ইরানকে কোণঠাসায় মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement
  •  নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আরো রণতরী ও সেনা পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন
  •  আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আঘাতের পরিকল্পনা তেহরানের

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা আগ্রাসনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও শান্তির কোনো স্পষ্ট আলামত এখনো মিলছে না। বরং তেহরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে সমুদ্র ও ভূখণ্ডে একযোগে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তিবৃদ্ধির মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে সামরিক সম্ভার বাড়ানোর পাশাপাশি  ইরানের সীমান্তবর্তী নৌসীমায় অতিরিক্ত দুই হাজার মেরিন সেনা পাঠাচ্ছে তারা। রণকৌশলগত এই পরিস্থিতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সঙ্ঘাত মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান মার্কিন এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবরে জানা যায়, শক্তিশালী রণতরী ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি সান ডিয়েগো সামরিক ঘাঁটি ত্যাগ করে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওনা দিয়েছে। এর ঠিক পরদিনই দুই হাজার সেনাসজ্জিত মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা শুরু করে। উক্ত মার্কিন সূত্রের দাবি, আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে ইরানের আশপাশের কৌশলগত জলসীমায় একই সাথে তিনটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী, দুইটি অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং গ্রুপ এবং সর্বাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকবে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান কূটনৈতিক আলোচনার গতিপথ যেদিকেই যাক না কেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সমস্ত সামরিক বিকল্প উন্মুক্ত রাখতেই সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় সেনাবল বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অবরোধ ও নৌপথে উত্তেজনা : সামরিক কৌশল সাজানোর পাশাপাশি তেহরানের ওপর চরম অর্থনৈতিক অবরোধও চাপিয়ে দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ইরানের সর্ববৃহৎ গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ইরান খোদ্রো’ ও ‘সাইপা’র পাশাপাশি দেশটির রেল, শিল্প উৎপাদন এবং ইস্পাত খাতের ওপর কঠোর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। এই অচলাবস্থার মধ্যেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার সময় অজ্ঞাত বস্তুর প্রচণ্ড আঘাতে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে একটি বিশাল সুপার ট্যাঙ্কার। ঘটনায় ওই ট্যাঙ্কারে সাথে সাথে আগুন ধরে যায়। তবে সৌভাগ্যবশত কোনো প্রাণহানি বা হতাহতের খবর মেলেনি বলে নিশ্চিত করেছে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স। হরমুজ প্রণালীর উদ্ভূত এই অস্থিতিশীলতাকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। পরিস্থিতির আরো অবনতি রোধে উভয় রাষ্ট্রকে অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ খোলা রাখার জোর তাগিদ জানান তিনি।
ডুজারিক মন্তব্য করেন, বিদ্যমান সঙ্কট অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আমরা কার্যত এক প্রকার যোগাযোগহীনতার মধ্যে পার হচ্ছি। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কাতার সরকারের মধ্যস্থতায় সেই দফার সংলাপ অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি। কাজেই আলোচনার এসব চ্যানেল সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্য দিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের যুক্তিসঙ্গত সংলাপে বসতে তার দেশ কখনোই অনীহা প্রকাশ করেনি। একই সাথে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভেস্তে যাওয়া যুদ্ধবিরতি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে উত্থাপিত সর্বশেষ প্রস্তাবের বিপরীতে  ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি কী হয়, তেহরান তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করছে ইরান : আন্তর্জাতিক পরমাণু বিষয়ক বাধ্যবাধকতা ও প্রচলিত সব নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ইরান তার বিতর্কিত পারমাণবিক তৎপরতা জোরকদমে চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ বন্ধের আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় বারবার অস্বীকৃতি জানাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে মার্কিন প্রতিনিধি মাইক ওয়াল্টজ তেহরানের দিকে আঙ্গুল তুলে এসব তথ্য প্রকাশ করেন। নিরাপত্তা পরিষদের সেই অধিবেশনে মাইক ওয়াল্টজ সরাসরি দাবি তোলেন, আইন লঙ্ঘন করে নিজেদের পরমাণু প্রকল্প থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে ইরান। তিনি জানান, তেহরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে, যার পেছনে কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য’ বিদ্যমান বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদল ও পরিদর্শকদের ইরানি ভূখণ্ডে প্রবেশ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অনুমতি বারবার প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলেও নালিশ জানান এই মার্কিন প্রতিনিধি।
মার্কিন এই প্রতিনিধি আরো বলেন, ইরানের নিরবচ্ছিন্ন আইন লঙ্ঘনের দরুন বাধ্য হয়ে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরস পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটনের তরফ থেকে বারবার তাগিদ সত্ত্বেও ইরানি প্রতিনিধিরা পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা পরিত্যাগের যেকোনো প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি এবং ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ বন্ধের বৈশ্বিক দাবি বরাবরের মতোই পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পারমাণবিক প্রকল্প সম্পূর্ণরূপেই অসামরিক ও শান্তিকামী। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার আইনগত অধিকার তাদের রয়েছে। একই সাথে আইএইএ-এর বিরুদ্ধেও সরাসরি পক্ষপাতমূলক আচরণের পাল্টা অভিযোগ এনেছেন ইরানি নীতিনির্ধারকেরা। জাতিসঙ্ঘের এই পারমাণবিক তদারকি সংস্থার গৃহীত হালনাগাদ প্রস্তাবগুলোকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তারা।
তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী ও নতুন সামরিক বহর : নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরেই ইরানের মাটিতে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে সতর্কবার্তা দেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে আরো ৯ থেকে ১০ হাজার সেনাসদস্যসহ আরেকটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক বহর ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ ও এর সহযোগী স্ট্রাইক গ্রুপটি নভেম্বরের শেষ ভাগ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নোঙর করবে। বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ ও ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ নামে দুটি যুদ্ধজাহাজ আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরে দায়িত্বরত ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’কে দীর্ঘদিনের মিশন শেষ করা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে’র স্থলাভিষিক্ত করতেই মধ্যপ্রাচ্যে আনা হয়েছে। নতুন এই সমরসম্ভার যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ড ও সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর মোট উপস্থিতি ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সেনা এবং শতাধিক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানে গিয়ে পৌঁছাবে। গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত শান্তি প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাতারের মধ্যস্থতায় তেহরান ওই প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিল। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বাণিজ্য ও চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় ইরান, কারণ তারা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এবার মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও আঘাতের পরিকল্পনা ইরানের : তবে যুক্তরাষ্ট্র ফের বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করলে ইরান আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী জবাব দেবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে তেহরান কূটনৈতিক উদ্যোগও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে এখন এমন এক ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী জবাব দিতে হবে। একই সময়ে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা আরো উসকে উঠা ঠেকানোর চেষ্টা করছে তেহরান। তিন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। এই পরিকল্পনায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে, মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর স্থাপনা এবং সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানকেও লক্ষ্যবস্তু করার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। 
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে কী ধরনের জবাব দেয়া হবে এবং কখন দেয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের সামরিক কমান্ডার ও শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনা জোরদার করেছেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। দুই পক্ষের কেউই সমঝোতায় যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে মনে হওয়ায় সামরিক পরিকল্পনা আরো জোরদার হয়েছে।