
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ‘জাতিগত নিধন’ থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালে আগস্ট থেকে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এরপর আরাকান আর্মির দমন-পীড়ন থেকে রক্ষা পেতে আরো দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। আর আগে থেকেই বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের শিকার হয়ে আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাথ এবং ভাসানচরের ক্যাম্পগুলো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মি ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে সশস্ত্র সঙ্ঘাতে কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জটিলতার মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করলেও মিয়ানমার সরকার গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি। নানা টালবাহানায় মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখেছে।
২০১৭ সালের পর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনগুলোতে যোগ দেয়া বাংলাদেশের সরকার প্রধানরা রোহিঙ্গা ইস্যুটি তুলে ধরে তা সুরাহার জন্য অনেক প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এ সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, ইরানসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে নতুন করে সঙ্ঘাত দেখা দিয়েছে। এই কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমছে। রোহিঙ্গা ইস্যুটির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ধরে রাখাটা এখন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে এবং সাইডলাইনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সঙ্কটটির প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সুরাহার জন্য দিয়েছেন পাঁচ দফা প্রস্তাব। এ সব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা, রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা বজায় রাখা, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দেয়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবেলায় আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। এ সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশ্ব ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি মানবিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কটের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইউএনজিএতে তুলে ধরা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক চাপ। এ জন্য চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এই অঞ্চলে যে সব দেশের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তাদেরকেও সাথে নেয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে জাতিসঙ্ঘে উত্থাপিত প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য- জানতে চাইলে চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার প্রধান হিসাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে উত্থাপন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সঙ্কটের সুরাহায় একটি রোডম্যাপের ওপর জোর দিয়েছেন। এই সঙ্কটের কথা আন্তর্জাতিক ফোরামে আমাদের অব্যাহতভাবে বলতে হবে, যাতে ইস্যুটি দৃষ্টির আড়ালে চলে না যায়। প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর চীনের প্রভাব রয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের সুরাহার জন্য বাংলাদেশ বারবার চীনের সহযোগিতা চেয়ে আসছে। কিন্তু রাখাইনে বিবদমান দুই পক্ষকে রোহিঙ্গা সঙ্কট সুরাহার জন্য চীন যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করছে না বলে আমার ধারণা। জাপান, রাশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো বন্ধু দেশগুলো এই সঙ্কট নিরসনে ঐকবদ্ধভাবে কাজ করলে একটা সুরাহার পথ বের হতে পারে।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে ইউএনজিএর অধিবেশনগুলোতে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি উত্থাপন করে আসছে। কিন্তু এতে খুব একটা কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া রোহিঙ্গা সঙ্কটের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে গত ৯ বছরেও বাংলাদেশ সফল হলো না কেন- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এর অন্যতম কারণ হল এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ইস্যু না। বাংলাদেশের অনেক বড় বড় সমস্যা রয়েছে। রোহিঙ্গারা মূলত দেশের একটি কোনায় উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তায় ক্যাম্পগুলো চলছে। কিন্তু একদিন না একদিন এই সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেবে। এ কারণেই আমাদের সতর্ক হতে হবে। সমস্যাটি সুরাহার চেষ্টার পাশাপাশি নিরাপত্তাসহ অন্যান্য দিকে আমাদের কড়া নজর রাখতে হবে। মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসাটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ লাগোয় পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সুযোগ পেলে এ সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পুশইন করা হবে।
রাখাইনের বেশির ভাগ এলাকা আরাকান আর্মির দখলে, যারা রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাষ্ট্র বহির্ভূত শক্তির সাথে বাংলাদেশ কিভাবে সমঝোতা করতে পারে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশাল অ্যান্ড স্ট্রাটিজিক স্টাডিসের (বিআইআইএসএস) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, আরাকান আর্মির ওপর চীনের প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ থাকার কথা বলেছেন। এই যোগাযোগটা অব্যাহত রেখে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, সঙ্কট নিরসনের অনেক উদ্যোগ আমরা নেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারি না। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির বলেছেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রতি বছরই আলোচিত হচ্ছে। এই সমস্যাটি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনের পাশাপাশি সমাধানে জন্য কাজে লেগে যাওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কূটনীতির যত ধরনের সৃজনশীলতা আছে, যার যার সাথে কাজ করলে এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে, তাদের সাথে নিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু একটি জটিল সমস্যা। এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান আমরা দেখছি না। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই সমস্যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকী হয়ে উঠতে পারে। তাই রোহিঙ্গা সঙ্কট সামাধান ও তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের উদ্যোগী ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে যে সব দেশের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, তাদেরকেও সাথে নেয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।









