সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ ধুঁকছে গ্যাস সঙ্কটে। সরবরাহ বিঘ্ন ঘটায় প্রতিনিয়ত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে গৃহস্থালি কর্মে। কল-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসাবাণিজ্যের বিস্তার, শিল্প উৎপাদন অনেকাংশে গ্যাসের অভাবে থমকে আছে। বাইরে থেকে আমদানির রাস্তা সহজ করে সময়মতো সরবরাহ লাইন প্রতিষ্ঠা করাও হয়নি। দেশের অভ্যন্তরে থাকা সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রও অনুসন্ধান করা হয়নি। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলো সীমান্তের পাশে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। সেসব ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি করছে দেশগুলো। আমাদের দেশে ঘটছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে অবলীলায় গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। আদৌ সেগুলোতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস আছে কি না সে ব্যাপারে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান চালানো হয়নি। 
কক্সবাজারের উখিয়ায় এমন একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রে ২৭ অক্টোবর থেকে টানা আগুন জ্বলছে। উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীতে একটি নলকূপ খননের সময় আগুনের সূত্রপাত। এক হাজার ফুট গভীরে খননের পর গ্যাস বের হতে শুরু করে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার বিশেষজ্ঞরা। গ্যাস নির্গমনের ধরন, অগ্নিশিখার বৈশিষ্ট্য ও আশপাশের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা। অগ্নিশিখা দেখে তারা অনুমান করছেন, এতে তেলের উপস্থিতিও থাকতে পারে।
ইনানীর আগুনের ঘটনাটি এ এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এর পাশে মিয়ানমার বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এগুলোতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদ আছে ছয় ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বাংলাদেশে গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট। সেই হিসাবে পাশেই মিয়ানমারের গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ গ্যাস দিয়ে বাংলাদেশ ছয় বছর চলতে পারে। অথচ একই ধরনের সম্ভাবনা থাকার পরও একই অঞ্চলে বাংলাদেশ কোনো কার্যকর অনুসন্ধান চালায়নি। মিয়ানমার এ গ্যাস পাইপলাইনে চীনে রফতানি করছে। অন্য দিকে গ্যাসের অভাবে আমাদের অর্থনীতি বড় আকারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যদিও ইনানীতে টানা ভূগর্ভের গ্যাস নিঃসরণে এটি প্রমাণিত নয় যে, সেখানে নিশ্চিত ব্যবহারযোগ্য গ্যাস ও তেল আছে। কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে জোরালো প্রশ্ন ছুড়ে মারছে যে, কেন সম্ভাব্য জায়গায় সময়মতো অনুসন্ধান চালানো হয়নি। মিয়ানমার সেখানে ২০০৪ সালে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০১৩ সালে ক্ষেত্রগুলো থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হয়। অথচ এ সময়ে আমরা গ্যাস আমদানির রাস্তা প্রশস্ত করেছি। এমনকি আমদানির পেছনে অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের অর্থ হাতিয়ে নেয়া। সে কারণে দেশ এখন জ্বালানির বড় বিপর্যয়ে পড়েছে। দেশীয় পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি বাপেক্স অনেকটা অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি।
বঙ্গোপসাগর ও এর উপকূলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মিয়ানমার ও ভারতের থেকে আমরা ইতোমধ্যে দুই দশক পিছিয়ে পড়েছি। এখন যত দ্রুত সম্ভব পুরো অঞ্চলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে অনুসন্ধান চালাতে হবে। ধারাবাহিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালাতে হবে। ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপ এবং অনুসন্ধানী কূপ খনন করে তেল-গ্যাসের মজুদ আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। বিলম্ব হলেও আর বসে থাকার সময় নেই। জ্বালানির উচ্চ চাহিদার জোগান মেটাতে নিজস্ব তেল-গ্যাস সর্বোত্তম হতে পারে।

Advertisement