ইরানে একাকী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইল

  নয়া দিগন্ত ডেস্ক    

Advertisement

ওয়াশিংটনের যৌথ অংশগ্রহণ কিংবা একক সিদ্ধান্তে ইরানের ভূখণ্ডে নতুন করে হামলা চালানোর সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে ইসরাইল। গত সোমবার ইসরাইলি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘ইসরাইল হায়োম’-এর খবরে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর সাথে নিবিড় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সামরিক সমন্বয় রক্ষা করে সম্ভাব্য এই আক্রমণের রূপরেখা তৈরি করছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
খবরে স্পষ্ট করা হয়, যেকোনো ধরনের আগাম হামলা চালানো কিংবা তেহরানের যেকোনো আক্রমণের সরাসরি জবাব দেয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তৈরি রাখছে ইসরাইল। যদিও আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে ইসরাইল বা আমেরিকার পক্ষ থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা আপাতত কম বলে ধারণা করা হচ্ছে, তথাপি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে তেল আবিব। এ দিকে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ালা’-এর পৃথক এক খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে আগামী সপ্তাহে ইসরাইলে বাড়তি সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। সংবেদনশীল নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা যায়, বর্তমানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা, বৈমানিক ও সহায়তাকারী দলসহ অন্তত তিন হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য ইসরাইলি ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন।
অঞ্চলটিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে বাড়তি মার্কিন সেনাদল ও যুদ্ধবিমানের প্রত্যাশায় রয়েছে দেশটি। ওয়ালা আরো জানায়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাথে সার্বিক যোগাযোগ রেখে সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করেছে ইসরাইল। অন্য দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ব্যক্ত করেছেন যে, তেহরান একটি ‘ন্যায্য মীমাংসার’ তাগিদে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। উল্লেখ্য গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের নিকট সাতটি শর্ত সংবলিত প্রস্তাব পেশ করেছিল ইরান, যা পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাতিল করে দেন।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা : আহত ১১ ভারতীয় নাবিক
 আল-জাজিরা জানায়, হরমুজ প্রণালীতে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ১১ জন ভারতীয় নাবিকসহ মোট ১২ জন আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী ‘এমটি অন পিস’ নামের জাহাজটিতে এই হামলা চালানো হয়। আহতদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য ওমানি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ওমানের খাসাব শহরে আহত ক্রুদের স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানসংলগ্ন ওই  নৌসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে বারবার এ ধরনের হামলার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেছে ভারত। অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক  নৌপথে নিরাপদ নৌচলাচল ও বাণিজ্য দ্রুত স্বাভাবিক করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। 
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা অর্থহীন : ইরানি প্রেসিডেন্ট
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করে কোনো লাভ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সোমবার তেহরানে আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরারাত মির্জোয়ানের সাথে বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইরানের বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে পেজেশকিয়ানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘যে শত্রু প্রতিদিন হত্যা, নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও হুমকি দেয় এবং নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তার সাথে আলোচনা করার কোনো অর্থ নেই। আমাদের জনগণও এমন পদ্ধতি মেনে নেবে না।’
বাহরাইনকে কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানের ওপর হামলার জন্য আবারো বাহরাইনের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হলে তার জবাব দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। জাতিসঙ্ঘে ইরানের এক কূটনীতিক বলেছেন, বাহরাইন এ ঘটনায় ‘ভুক্তভোগী নয়’; বরং দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। খবর মেহের নিউজের। সোমবার  জাতিসঙ্ঘের তৃতীয় কমিটির বৈঠকে বাহরাইনের এক কূটনীতিকের বক্তব্যের জবাবে এসব কথা বলেন জাতিসঙ্ঘে ইরানের মিশনের কূটনীতিক আলি কারিমি মাগাম। তিনি বলেন, ‘বাহরাইন মানবাধিকারের কথা বলছে, কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে কি রয়েছে, তা উপেক্ষা করছে।’ বাহরাইনকে ভুক্তভোগী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই দেশ ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।’
ইরানি এই কূটনীতিক আরো বলেন, প্রতিবেশী ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার পর বাহরাইন এখন এর পরিণতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারে না। জাতিসঙ্ঘের তৃতীয় কমিটিতে ইরানের প্রতিনিধি বলেন, ইরান হামলা শুরু করেনি; বরং তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তাই ইরানের পালটা পদক্ষেপ ছিল ‘আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকার প্রয়োগ’। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই অঞ্চলের কোনো দেশের ভূখণ্ড আবারো ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করা হলে আমরা তার জবাব দেব।’ বাহরাইনের প্রতিনিধির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দু’টি পথই খোলা আছে। হয় আমরা সবাই মিলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করব, অথবা সবাই মিলে অনিরাপত্তার পরিস্থিতি মোকাবিলা করব।’ ইরানি কূটনীতিক বলেন, ‘বাহরাইন এর আগে দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছিল। তারা যদি আবার একই পথ বেছে নেয়, তাহলে ভিন্ন কোনো ফল আশা করা উচিত নয়।’
নতুন সরঞ্জামের বিশাল মজুদ দাবি ইরানি সেনাবাহিনীর 
আলজাজিরা জানায়, ইরানি সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ নতুন ধরনের রক্ষণাত্মক ও আক্রমাণাত্মক সরঞ্জামের বিশাল মজুদ রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি-নিয়া। আরো সরঞ্জাম প্রস্তুতের কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সোমবার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামি-নিয়া বলেন, ‘চলমান যুদ্ধ ইরান মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং শত্রুর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে বের করেছে। শত্রুর মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাসও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।’ ‘যুদ্ধ চলাকালে প্রতিদিন আমাদের সরঞ্জামের উৎপাদন অব্যাহত ছিল এবং বর্তমানেও তা পুরোদমে চলছে। সেনাবাহিনীর কাছে বর্তমানে সমরাস্ত্র ও সরঞ্জামের বিশাল মজুদ রয়েছে এবং সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’ সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে নতুন সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করা শুরু করেছে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কিছু কৌশলগত সামরিক সরঞ্জাম উপযুক্ত ও সঠিক সময়ে উন্মোচন করা হবে।
ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে প্রায় দু’দশক ধরে বিরোধ চলার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বাহিনীর হামলার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারি মাসে এই যুদ্ধ চলার পর দু’বার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে দু’পক্ষ এবং দুবারই তা ভঙ্গ  করেছে। সর্বশেষ আগস্ট মাসে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরু করেছে ওয়াশিংটন। সেই থেকে আপাতত বন্ধ আছে পরস্পরের দিকে লক্ষ্য করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বচনের পর ফের ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে মার্কিন বাহিনী।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা ইরান নিয়ে কোনো ‘ভুল হিসাব’ করলে ইরানি বাহিনী কঠোর ও ভয়াবহ জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। গতকাল মঙ্গলবার তিনি এই  হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্রবাহিনী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রয়েছে।