তেল-চিনির সরবরাহ সঙ্কট ডিম-সবজিতেও বাড়তি দাম
মালিবাগ বাজারে তরকারির দোকানে বিভিন্ন জাতের সবজির। তবে দাম বেশ চড়া : নয়া দিগন্ত।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। একদিকে সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ সঙ্কট, অন্যদিকে ডিম, সবজি ও মাছ-গোশতের চড়া দাম- সব মিলিয়ে চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি তৈরি হয়েছে সয়াবিন তেল ও চিনির বাজারে। সরবরাহ কম থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। এমনকি প্যাকেটজাত চিনি ও বোতলজাত সয়াবিন তেল না রেখে প্যাকেট কেটে বা অন্যভাবে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানীর দুয়ারিপাড়া, মিরপুর-৬, পল্লবী এবং কচুক্ষেত বাজার ঘুরে গতকাল (শুক্রবার)  নিত্যপণ্যের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে বর্তমানে এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা লেখা থাকলেও অনেক দোকানে তা ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত মূল্য ২০৪ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ২১০ টাকা নেয়া হচ্ছে। সরবরাহ সঙ্কটের কারণে অনেক দোকানে প্যাকেটজাত  চিনি ও বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
মিরপুর-৬ এক মুদিদোকানি জানান, প্যাকেটজাত চিনি কিনতেই তাদের ১১৩ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ফলে দোকানে ১১০ টাকা দামের প্যাকেট রেখে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে গেলে ক্রেতার সাথে বাগি¦তণ্ডা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে অনেক দোকানি প্যাকেটজাত চিনি না রেখে প্যাকেট কেটে খোলা অবস্থায় বিক্রি করছেন।
এদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে এমনিতেই প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি। তার ওপর কোনো পণ্যের গায়ে এক দাম লেখা থাকলেও দোকানে গিয়ে আরেক দাম দিতে হচ্ছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। মিরপুর-৬ বাজারে রাশেদ নামের এক ক্রেতা বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নেয়া হলে তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বাজার তদারকি আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
সয়াবিন তেলের বাজারে সরবরাহ সঙ্কটের চিত্র আরো স্পষ্ট। ব্যবসায়ীদের দাবি, কয়েক সপ্তাহ ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। কোথাও তেল থাকলেও তা ক্রেতাদের সামনে না রেখে অন্যত্র রাখা হচ্ছে। পরে বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। দুয়ারিপাড়া বাজারে একটি সুপারশপে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। অথচ বোতলের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা ২০৪ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে কমিশনও কমে গেছে। একজন বিক্রেতা জানান, নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করলে তাদের ব্যবসায়িকভাবে পোষায় না। ফলে বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এক খুচরা বিক্রেতা জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে কোম্পানির কাছ থেকে নিয়মিত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানি অর্ডার নিতে চায় না এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের কমিশনও কমিয়ে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে নিজ খরচে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পণ্যের প্রকৃত খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের এমন দাবির বিপরীতে বাজারে প্রশ্ন উঠেছে- সরবরাহ সঙ্কট যদি সত্যিই থাকে, তাহলে সব পর্যায়ে এর প্রভাব সমান নয় কেন? রাজধানীর কয়েকটি সুপারশপে প্যাকেটজাত তেল ও চিনি পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ওই দিকে সয়াবিন তেলের দাম সম্প্রতি বাড়ানোর অনুমোদন দেয়ার পরও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আরো দাম বাড়ানোর দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে দাম সমন্বয়ের বিষয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, নতুন করে দাম সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক করছে না।
তেল ও চিনির সঙ্কটের মধ্যেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম ৫৫ টাকা, অর্থাৎ ডজন হিসাবে ১৬৫ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১০ টাকা বেড়েছে।
ডিমের এই বাড়তি দাম নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্য বাজেটে সরাসরি চাপ তৈরি করছে। কারণ তুলনামূলক কম দামে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম সহজলভ্য উৎস হিসেবে ডিমের ওপর নির্ভর করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে ডিমের দাম বাড়লে বাজারের সামগ্রিক খাদ্যব্যয়েও তার প্রভাব পড়ে।
মুরগির বাজার অবশ্য তুলনামূলক স্থিতিশীল। রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি প্রায় ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতার এই চিত্র নিত্যপণ্যের সামগ্রিক ব্যয়ের চাপ কমাতে পারছে না।
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। গত ১০ থেকে ১৫ দিনের তুলনায় কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমলেও অধিকাংশ সবজিই এখনো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর বাজারে শীতের আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকায়। টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, বরবটি, ঝিঙে ও করলা প্রায় ৮০ টাকা কেজি। ঢেঁড়স, পটোল, কাঁকরোলসহ বিভিন্ন সবজি ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ আকারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কচুরমুখী প্রায় ৮০ টাকা কেজি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহনখরচ বৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে বাজারে।
তবে কিছুটা স্বস্তি এসেছে কাঁচা মরিচের বাজারে। কয়েক সপ্তাহ আগে কাঁচা মরিচ কেজিপ্রতি ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠলেও সরবরাহ বাড়ায় এখন মানভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে আলু ও পেঁপে, কেজি ২৫-৩০ টাকা। শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশী শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি।
পল্লবী বাজারে হালিম নামের এক ক্রেতা জানান, বেগুন ১০০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ছোট লাউ ৫০ টাকা এবং এক পোয়া কাঁচা মরিচ ৪০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। তার ভাষায়, বাজারে প্রতিটি পণ্যের দামই বাড়তি।
মাছের বাজারেও বড় ধরনের স্বস্তি নেই। বাজারভেদে দামে কিছুটা তারতম্য থাকলেও তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙ্গাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং চিংড়ি এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশী কইয়ের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
মাছ বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন, মাছের দাম মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বাজারে মাছের সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে, আবার ক্রেতার চাপ বাড়লে দামও বাড়ে। ফলে একই মাছের দাম সকাল ও বিকেলে কিংবা এক বাজার থেকে অন্য বাজারে কিছুটা কমবেশি হওয়া স্বাভাবিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে এখন একদিকে সরবরাহ সঙ্কট, অন্যদিকে উচ্চমূল্য- দুইয়ের চাপই বহন করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তেল ও চিনির মতো মৌলিক পণ্যে এমআরপি অমান্য করে বিক্রির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে ডিম ও সবজির উচ্চমূল্যও পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ, পাইকারি-খুচরা পর্যায়ের ব্যবধান এবং এমআরপি বাস্তবায়ন- এই চারটি জায়গায় কার্যকর নজরদারি না বাড়ালে নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতার ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।