
আশরাফুল ইসলাম
* জুলাই শেষে বিল বন্ডেই আছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা
* তারল্য বাড়লেও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর এ কারণে ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত জুলাই শেষে সরকারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফিরছে না। এক দিকে ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ তারল্য জমা হচ্ছে, অন্য দিকে সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে না গিয়ে সরকারি সিকিউরিটিজসহ তুলনামূলক নিরাপদ খাতে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি এলেও অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, জুলাই ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট তরল সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৫১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা ‘এক্সেস লিকুইড অ্যাসেট’-এর পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে বাধ্যতামূলক তারল্য সংরক্ষণের বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট তারল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মোট তরল সম্পদের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্যের প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে বিধিবদ্ধ প্রয়োজনের বাইরে থাকা তারল্যের নিরাপত্তা-বাফার আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই বাড়তি তারল্যের বড় অংশ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে-সেটিই এখন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের প্রাপ্যতা বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগ যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে অর্থনীতিতে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেই মোট তরল সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে। জুলাই শেষে প্রচলিত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনের অতিরিক্ত তরল সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ ছিল প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের অতিরিক্ত তরল সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ ছিল প্রায় ৩৮ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত তরল সম্পদ প্রায় ২৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। বিদেশী ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ প্রায় ৪১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং অতিরিক্ত তরল সম্পদ প্রায় ১৫ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকগুলোর সরকারি অনুমোদিত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনুমোদিত সিকিউরিটিজে রাখা রয়েছে। নিরাপদ ও তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিনিয়োগ হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ব্যাংকগুলোর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের চাপ এবং ঋণ আদায়ের ঝুঁকি- সব মিলিয়ে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমেছে। এর বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক ঝুঁকি থাকে না এবং নির্ধারিত রিটার্ন পাওয়া যায়। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি সিকিউরিটিজ একটি তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য থাকা এবং সেই তারল্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহার হওয়া এক বিষয় নয়। অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে হলে ব্যাংকের অর্থ শিল্প, ব্যবসা, অবকাঠামো ও নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে যেতে হবে। ব্যাংকের অর্থ যদি মূলত সরকারি সিকিউরিটিজে আবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সরাসরি নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে না। বিশেষ করে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকঋণ গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিনিয়োগের সাথে সরাসরি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে শুধু বিনিয়োগ নয়, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য বৃদ্ধিকে তাই দুইভাবে দেখা যায়। একদিকে এটি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক। ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ ও তরল সম্পদ থাকলে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ এবং আকস্মিক তারল্যচাপ মোকাবেলা করা সহজ হয়। অন্য দিকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে না যায়, তাহলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি। ব্যাংকগুলো যখন ঝুঁকি কমাতে চায়, তখন প্রতিষ্ঠিত ও তুলনামূলক নিরাপদ গ্রাহকদের ঋণ দেয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। নতুন উদ্যোক্তা বা নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানত, ব্যবসার ইতিহাস এবং নগদ প্রবাহের নিশ্চয়তা না থাকায় ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংকঋণের পরিবর্তে নিজস্ব অর্থ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতে পারেন।
এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে। নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন কারখানা, উৎপাদন ইউনিট, সেবা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ কমে যায়। একই সাথে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চয়তার কারণে সম্প্রসারণ স্থগিত রাখে, তাহলে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরির গতি মন্থর হতে পারে।
তবে শুধু ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগকেই বেসরকারি বিনিয়োগ কমার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশ, সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক চাহিদা- এসব বিষয়ও বেসরকারি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে বাড়তি তারল্যকে কিভাবে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটিই নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে ব্যাংকের সম্পদের মান, খেলাপি ঋণ এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ানোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না; সেই ঋণ যাতে কার্যকর বিনিয়োগে যায় এবং পরে আদায়যোগ্য থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের একটি অংশ আবার বেসরকারি খাতে প্রবাহিত হতে পারে। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তা অর্থায়ন বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অযথা ঝুঁকি তৈরি না হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক দিকে ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে; অন্য দিকে সেই অর্থের একটি বড় অংশ বেসরকারি খাতের নতুন উৎপাদন ও বিনিয়োগে প্রবাহিত হচ্ছে না। সরকারি সিকিউরিটিজ ব্যাংকগুলোর জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করলেও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতিকে শুধু ব্যাংকিং খাতের স্বস্তির সূচক হিসেবে দেখলে হবে না। এই তারল্য কতটা শিল্প, ব্যবসা ও নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে যাচ্ছে এবং তার মাধ্যমে কতটা উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে- সেটিই হবে অর্থনীতির জন্য বড় প্রশ্ন। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের প্রাপ্যতা ও বাস্তব অর্থনীতিতে সেই অর্থের ব্যবহার- এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান কমানো না গেলে অতিরিক্ত তারল্য থাকলেও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কাক্সিক্ষত গতি ফিরতে সময় লাগতে পারে।









