৪ দিনের পতনের পর দ্বিতীয় দিনেও ঊর্ধ্বমুখী বাজার

 অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
টানা চার কার্যদিবসের দরপতনের পর গত বুধবার দেশের শেয়ারবাজারে যে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা গতকাল বজায় থাকলেও বাজারের গতি ছিল অনেকটাই মন্থর। গতকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ১১ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। দিন শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে। একই সাথে ডিএস-৩০ সূচক ৮ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১০৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক শূন্য দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৮৬ দশমিক ৯৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
তবে সূচকের এই উত্থানের সাথে লেনদেনের গতি বা শক্তি বাড়েনি। গতকাল ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৫৩৩ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যা আগের দিনের ৬০৪ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার তুলনায় প্রায় ৭২ কোটি টাকা কম। মোট ১৭ কোটি ৪৫ লাখ ৩২ হাজার ২৩টি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে এবং মোট লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ৫৯০টি। বাজারে ১৭১টি কোম্পানি ও ফান্ডের দর বাড়লেও কমেছে ১৫০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে বাকিগুলোর দর।
সূচক বাড়লেও অংশগ্রহণ সীমিত
বাজারের ব্রিডথ  বা অংশগ্রহণের চিত্র বলছে, উত্থান ব্যাপকভিত্তিক নয়। দরবৃদ্ধির তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দরপতনের চেয়ে মাত্র ২১টি বেশি। ফলে বাজারে কিছুটা ক্রয়চাপ থাকলেও তা এখনো শক্তিশালী ও সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেনি।
এর আগের দিন বুধবার ডিএসইএক্স ৩৯ দশমিক ২৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছিল। চার দিনের পতনের পর সেদিনের উত্থানকে মূলত দরপতনে থাকা শেয়ারে ‘বার্গেন হান্টিং’ বা কম দামে শেয়ার কেনার ফল হিসেবে দেখা হয়েছিল। গতকালকের তুলনামূলক ছোট উত্থান ইঙ্গিত দেয় যে বাজার এখনো ‘পতনের পর পুনরুদ্ধার’ পর্যায়ে রয়েছে; অর্থাৎ স্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় প্রবেশ করেছে- এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
সিরামিকে ঝলক, বিবিধ ও জুটে বড় উত্থান
গতকাল খাতভিত্তিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি উত্থান হয়েছে সিরামিক খাতে- ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া বিবিধ খাত ৫ দশমিক ২ শতাংশ, পাট ৪ শতাংশ এবং প্রকৌশলী খাত ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ১ দশমিক ১ শতাংশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং ব্যাংক খাত শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ ইতিবাচক ধারায় ছিল।
অন্য দিকে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের সূচক কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। পাশাপাশি টেক্সটাইল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যাল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং বীমা খাত শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পতনে শেষ হয়েছে। ফলে আজকের বাজারে খাতভিত্তিক প্রবণতা ছিল মিশ্র।
শীর্ষ গেইনারে বিডি ল্যাম্পস ও বেক্সিমকো
গতকাল ডিএসইর শীর্ষ গেইনার বা দরবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ ল্যাম্পস। কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে ছিল বেক্সিমকো ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, এসপি সিরামিকস ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ডিজিআইসি ৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ফার্স্ট প্রাইম মিনিস্টার ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
বিশেষ করে বেক্সিমকো ও এসপি সিরামিকসের শক্তিশালী উত্থান বাজারে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এসব শেয়ারের গতিকে পুরো বাজারের মৌলিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখার আগে লেনদেনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
লেনদেনের কেন্দ্রে ইটিএল ও বেক্সিমকো
দিনের লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশই নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে কেন্দ্রীভূত ছিল। বাজারভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী ইটিএল, বেক্সিমকো, আইপিডিসি, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, তুংহাই নিটিং, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এমএল ডাইং, এসপি সিরামিকস, সাইহাম টেক্সটাইল এবং আইএফআইসি ব্যাংক ছিল বেশি সক্রিয়। এর মধ্যে ইটিএলের লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং বেক্সিমকোর প্রায় ১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাজারে তারল্য সার্বিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এখনো নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
ডিএসই বনাম সিএসই
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বাজার ইতিবাচক ধারায় ছিল। আগের দিনের লেনদেনে সিএসইর সার্বিক সূচক ১০০ দশমিক ৩২ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ১৪ হাজার ৬৫৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে এবং নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়েছিল।
দুই বাজারেই সাম্প্রতিক পতনের পর পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা গেলেও ডিএসইর আজকের তুলনামূলক কম লেনদেনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বাজারে টেকসই ঊর্ধ্বগতির জন্য শুধু সূচক বাড়লেই হয় না, বরং লেনদেনের পরিমাণ ও বাজারের প্রশস্ততা- দু’টিই বৃদ্ধি পাওয়া জরুরি।
সামনে কোন বিষয়গুলো নজরে রাখা উচিত?
 সূচকের অবস্থান : আগামী কার্যদিবসগুলোতে ডিএসইএক্স সূচক ৫,৪৫০ থেকে ৫,৫০০ পয়েন্ট অঞ্চলের ওপর অবস্থান ধরে রাখতে পারে কি না, সেটি হবে মূল পরীক্ষা।
লেনদেনের গতি : দৈনিক লেনদেন পুনরায় ৬০০ কোটি টাকার ওপরে উন্নীত হয়ে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলে বর্তমান বাজার পুনরুদ্ধারের ভিত্তি আরো মজবুত হবে।
খাতভিত্তিক অংশগ্রহণ : ব্যাংক, প্রকৌশলী, জ্বালানি ও বড় মূলধনী শেয়ারগুলোতে সমন্বিত ক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা। কারণ আজকের উত্থানে সিরামিক, বিবিধ ও পাট খাত নেতৃত্ব দিলেও খাদ্য, টেক্সটাইল ও ফার্মা খাতে বিক্রয়চাপ বজায় ছিল।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বিনিয়োগকারীদের গুজবনির্ভর লেনদেন পরিহার করে মৌলভিত্তি, কারিগরি বিশ্লেষণ, সঠিক মূল্যস্তর এবং কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বাজারের সারসংক্ষেপ
গতকালকের বাজারের সার্বিক চিত্রটি হলো- ‘উত্থান অব্যাহত, তবে শক্তি কিছুটা হ্রাসের মুখে’। চার দিনের বড় পতনের পর বুধবারের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ধারাবাহিকতা গতকাল বৃহস্পতিবার বজায় থাকলেও লেনদেন ৬০৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৩৩ কোটি টাকায় নেমে আসায় বাজারের টেকসই পুনরুদ্ধার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আগামী কয়েকটি কার্যদিবসে সূচকের পাশাপাশি লেনদেন না বাড়লে বর্তমান রিবাউন্ডকে কেবল সাময়িক কারিগরি পুনরুদ্ধার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

Advertisement