ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে বিদেশী শিক্ষার্থী কমছে

 ঢাবি প্রতিনিধি

Advertisement

 

  • শিক্ষার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক মানের অভাব
  •  খালি আসনে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিদেশী শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) দীর্ঘমেয়াদি পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি প্রোগ্রামে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। তবে বিপরীতে ভাষা শিক্ষা ও স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন বিশেষ কোর্সে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নিয়মিত ও নিজস্ব বিদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র আন্তর্জাতিক আবাসন কেন্দ্র ‘স্যার পি. জে. হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হল’-এর খালি আসনগুলোতে ঢাবির অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প প্রতিষ্ঠানের বিদেশী শিক্ষার্থীদেরও  থাকার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ২৭ জন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৬ জন এবং ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ১১ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। ফলে দুই শিক্ষাবর্ষের ব্যবধানে নিজস্ব ডিগ্রি প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের বাজেটসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ভিসির বক্তব্যেও গত এক বছরে ১১ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে ভর্তি ও কোর্সের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমন একেবারে থেমে যায়নি। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটসহ ঢাবিতে ১৮ জন এবং ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ২৫ জন ভর্তি হয়েছেন (স্নাতকে তিনজন, স্নাতকোত্তরে ১১ জন এবং এক বছর মেয়াদি ভাষা কোর্সে ১১ জন)।
বিশেষ করে চীনের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়- ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটি, ইউনান ইউনিভার্সিটি, কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি এবং গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ থেকে মোট ২৬ জন শিক্ষার্থী ২০২৬ সালে ঢাবিতে বাংলা ভাষার বিশেষ কোর্সে অংশ নিচ্ছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই ধরনের চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৩ শতাংশ বেড়েছে।
বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত স্যার পি. জে. হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ১১৭ জন বিদেশী শিক্ষার্থী, ৪৯ জন প্রারম্ভিক পর্যায়ের শিক্ষক এবং তিনজন কর্মকর্তার বসবাসের তথ্য রয়েছে। ঢাবির নিজস্ব বিদেশী শিক্ষার্থীর চেয়ে হলে বসবাসকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, হলটিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজসহ ঢাবির অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদেশী শিক্ষার্থীরা বাস করছেন।
অথচ নীতিগতভাবে হলটি সম্পূর্ণ ঢাবির নিজস্ব বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্যই সংরক্ষিত। ২০২৫ সালে ফি পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত এক সুপারিশে হলটিকে একচেটিয়াভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারের তাগিদ দেয়া হয়েছিল। অন্য দিকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান হলের বিভিন্ন সংস্কার কাজ ও বিদেশী নারী শিক্ষার্থীদের আলাদা ব্লক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে আরো ১৩টি কক্ষের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক হলে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আবাসন সম্পর্কে ঢাবির প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী জানান, আন্তর্জাতিক হলটি মূলত ঢাবির নিজস্ব বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে আসন খালি থাকলে প্রাধ্যক্ষ মহোদয় সাময়িকভাবে অন্যদের ব্যবস্থা করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে যারা আছেন, তাদের হঠাৎ করে সরিয়ে দেয়াও সম্ভব নয়।
হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এম এ কাওসার জানান, নীতিমালার আলোকেই ঢাবির শিক্ষার্থীদের চাহিদা মিটিয়ে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিদেশী শিক্ষার্থীদের জায়গা দেয়া হয়। ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো: আবদুস সালাম বিদেশী শিক্ষার্থী কমার কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শিক্ষার বদলে বাংলা ভাষার প্রাধান্য এবং আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবকে দায়ী করেছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চশিক্ষায় বিদেশী শিক্ষার্থী টানতে না পারলেও স্বল্পমেয়াদি ভাষা কোর্সে ঢাবির চাহিদা বাড়ছে, আর সেই সূত্রে আন্তর্জাতিক হলের আবাসন ব্যবস্থারও বহুমুখী ব্যবহার ঘটছে।