
এস এম মিন্টু
- মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোতে অর্থ পাচারের সন্দেহ
- সাইবার প্রতারণা-‘চেনা মুখ, চেনা কণ্ঠ’-সবই ভুয়া
- এআই দিয়ে তরুণদের সর্বস্বান্ত করছে প্রতারক চক্র
একদিকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন, অন্য দিকে পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ঘোচানোর আকাক্সক্ষা-তরুণদের এই দুর্বল জায়গাটিকেই পুঁজি করছে এআই-চালিত সাইবার প্রতারক চক্র। ফেসবুক পেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন, ভুয়া নিয়োগপত্র, নকল কোম্পানির ওয়েবসাইট এমনকি ‘চেনা মুখ ও চেনা কণ্ঠের’ ভিডিও। বাইরে থেকে সব কিছু এতটাই বাস্তব মনে হয় যে প্রতারণার ফাঁদ বুঝে ওঠার আগেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে।
এমনই এক প্রতারণার ঘটনায় মো: তানভির হাসান (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে গত ১ অক্টোবর গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগ রয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নামীদামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ভুয়া অফার লেটার পাঠিয়ে তরুণ-যুবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন শুধু তরুণ-কিশোররা নন; একজন বেসরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকেও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তিন লাখ ৮৩ হাজার ৮১০ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ওই কর্মকর্তার অভিযোগের ভিত্তিতেই তানভিরকে গ্রেফতার করা হয়। সিআইডি বলছে, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও নথি ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশী তরুণদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে সিআইডির সাইবার ইউনিট অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
প্রতারণার নতুন অস্ত্র এআই
পুলিশ ও সাইবার ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতা সাইবার প্রতারণার ধরনই বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে ভুল বানান, অসংলগ্ন ভাষা কিংবা নিম্নমানের গ্রাফিকস দেখে ভুয়া বার্তা চেনা যেত, এখন সেখানে এআই দিয়ে তৈরি হচ্ছে নিখুঁত বাংলা ও ইংরেজিতে নিয়োগপত্র, কোম্পানির ওয়েবসাইট, কর্মীর পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল ও পেশাদার ভিডিও।
কখনো ভিডিও সাক্ষাৎকারেও ব্যবহার করা হচ্ছে ডিপফেক প্রযুক্তি। নকল মুখ, কণ্ঠস্বর ও ভিডিও ফুটেজ এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যেন প্রার্থী বা নিয়োগদাতা সত্যিই ভিডিও কলে কথা বলছেন। ফলে ভুক্তভোগীর পক্ষে শুরুতেই প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ক্রেডিট তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এক্সপেরিয়ানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনবৃত্তান্ত এবং রিয়েল-টাইম সাক্ষাৎকারে ডিপফেক প্রার্থীর ব্যবহার কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত জালিয়াতি আরো বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেও চাকরির নামে অনলাইন প্রতারণা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফেডারেল ট্রেড কমিশনের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই চাকরি-সংক্রান্ত প্রতারণার ৬০ হাজারের বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতারণার পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান এখনো তৈরি হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণও স্পষ্ট নয়।
‘চেনা মুখ, চেনা কণ্ঠ’-সবই ভুয়া
বাংলাদেশেও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারের নজির মিলেছে। ঢাকাভিত্তিক তথ্য-যাচাই প্রতিষ্ঠান দিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে ফেসবুকে জুয়ার বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশী ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমের পরিচয় ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থাৎ প্রতারণার ক্ষেত্রে এখন শুধু ভুয়া নাম বা ছবি নয়-ব্যবহার করা হচ্ছে বাস্তব মানুষের মুখ ও কণ্ঠস্বরও। কোনো পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কিংবা বিদেশী নিয়োগদাতার নামে ভিডিও বা অডিও পাঠিয়ে ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এ কারণেই প্রচলিত ‘দেখে বোঝার’ পদ্ধতিতে প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
প্রথমে আস্থা, পরে টাকা
সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, প্রতারণার কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। বিদেশে চাকরির নামে ‘প্রসেসিং ফি’ বা ‘ভিসা ফি’, আবার কখনো ফ্রিল্যান্সিং ‘টাস্ক’-এর কথা বলে যোগাযোগ করা হচ্ছে। শুরুতে ছোট অঙ্কের কাজ দিয়ে সামান্য মুনাফাও দেয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীর আস্থা তৈরি হয়।
এরপর বিনিয়োগ অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘নিশ্চিত মুনাফা’র প্রলোভন দেখানো হয়। প্রথমে অল্প টাকা বিনিয়োগ করে লাভ পাওয়ার সুযোগ দেয়া হলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দিতে বলা হয়। টাকা দেয়ার পরই শুরু হয় নতুন অজুহাত-কর, প্রসেসিং ফি, ভেরিফিকেশন চার্জ কিংবা উত্তোলন ফি। শেষপর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় প্রতারকরা।
সিআইডির কাছে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় প্রতারণার একটি সাধারণ ধরনও উঠে এসেছে। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, এরপর অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামে নিয়ে যাওয়া, তারপর ‘ফি’ বা ‘ডিপোজিট’-এর নামে টাকা দাবি এবং শেষপর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া।
এআই-নির্মিত পেশাদার বার্তা, ভুয়া ভিডিও ও নকল কাগজপত্র থাকায় শুরুতে সন্দেহ করার সুযোগও পান না অনেকে।
ভুয়া অফার লেটার, লাখ লাখ টাকা
সিআইডির হাতে গ্রেফতার তানভির হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগটিও এ ধরনের। এক ভুক্তভোগী জানান, চক্রের সদস্যরা পরস্পরের যোগসাজশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে একটি ভুয়া অফার লেটার দেন।
চাকরি নিশ্চিত হওয়ার আশ্বাসে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন খাতে টাকা দিতে বলা হয়। প্রতারকদের দেয়া ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাব নম্বরে অর্থ পাঠান ভুক্তভোগী। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল সাজানো। তার কাছ থেকে তিন লাখ ৮৩ হাজার ৮১০ টাকা নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পুলিশের ধারণা, এ ধরনের ঘটনায় ব্যবহৃত হিসাবগুলো অনেক সময় সরাসরি মূল প্রতারকদের নয়। অন্যের নামে খোলা বা ভাড়া করা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এসব হিসাবকে সাইবার অপরাধের ভাষায় ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অর্থ যাচ্ছে কোন পথে?
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতারণার অর্থ একাধিক স্তরে স্থানান্তর করা হতে পারে। প্রথমে ভাড়া করা বা অন্যের নামে খোলা ব্যাংক ও এমএফএস হিসাবে টাকা নেয়া হয়। পরে বিভিন্ন হিসাব ঘুরিয়ে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও পিয়ার-টু-পিয়ার (চ২চ) লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া হুন্ডি বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেল ব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে প্রতারণার অর্থের প্রকৃত গতিপথ এবং বিদেশে পাচারের সাথে এসব চক্রের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না-তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসূত্র?
সাইবার প্রতারণার বৈশ্বিক চক্রগুলো সাধারণত একটি দেশ থেকে পরিচালিত হয় না। এক দেশে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, অন্য দেশে তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইট, তৃতীয় দেশে অর্থ গ্রহণ এবং অন্য কোনো দেশে অর্থ স্থানান্তরের মতো বহুস্তরীয় কাঠামোতে এসব অপরাধ পরিচালিত হতে পারে।
বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক চক্রের স্থানীয় এজেন্ট, সিমকার্ড ও ব্যাংক/এমএফএস হিসাব সরবরাহকারী এবং অর্থ স্থানান্তরকারীদের সাথে সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের অপরাধে শুধু মূল হোতাদের গ্রেফতার করলেই হবে না; অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি।
তরুণরাই কেন টার্গেট?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের বিদেশে চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন আয়ের প্রতি আগ্রহকে প্রতারকরা বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে বেকারত্ব, দ্রুত আয় করার আকাক্সক্ষা এবং বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে প্রতারণার গল্প।
প্রতারকরা জানে-একজন তরুণকে যদি বোঝানো যায় যে অল্প সময়ের মধ্যে তার জীবন বদলে যাবে, তাহলে সে যাচাই-বাছাইয়ের আগেই অর্থ খরচ করতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
আর এআই সেই বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটিই আরো শক্তিশালী করছে।
একটি ভুয়া কোম্পানির ওয়েবসাইট, একজন কথিত মানবসম্পদ কর্মকর্তার প্রোফাইল, নিখুঁত ইংরেজিতে লেখা নিয়োগপত্র এবং ভিডিও কলে ‘কথা বলা’ একজন কর্মকর্তাকে দেখে ভুক্তভোগীর কাছে পুরো বিষয়টিকে বাস্তব মনে হতে পারে। অথচ এর প্রতিটি স্তরই হতে পারে কৃত্রিম।
সিআইডির সতর্কবার্তা
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: ছুফি উল্লাহ বলেন, সিআইডি দীর্ঘদিন ধরেই সাইবার প্রতারণা ও অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করছে। তবে এআইয়ের যুগে তরুণদের জন্য ঝুঁকি আরো বেড়েছে।
তিনি বলেন, অনেক প্রতারক তরুণদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরি এবং উন্নত দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও রয়েছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি সিআইডির শক্তিশালী সাইবার ইউনিট গঠন করা হয়েছে। প্রতারকদের হাত থেকে তরুণদের রক্ষা করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
যাচাই ছাড়া এক টাকাও নয়
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-চালিত প্রতারণা ঠেকাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি সচেতনতারও বিকল্প নেই। বিদেশী চাকরির অফার এলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও নিয়োগ বিভাগের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো ই-মেইল বা ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেখে বিশ্বাস করা যাবে না।
ভিডিও কলেও কাউকে দেখলেই তার পরিচয় নিশ্চিত ধরে নেয়া যাবে না। কারণ এখন মুখ, কণ্ঠস্বর ও ভিডিও-তিনটিই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-চাকরি, বিনিয়োগ বা অনলাইন কাজের নামে আগে টাকা দিতে বলা হলে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস নম্বর কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর চাপ থাকলে বিষয়টি যাচাই না করে কোনোভাবেই লেনদেন করা উচিত নয়।
কারণ সাইবার প্রতারণার নতুন যুগে চেনা মুখও ভুয়া হতে পারে, চেনা কণ্ঠও হতে পারে কৃত্রিম। আর নিখুঁত কাগজপত্রের আড়ালেও থাকতে পারে সর্বস্বান্ত করার ফাঁদ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








