ফের গণভোট আয়োজনের ঘোষণায় নতুন করে উত্তাপ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল 

Advertisement

আবারো গণভোটের আয়োজন করা হবে, সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটির এমন ঘোষণায় দেশীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধানের মৌলিক কিছু বিষয়ের পরিবর্তন করতে হলে ফের গণভোট দিতে হবে। অন্য দিকে সংসদের বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুনরায় নতুন করে গণভোটের আয়োজন জাতির সাথে নির্মম তামাশা। তারা বলছেন, গত ১২ ফেব্রয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত নেয়া হয়, সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার তাদের মতামত দিয়েছে। তাহলে আবার নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন কেন? অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে সংসদ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। একই সাথে বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি নতুন করে সঙ্কটের জন্ম দেবে। 
সূত্র মতে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদ ১৪২ সংশোধন করে গণভোটের বিধানটি বাতিল করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক সাংবিধানিক গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ভোটারদের ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ম্যান্ডেট চাওয়া হয়েছিল এবং প্রায় ৬৮.৫৯% ভোটার এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। পরবর্তী সময়ে দেশের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের পুরনো বিধান পুনরুদ্ধার লাভ করে। 
সূত্র মতে, গত রোববার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সাথে মতবিনিময়ে সরকারের পক্ষে কমিটি থেকে বলা হয়েছে, মৌলিক কাঠামোসহ সংবিধানের বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া হিসাবে আবারো গণভোট আয়োজনের চিন্তা করা হচ্ছে। ডিসেম্বরে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ওই সংশোধনী বিল আকারে আনা হবে। সংসদে তা পাস হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের আয়োজন করা হবে। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গণভোট হবে। ওই বৈঠকে বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক। পাশাপাশি সাংবাদিকদের কেউ কেউ ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। 
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ ব্রিফিংয়ে গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে আদেশ দিয়েছেন। এটা সংবিধানে আসবে। সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু জায়গায় যদি সংসদ কোনো পরিবর্তন আনে তাহলে তা গণভোটে দিতে হবে। সংসদে বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সই করার আগে সেটা গণভোটে দিতে হবে, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ আরো দু’টি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এগুলো ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে হলে গণভোট দিতে হবে সাংবিধানিকভাবে। 
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে। দলের নিজস্ব একটি রাজনৈতিক ইশতেহার রয়েছে। এখন যদি সংসদের বাইরে কোনো আদেশের বা সংস্কারের ওপর বারবার গণভোট করা হয়, তবে নির্বাচিত সংসদের সার্বভৌমত্ব ও গণভোটের ম্যান্ডেটের মধ্যে তীব্র সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কিছু বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি বিরোধী দলগুলোকে পুরোপুরি বাইরে রেখে বা তাদের দাবি উপেক্ষা করে এই বিল পাস করে, তবে রাজনীতিতে এই উত্তাপ ভবিষ্যতে সহিংস রূপ নিতে পারে। 
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া ও নতুন গণভোটের উদ্যোগের বিষয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, সংবিধান ‘সংশোধনের’ ধুয়া তুলে সরকার নতুন করে যে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা মূলত একধরনের স্বৈরতন্ত্রের স্পষ্ট আলামত। পুনরায় নতুন করে গণভোটের আয়োজন করা জাতির সাথে নির্মম তামাশা। তিনি সরকারের প্রশ্ন রেখে বলেন, যখন জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে পৃথকভাবে গণভোট আয়োজনের দাবি জোরালো করা হয়েছিল, তখন বিএনপি থেকে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, আলাদা গণভোটের আয়োজন করলে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হবে। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন যুক্তিতে নতুন করে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এবং এতে কি রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় হবে না? 
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জোনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নতুন করে গণভোটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে- একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত নেয়া হয়, আবার নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন কেন? গণভোটের মূল অর্থ- জনগণের সার্বভৌম রায়ের মর্যাদা- রক্ষা করা। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটের প্রশ্নে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মত ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং এখন নতুন করে একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয় গণভোটে আনার আগে সরকারকে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, আগের গণভোটের রায় তাহলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? তিনি বলেন, যদি আগের গণরায় কার্যকর ও বহাল থাকে, তাহলে একই বিষয়ে আবার গণভোটের প্রয়োজন কেন? আর যদি সরকার মনে করে আগের গণরায় পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, তাহলে তার সাংবিধানিক ভিত্তি কী? কোন আইন বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই রায়কে পুনরায় জনগণের সামনে নেয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু ‘নতুন গণভোট’ বললেই বিষয়টির সাংবিধানিক বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সাবেক এই সংষদ সদস্য আরো বলেন, গণভোট কোনো রাজনৈতিক দলের পছন্দ অনুযায়ী বারবার জনগণের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা নয়। গণভোট হলো জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি বিশেষ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তাই জনগণ একবার কোনো বিষয়ে রায় দিলে সেই রায়ের মর্যাদা, কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়ন- এই তিনটি বিষয় আগে স্পষ্ট করতে হবে। সরকার যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে, জনগণ অবশ্যই তা বিচার করবে। কিন্তু আগের গণরায়ের সাংবিধানিক অবস্থান অস্পষ্ট রেখে নতুন গণভোটের প্রশ্ন তোলা হলে সেখানে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। কারণ গণতন্ত্র শুধু ভোট নেয়ার নাম নয়। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা হলো- জনগণ ভোট দেয়ার পর রাষ্ট্র সেই রায়কে কতটা সম্মান করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোট প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়। জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গণভোটের অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হয়নি। তবে তারা গণভোটকে ধারণ করেন, জুলাই সনদকে ধারণ করেন। সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর কিছু বিষয়ে আবার গণভোট দেয়ার প্রয়োজন হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটেছে। এখন আবার নতুন করে গণভোটের কথা বলা সরকারের অপকৌশলেরই অংশ। কিন্তু দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শিব্বির আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার যে এতদিন বলেছে- “সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদ-ই যথেষ্ট, সংসদেই সংশোধনী করা যাবে। গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদ করার দরকার নেই।”  এটা অসত্য বক্তব্য ছিল। বিরোধী দলের যে বক্তব্য ছিলো ‘জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো করার ক্যাপাসিটি সংসদের নাই, এখানে মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন করতে হবে যার জন্য গণভোট লাগবে এবং জনগণ সে রায় দিয়েছে। সুতরাং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা দরকার’। সেটাই সত্য বয়ান হিসেবে স্বীকার করতে সরকার বাধ্য হলো।
তিনি বলেন, এতদিন সরকার জনগণের সাথে আরেকটা প্রতারণা করল। জনগণকে ভুল বুঝাল। জনগণের দেয়া রায়কে অবজ্ঞা করল। এখন আবার জনগণের কাছে গণভোটের জন্য দ্বারস্থ হচ্ছে। আবার গণভোট করা জাতির সাথে তামাশা। জনগণ তো তাদের রায় দিয়েই দিয়েছে। এখন একই ভোট আবার করা দেশের অর্থের অপচয়। আর এভাবে নিজেরা সব ঠিক করে দিয়ে জনগণের কাছে গণভোটের জন্য যাওয়া তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। এটা জনগণের চাওয়া পাওয়ার ভিত্তিতে নয়, বিএনপির চাওয়া পাওয়ার ভিত্তিতে সরকারের মনমতো সংবিধান সংশোধন। এ গণভোট আয়োজন জনগণের মতামতের জন্য নয়, বরং নিজেদের মতামত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়ার আয়োজন। 
তিনি আরো বলেন, এ সংশোধনীতে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন নয়, বরং ফ্যাসিবাদি কাঠামো টিকিয়ে রাখার দলীয় বন্দোবস্ত হবে। আগের মতোই থাকবে, সামান্য কিছু সংস্কার আসবে, এতে ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভাঙবে না। একই দিনে একই আদেশে হওয়া দুইটা ভোটের একটার মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করল, অন্যটাকে ডিনাই করল, বাতিল করে দিচ্ছে। এটা বিএনপির একটা ঐতিহাসিক ভুল হয়ে থাকবে এবং আমাদের গণতন্ত্রের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে এ উদাহরণ দেখিয়ে অন্য কেউও জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবার এক্সকিউজ পাবে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন করে গণভোটের কথা বলা ভেল্কিবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি চোখে ধুলো দেয়ার মতো। তিনি বলেন, তারা যে সংশোধনের কথা বলছে, সেগুলো তো জুলাই জাতীয় সনদেই রয়েছে। সেই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই তো গণভোট হয়েছে। সেই গণভোটে জনগণ সংবিধানের সেই মৌলিক কাঠামোগুলো পরিবর্তনের পক্ষেই ভোট দিয়েছে। তাহলে এখন আবার কিসের গণভোট, এটা তামাশা। তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বা পরিবর্তনের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটই যথেষ্ট। নতুন করে গণভোটের কোনো প্রয়োজন নেই।