২০ কোটি টাকায় এক ব্রোঞ্জ
এশিয়ান গেমসে সমাপনী অনুষ্ঠানে মার্চপাস্টে বাংলাদেশের পতাকা হাতে এক ক্রীড়াবিদ : বিওএ।

জসিম উদ্দিন রানা
২২ ডিসিপ্লিনে ১৮৭ ক্রীড়াবিদ, সাথে কোচ ও কর্মকর্তা- বিশাল বহর নিয়ে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে গেমসের পর্দা নামার পর প্রাপ্তির খাতায় জমা পড়েছে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ। গেমস শুরুর আগে ক্রিকেট, কাবাডি, শুটিং ও আরচারিকে পদকের সম্ভাব্য ডিসিপ্লিন হিসেবে সামনে রাখা হলেও সেই চার খেলার কোনোটি থেকে পদক আসেনি। সফরে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি বলতে উশুর জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জপদক। ১৮৭ ক্রীড়াবিদ গিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত একজন জিন্নাতই দেশের পতাকা তুলে ধরেন, তাহলে কঠিন সত্যিটা স্বীকার করতেই হবে। বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস অভিযান ছিল পদক জয়ের চেয়ে বহর বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিযোগিতায় আমরা হয়তো অনেক দূর এগিয়েছি-কেবল ক্রীড়াটাই এগোয়নি!
এশিয়ান গেমস শেষ। জাপানের আইচি-নাগোয়া থেকে বাংলাদেশ ফিরেছে। ফিরে এসেছে ক্রীড়াবিদরা, ফিরেছেন কর্মকর্তারাও। তবে পার্থক্য এক জায়গায়-ক্রীড়াবিদদের হাতে পদক নেই, কর্মকর্তাদের হাতে নিশ্চয়ই সফরের স্মৃতি আছে! গেমসে যাওয়ার আগে অবশ্য অন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা বেশ জমেছিল-কোন ডিসিপ্লিনে কতজন কর্মকর্তা যাবেন! কে যাবেন, কে থাকবেন, কার জায়গা হবে- এসব নিয়ে যেন অলিম্পিকের চেয়েও বড় অলিম্পিক! ক্রীড়াবিদ কতটা প্রস্তুত, পদকের সম্ভাবনা কতটা, কোচের প্রয়োজন আছে কি না- এসব প্রশ্নের চেয়ে কর্মকর্তার চেয়ারটি যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, কোনো কোনো ইভেন্টে কোচ বা ম্যানেজার না থাকলেও কর্মকর্তা ঠিকই ছিলেন। অর্থাৎ খেলোয়াড় একা লড়বেন, কিন্তু কর্মকর্তা একা থাকবেন না! খেলোয়াড়ের পাশে প্রশিক্ষক নেই, অথচ সফরসঙ্গী হিসেবে কর্মকর্তা আছেন-কী চমৎকার ব্যবস্থাপনা! বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনও যেন উদারতার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। নিজেরা বিশাল বহর নিয়ে গেছে, অন্য ডিসিপ্লিনগুলোকেও সুযোগ দিয়েছে। ফলে সবাই গেলেন, দেশ গেল- শুধু পদক এলো ভাগ্যের জোরে একটি ব্রোঞ্জ।
অথচ গেমসের আগে ক্রিকেট, কাবাডি, শুটিং ও আরচারিকে সম্ভাব্য পদকের খেলা হিসেবে সামনে রাখা হয়েছিল। প্রত্যাশার তালিকায় ছিল চারটি ডিসিপ্লিন। কিন্তু চারটিই শেষ পর্যন্ত পদকশূন্য। ক্রিকেটে বড় স্বপ্ন, কাবাডিতে পুরনো ঐতিহ্য, শুটিং-আরচারিতে সম্ভাবনার গল্প- সবমিলিয়ে শেষমেষ গল্পের বই বন্ধ হয়েছে একই জায়গায়। পদক নেই।
প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে এই অভিযানে-এমন তথ্য সামনে এসেছে। সেই বিপুল অর্থের বিনিময়ে দেশের প্রাপ্তি একটি ব্রোঞ্জ। অবশ্য জিন্নাত আক্তারের পদককে খাটো করার সুযোগ নেই। বরং তিনিই এই বহরের মান বাঁচিয়েছেন। কিন্তু একজন ক্রীড়াবিদের পদক দিয়ে কি এত বড় আয়োজনের হিসাব মেলানো যায়? প্রশ্নটা আরো বড়। খেলোয়াড় তৈরির পেছনে টাকা, বিদেশী প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, আধুনিক কোচিং- এসবের বদলে যদি ‘কে যাবেন’ সেটিই বড় হয়ে ওঠে, তাহলে পদক আসবে কোথা থেকে?
এশিয়ান গেমসকে যদি কেউ ক্রীড়া পর্যটন বানিয়ে ফেলেন, তাহলে এমন ফলই হবে। ক্রীড়াবিদ যাবেন পদকের জন্য, কর্মকর্তা যাবেন সফরের জন্য- এই সংস্কৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এগোনো যায় না। বহরের আকার দিয়ে ক্রীড়ার শক্তি মাপা বন্ধ হোক। কর্মকর্তা কমিয়ে ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুতি বাড়ানো হোক। চেয়ার কমুক, কোচ বাড়ুক। সফরসঙ্গী কমুক, আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাড়ুক। নামের তালিকা ছোট হোক, পদকের তালিকা বড় হোক।
উশুতে নারী ৫২ কেজি ক্যাটাগরির সেমিফাইনালে উঠেই জিন্নাত পদক নিশ্চিত করেছিলেন। যদিও সেটি এসেছে ভাগ্যগুণে। প্রথম রাউন্ডে বাই ও কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ডিসক্যায়রিঠাই হওয়া সেমিতে ওঠেন তিনি। তবে ১৯৮৬ সালের সিউল গেমসের পর এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পদক। ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ৮৫ পদক নেয়া প্রতিবেশী ভারতের কথা বাদই দেয়া গেল, পাকিস্তান ১০টা, শ্রীলঙ্কা-নেপালও ২-৩টা পদক জিতেছে।
ক্রিকেট ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। আগের হ্যাংজু এশিয়ান গেমসে পুরুষ ও নারী-দুই দলই দেশকে ব্রোঞ্জ পদক উপহার দিয়েছিল। কিন্তু এবার দু’টি দলই পদকশূন্য। পূর্ণ শক্তির ক্রিকেট দল নিয়ে গিয়েও প্রত্যাশার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারতে হয়েছে বড় ব্যবধানে। দুই প্রতিপক্ষই বাংলাদেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দল নিয়ে খেললেও মাঠের চিত্র ছিল হতাশার। নারী দলতো ছিল আরো বাজে।
সম্ভাবনা জাগিয়েও সুযোগ হাতছাড়া করেছে পুরুষ কাবাডি দল। প্রথম দুই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ও চায়নিজ তাইপেকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পথ অনেকটাই জোরালো করেছিল তারা। তাইপেকে হারিয়ে এমন উদ্যাপন করেছিল যেন পদকই নিশ্চিত হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আয়োজক জাপানের কাছে হেরে পদকের লড়াই থেকে ছিটকে যেতে হয়। 
আরচারিতেও আন্তর্জাতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যাশা ছিল। তবে একক বা দলগত-কোনো ইভেন্টেই পদকের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি তীরন্দাজরা। কয়েক মাস আগেই এশিয়া কাপে কম্পাউন্ড পুরুষ দল সণ জিতলেও জাপানের মঞ্চে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। 
পুরুষ হকি দল স্থান নির্ধারণী শেষ ম্যাচে থাইল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সপ্তম স্থান নিয়ে আসর শেষ করেছে। তবে পঞ্চম বা ষষ্ঠ হওয়ার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। আর প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়া নারী হকি দল শেষ করেছে নবম হয়ে। 
যে শুটিং নিয়ে প্রত্যাশা ছিল, সেখানে ফাইনালের ধারেকাছেও যেতে পারেননি কোনো শুটার। কুস্তিতে ৬৫ কেজিতে আব্দুস সাত্তার নেপালের প্রতিযোগিকে হারিয়ে সৌদি আরবের কাছে হেরেছে। ৫৭ কেজিতে মাহবুব হোসেন শ্রীলঙ্কার কুস্তিগীরকে হারিয়ে উত্তর কোরিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। গলফে সিদ্দিকুর রহমান হতাশ করেছেন। ব্যডমিন্টন ও টেবিল টেনিসে হয়নি কোন আলোকবর্তিকা। অ্যাথলেটিকসের চাওয়া তো যোজন যোজন দূরে। ইমরানুর রহমান প্রথম হিটে উতরে গেলেও কাজের কাজ হয়নি। বিচ ভলিবল, সার্ফিং নিয়ে কখনো আশাই করা হয়নি।
হ্যাংজু ২০২৩ গেমসের দু’টি ব্রোঞ্জ থেকে এবার নেমে এসেছে একটিতে। প্রাপ্তির খাতা খতিয়ে দেখলে প্রশ্ন জাগে-দলের উপস্থিতি কি পেশাদার ক্রীড়াবিদদের কোনো মিশন ছিল, নাকি শুধুই এক আনন্দ ভ্রমণ? মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি আর সেলফির ছড়াছড়িতেই মেতে থাকলেন অনেকে। সাফল্য-ব্যর্থতা বিশ্লেষণ হয় না বললেই চলে। প্রতিবেশী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা শুধু উদাহরণ দিয়েই সময় পার করছি।
ব্যর্থতার কারণ খুঁজবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
এশিয়ান গেমসে ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে মূল্যায়ন কমিটি করার কথা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো: আমিনুল হক। গতকাল জানান, ‘যেসব ইভেন্টে বাংলাদেশের পদক জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে।’

Advertisement