সুরক্ষিত হচ্ছে বোয়ালখালী, চাষের আওতায় আসবে ফটিকছড়ির সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমি
সুরক্ষিত হচ্ছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী। ইনসেটে ক্ষতিগ্রস্ত ফটিকছড়ির বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিষ্কাশন সেচ প্রকল্পের অবকাকাঠামো : নয়া দিগন্ত।

এস এম রহমান পটিয়া চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

Advertisement

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে এবার সুরক্ষিত হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী ও অসংখ্য খাল বেষ্টিত চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা। ৪৫ বছর পরে আবার চাষের আওতায় আসবে হালদা নদী ও ধুরুং নদী বেষ্টিত ফটিছড়ির প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমি। বাপাউবোর চলমান বোয়ালখালী টেকসই প্রতিরক্ষা প্রকল্প ও প্রণয়নকৃত ফটিকছড়ির বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সুরক্ষিত হবে সমগ্র বোয়ালখালী উপজেলা এবং চাষে আওতায় আসবে অনাবাদি জমি এবং সুরক্ষিত হবে ফটিকছড়ি। এমনটাই প্রত্যাশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। আর এ দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৬৬১ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের বোয়াখালী উপজেলা : উপজেলা টেকসই সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১৪৩ কোটি টাকা এবং প্রস্তাবিত আরো ২১ কোটি টাকা। বর্তমানে নদী বেষ্টিত এ উপজেলার আয়ন ১৩৭.২৭ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা রয়েছে ২,৫৮,৬৮৮ জনের বেশি (২০২২ গণনা মতে)। চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পূর্বে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত এ উপজেলা। এর উত্তরে ও পশ্চিমে কর্ণফুলী নদী, দক্ষিণে পটিয়া উপজেলা এবং পূর্বে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অবস্থান। কর্ণফুলী নদী ছাড়াও এ উপজেলা ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বান্দরবানের করলডেঙ্গা পাহাড় থেকে সৃষ্ট ছন্দরীয়া খাল, রাইখালী খাল, ভারাম্বা খাল, ভাণ্ডালজুড়ি খাল, নূর মাঝির খাল, চোরাখালী খাল, কাটাখালী ও বেইচ্চাখালী খাল, বুড়ির মার খাল ও মর্দনা খাল। বর্ষায় এসব খাল ও নদী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে নদী ও খালের পাড় ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়ে বন্যায় প্লাবিত হয়ে আসছে বোয়ালখালী উপজেলা। বর্তমানে এ উপজেলা সুরক্ষায় ১৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ চলমান রয়েছে। যার অগ্রগতি প্রায় ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদী ও খাল বেষ্টিত বোয়ালখালী উপজেলা টেকসইভাবে সুরক্ষিত হবে সেই সাথে সরকারি-বেসরকারিভাবে গড়ে উঠতে পারে নয়াভিরাম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে। 
চলমান কাজের মধ্যে রয়েছে- কর্ণফুলী নদীর বাম তীর রক্ষায় ১.৮৫৫ কিমি. প্রতিরক্ষা, বোয়ালখালী খালের উভয় তীর রক্ষায় ১.৯৪০ কিমি. তীর প্রতিরক্ষা, রাইখালী খালের উভয় তীর রক্ষায় ১.৭০০ কিমি. তীর প্রতিরক্ষা, ছন্দরীয়া খালের উভয় তীর রক্ষায় ১.২৫৫ কিমি. তীর প্রতিরক্ষা, ভারাম্বা খালের উভয় তীর রক্ষায় ০.৭০০ কিমি. তীর প্রতিরক্ষা কাজ চলমান রয়েছে। 
পাশাপাশি চলমান বাস্তবায়িত কাজ আরো সুরক্ষিত হওয়ার জন্য মাত্র ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নে শেখপাড়া সংলগ্ন ২৫০ মিটার ছন্দরীয়া খালের উভয় তীরে বিনয়বাঁশী এলাকায় ৮০ মিটার বড়–য়াপাড়া এলাকায় ১৩০ মিটার এবং নওয়াব আলী সংলগ্ন ১২০ মিটার, রাইখালী খালের ডান তীরে মোনাফের ব্রিজ থেকে লাল মোহাম্মদ তালুকদার পাড়া পর্যন্ত ২০০ মিটার, ভারাম্বা খালের বাম তীরে জেলেপাড়া ও চেয়ারম্যানবাড়ী সংলগ্ন ২০০মিটার এবং দুমুখো ডান তীরে ২০০ মিটারসহ মোট ১১৮০ মিটার তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ বাস্তবায়ন করার করা জন্য সুপারিশ করা হয়েছে এবং তা পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আর এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সুরক্ষিত হবে সমগ্র  উপজেলা এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাপাউবো চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, চলমান কাজ প্রায় ৭৫ ভাগ শেষ হয়েছে। তিনি জানান, কাজের মূল লক্ষ্যই ছিল বোয়ালখালীকে টেকসই সুরক্ষিত করা। সেই লক্ষ্যে দ্রুত প্রকল্পের এগিয়ে চলছে বলে জানান।
ফেনী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তর সীমান্তে (বিশেষ করে বাগানবাজার ও দাঁতমারা ইউনিয়নে) ফেনী নদীর প্রভাব পড়ে। বর্ষাকালে ফেনী নদীর উজানের অতিরিক্ত পানি ও পাহাড়ি ঢল ফটিকছড়ির উত্তর অঞ্চলের বিভিন্ন খাল ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। ত্রিপুরার পাহাড় থেকে অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া নেমে এসে ফটিকছড়ির প্রধান নদী হালদা এবং ধুরুং খালের সাথে মিশেছে।
বর্ষাকালে ভারতের ত্রিপুরা ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হলে এই ফেনী নদী এবং সীমান্ত অঞ্চলের পাহাড়ি ছড়াগুলো দিয়ে আরো তীব্র গতিতে ঢল নেমে ফটিকছড়ির বাগানবাজার, দাঁতমারা ও চিকনছড়াসহ আশেপাশের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে প্রায় মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা এবং এতে বছরের পর বছর ধরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়ে আসছে।
এ কারণে বাপাউবো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন ও সেচ কাঠামো পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ইতঃপূর্বে বাস্তবায়িত পাঁচটি উপ-সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন করে সেচসুবিধা ও নদী তীর প্রতিরক্ষার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষয়ক্ষতি  অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধ করছে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজের লক্ষ্য বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার বসতবাড়ি, বাজারঘাট বিস্তীর্ণ আবাদি জমিসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা রক্ষা করা। তাছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী প্রতিরোধের পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যমে স্থায়ীভাবে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা বলয় সুদৃঢ়করণ এবং দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার টেকসই উন্নয়ন সাধন করা এবং ভূউপরিস্থ পানির সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য চাষ বৃদ্ধি করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
সূত্রে জানা গেছে, ওই এলকা ধুরং উইয়্যারটি স্থাপনের কাজ ১৯৫৩ সালে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালে শেষ হয়। ওই প্রকল্পে একটি উইয়্যার, ২২.১৪ কিমি. সেচ খাল খনন (মরা ধুরং সেচ খাল), ১২টি চেক স্ট্রাকচার (আরডি) এবং মরা ধুরং খালের উজানে একটি রেগুলেটর (২ ভেন্ট) এবং ভাটিতে একটি রেগুলেটর (৩ ভেন্ট) নির্মাণ করা হয়েছিল। 
১৯৮০-৮১ সালে ফটিকছড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের আওতায় ফটিকছড়ি ছড়া খালে পানি ধারণ কাঠামো (১০-ভেন্ট), হারুয়াল ছড়ি খালে পানি ধারণ কাঠামো (৬-ভেন্ট), কুতুবছড়ি খালে পানি ধারণ কাঠামো (১০-ভেন্ট), লেলাং খালের উজানে পানি ধারণ কাঠামো (১০-ভেন্ট), লেলাং খালের ভাটিতে পানি ধারণ কাঠামো (১০-ভেন্ট), বারোমাসিয়া খালে পানি ধারণ কাঠামো (১০-ভেন্ট) এবং বিভিন্ন স্থানে ২৪টি আউটলেট নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮৪-৮৫ সালে ওই কাজ সমাপ্ত হয়।
এ ছাড়াও ওই প্রকল্পের অধীনে অভ্যন্তরীণ ছোট নদী ও খালগুলোর উভয় তীরে (তেলপাড়ি খাল গাইড বাঁধ হতে ফটিকছড়ি ছড়া, লেলাং খাল, বারোমাসিয়া খাল, বিনাজুরি খাল, গজারিয়া খাল, কুতুবছড়ি খাল পর্যন্ত) ৬৪.৩৬ কিমি. সম্পূর্ণ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ও হালদা নদীর উভয় তীরে ৩৭.১৭ কিমি. বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ, ৫৫.০০ কিমি. সেচ খাল পুনঃখনন এবং ৭৩.০০ কিমি. নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন করা হয়েছিল।  
৪৫ বছর পরে প্রকল্প প্রণয়ন : প্রায় ৪৫ বছর পরে বাপাউবো ফটিকছড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প প্রণয়ন করে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০৩ কোটি টাকা। প্রণয়নকৃত প্রকল্পের কাজের মধ্যে রয়েছে বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও উচ্চতা বৃদ্ধিকরণ ১০১.৫৩ কিলোমিটার, সেচ কাঠামো পুনর্নির্মাণ (পানি ধারণ কাঠামো)-৬টি এবং সেচ কাঠামো পুনর্বাসন-দুইটি সেচ কাঠামো মেরামত (পানি ধারণ কাঠামো-১২টি এবং হেড রেগুলেটর-একটি ও বাইপাস রেগুলেটর একটি), নিকাশ কাঠামো পুনর্নির্মাণ ২৪টি, সেচ খালে সিসি লাইনিং কাজ ২২ কিলোমিটার, খাল পুনর্খনন ১০টি ৭৫ কিলোমিটার এবং তীর সংরক্ষণ কাজ রয়েছে ৪.৮৭০ মিলোমিটার। 
বাপাউবো চট্টগ্রাম ডিভিশন-১ এর নির্বাটি প্রকৌশলী শওকত ঈবনে সায়ীদ বলেন, ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে স্থায়ীভাবে সেচসুবিধা গড়ে উঠবে।