ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ল অর্থনীতিতে নতুন ব্যয়ের চাপ

 আশরাফুল ইসলাম

Advertisement

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এবার ফার্নেস অয়েলের দামও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রতি লিটারে ১১ টাকা ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ফার্নেস অয়েলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা। এতদিন প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৯৬ টাকা ৮৬ পয়সা। গতকাল বুধবার জারি করা এক আদেশে বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন দর গতকাল বুধবার রাত ১২টার পর কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফার্নেস অয়েলের এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে একাধিক দিক থেকে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব  শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালন ব্যয় সরাসরি বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে। সরকার যদি বাড়তি উৎপাদনব্যয় ভোক্তার ওপর সরাসরি না চাপায়, তাহলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়তে পারে। আর ভর্তুকি বাড়লে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানা সরাসরি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে অথবা উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ব্যয় বাড়তে পারে। উৎপাদনব্যয় বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা তা পণ্যের দামে সমন্বয় করার চেষ্টা করতে পারেন। এতে শিল্পপণ্যের পাশাপাশি পরিবহন, নির্মাণ ও বিভিন্ন সেবার খরচেও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। এর আগে টানা দুই মাস ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়েছিল বিইআরসি। গত ৩০ জুন প্রতি লিটারের দাম ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সা থেকে কমিয়ে ১০৯ টাকা ১০ পয়সা করা হয়। পরবর্তী সময়ে দাম আরো কমে ৯৬ টাকা ৮৬ পয়সায় নেমে আসে। এবার এক ধাক্কায় ১১ টাকা ৯২ পয়সা বাড়িয়ে তা ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা করা হলো। অর্থাৎ সর্বশেষ কম দামের তুলনায় নতুন দর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৫ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল ও জেট এ-১-এর দাম নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসিকে দেয়া হয়। জানুয়ারিতে গণশুনানির পর ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে কমিশন। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সাথে সমন্বয় করে প্রতি মাসে নতুন দর ঘোষণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দেশের জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ফলে একদিকে বাজারদরের বাস্তব পরিবর্তন অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাবও দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ছে। ফার্নেস অয়েলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই প্রক্রিয়ারই একটি উদাহরণ।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানিব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করলে তা সামগ্রিক মূল্যস্তরে চাপ বাড়াতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণ, সরকারি ভর্তুকি নীতি এবং ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয় কতটা পণ্যের দামে স্থানান্তর করেন তার ওপর।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয় সরকার যদি বিদ্যমান বিদ্যুৎমূল্য কাঠামোর মাধ্যমে পুরোপুরি সমন্বয় না করে, তাহলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়তে পারে। এতে একদিকে সরকারের ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে বাজেটের অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আবার ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তার ব্যয় আরো বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। শিল্প খাতের জন্য জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করতে পারে, আবার কেউ উৎপাদন কমানো বা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে- যদিও এসব প্রভাবের মাত্রা খাতভেদে ভিন্ন হবে।