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। 
তা ছাড়া শুষ্ক বা গ্রীষ্ম মৌসুমে ঢাকা শহরে দৈনিক পানির চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩২৫ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ঢাকা ওয়াসা উৎপাদন করতে পারে মাত্র ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি লিটার পানির তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়। রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা কার্যকর সুয়ারেজ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এ ছাড়া এক গবেষণায় ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ লাইনে ক্ষতিকর জীবাণু দূষণের প্রমাণ মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের প্রত্যক্ষ কারণ অনিরাপদ ও দূষিত পানি। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দিতে পারলে নাগরিকরা ৭৫ শতাংশ পানিবাহিত রোগ  ও বিপুল আর্থিক চিকিৎসা ব্যয় থেকে রক্ষা পেত।
এ দিকে মেঘনা নদী থেকে পানি এনে শোধনের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট’-এর আওতায় নারায়ণগঞ্জের গন্ধর্বপুরে তৈরি হচ্ছে বিশালাকার শোধনাগার। প্রকল্পটির দু’টি ধাপ সম্পন্ন হলে এটি থেকে প্রতিদিন ১০০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি ঢাকায় সরবরাহ করার কথা রয়েছে। রাজধানীর পানিসঙ্কট নিরসনে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করছে ডেনমার্ক সরকার। তবে পরিবেশবিদদের সাফ কথা- যত বড় শোধনাগারই বানানো হোক না কেন, নদীর পানি বিষাক্ত হতে থাকলে শোধন ব্যয় কেবল বাড়তেই থাকবে। 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং সুয়ারেজ বর্জ্য- এই দুই ধরনের বর্জ্য আমাদের ঢাকার সব খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস করে দিয়েছে। আর সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, যা আমরা আগে বুঝতে পারিনি, দূষণ এখন কেবল নদীর ওপরের পানিতে সীমাবদ্ধ নেই; আমাদের ভূগর্ভস্থ পানিতেও এই দূষণ বহুলাংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পানি দূষণ যদি আমরা অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে আমাদের পুরো পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্য এক মারাত্মক বিপর্যয় বা ঝুঁকির (জিওপার্টি) মধ্যে পড়ে যাবে। শিল্পমালিকদের বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করতে কিংবা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম অনীহা দেখা যায়। কোনো সরকারই শক্ত হাতে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে পারেনি।  
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়া নিয়ে তিনি বলেন, আমরা যখন ভূপৃষ্ঠের খাল, জলাশয় ও নদীগুলো নষ্ট করে ফেললাম, তখন বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে ভূপৃষ্ঠের পানি শোধনের উদ্যোগ বাদ দিয়ে আরো গভীর নলকূপ বসাচ্ছি, ফলে পানি আরো গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নদীগুলোর পানি এতটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে যে সাধারণ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট দিয়ে শোধন করলেও অনেক রোগজীবাণু থেকে যায়, যা দূর করা সম্ভব হয় না। নগরীতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি যে তাদের নিজস্ব সেপটিক ট্যাংক থাকবে নাকি তারা ওয়াসার লাইনের ওপর নির্ভর করবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও কোনো সরকারই শিল্পমালিকদের বাধ্য করতে পারেনি যে- হয় ইটিপি চালাও, না হলে কারখানা বন্ধ কর। জনস্বাস্থ্যকে জিম্মি রেখে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফলপ্রসূ হতে পারে না। ওয়াসা নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে বর্জ্যের ভাগাড় বানিয়ে রেখে শত মাইল দূরবর্তী পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে পানি আনার মতো অসম্ভব ব্যয়বহুল মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করছে। অথচ চারপাশের নদীর দূষণ বন্ধ না করে দূর থেকে পানি আনার এই কৌশল কোনো টেকসই সমাধান নয়; এতে কেবল প্রকল্প ব্যয় ও পানির উৎপাদন খরচই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে।