আকাশসীমার অনুমতি না মেলায় আটকে গেল রূপপুরের জ্বালানি

 বিশেষ সংবাদদাতা

রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত পারমাণবিক জ্বালানি সময়মতো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি। ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা থাকা বিশেষ কার্গো বিমানটি শেষ মুহূর্তে আসতে না পারার কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। কোন দেশের আকাশসীমার অনুমতি পাওয়া যায়নি, তা এখনো জানানো হয়নি। এ দিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রসাটম বিকল্প রুট ব্যবহার করে আগামী মাসে জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে এই ঘটনাটি দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহনে আন্তর্জাতিক আকাশপথ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক অনুমতির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিশেষ কার্গো বিমানে করে রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানি ঢাকায় আসার কথা ছিল। হজরত শাহজালাল )রহ:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জ্বালানি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বিমানটি ঢাকায় না পৌঁছলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রসাটমের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করেন। তখন তাদের জানানো হয়, প্রয়োজনীয় আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় জ্বালানি বহনকারী বিমানটি আসতে পারেনি। তবে কোন দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া যায়নি এবং কেন সেই অনুমতি মেলেনি- এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। রসাটমের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে নির্ধারিত ফ্লাইটের সুনির্দিষ্ট রুট বা বাতিলের কূটনৈতিক কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে অনুমতি পাওয়া যায়নি।
একাধিক দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের প্রয়োজন
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক কার্গো পরিবহনের মতো নয়। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে এ ধরনের জ্বালানি পরিবহন করতে হয়। রাশিয়া থেকে বিশেষায়িত কার্গো বিমানে করে বাংলাদেশে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে বিমানটি যে যে দেশের আকাশসীমা অতিক্রম করবে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমদন ও ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে সাধারণত মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের আকাশপথ ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকে। প্রচলিত একটি রুটে কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের আকাশসীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ভারতীয় ভূখণ্ডে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বিমানের যাত্রাবিরতির ব্যবস্থাও থাকতে পারে। তবে এবার ঠিক কোন রুট নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং কোন পর্যায়ে অনুমতির জটিলতা তৈরি হয়, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ কারণে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে জ্বালানি সরবরাহে বাধা দেয়ার জন্য দায়ী করার মতো আনুষ্ঠানিক তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি।
‘নিউক্লিয়ার ডিপ্লোম্যাসি’র গুরুত্ব
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের সাথে শুধু প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিই নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সমন্বয়ও জড়িত। সাবেক এক কর্মকর্তা মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (ওঅঊঅ) সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং বাংলাদেশের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পাশাপাশি পরিবহনপথে থাকা দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমতিও নিশ্চিত করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সময়মতো ছাড়পত্র না পাওয়া গেলে একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত কার্গো ফ্লাইটও আটকে যেতে পারে। ফলে পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমন্বয়কে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির সমান গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর। রূপপুরে এর আগের জ্বালানি চালানগুলোও বিশেষ বিমানে ঢাকায় আনার পর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে সড়কপথে পাবনায় প্রকল্প এলাকায় নেয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের তৃতীয় জ্বালানি চালানও বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসার পর সেনাবাহিনীর বিশেষ ব্যবস্থায় প্রকল্প এলাকায় নেয়া হয়েছিল। 
বিকল্প রুটে জ্বালানি আনার পরিকল্পনা
আকাশসীমাসংক্রান্ত জটিলতার পর রসাটম এখন বিকল্প রুট বিবেচনা করছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে চীন ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি আনার পথ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন রুট ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমতি, বিমান চলাচল পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাস থেকে আবার জ্বালানি পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী একাধিক ফ্লাইটে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আনার পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের কিছু জ্বালানিও বাংলাদেশে আনার কথা রয়েছে।
দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ কতদূর
রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিকসহায়তায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দু’টি ঠঠঊজ-১২০০ ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং দু’টি ইউনিট মিলিয়ে মোট সক্ষমতা প্রায়  দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ এখনো চলমান। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বর্তমান বিলম্বের কারণে ইউনিটটির তাৎক্ষণিক কমিশনিং কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার কথা নয়। সাম্প্রতিক প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার সময় নির্মাণ, পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।  পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম তিন বছরের জ্বালানি রাশিয়া সরবরাহ করবে। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রয়োজনীয় জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানি করতে হবে। ফলে এখনকার মতো আন্তর্জাতিক পরিবহন ও আকাশসীমার অনুমতির বিষয়টি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। 
প্রথম ইউনিটেও জটিলতা
দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি পরিবহনে বিলম্বের সময়েই রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচিও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। প্রথম ইউনিটে ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং শুরু হয় এবং ১২ মে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে লোড করার কাজসম্পন্ন হয়। এরপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ এগোলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ধারিত সময় পিছিয়ে যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সেফটি ভালভ প্রত্যাশিতভাবে কাজ না করায় পরবর্তী কমিশনিং ধাপে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ত্রুটির সমাধানে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। এর আগে চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ভাল্ব-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এবং নতুন নির্দিষ্ট তারিখও নিশ্চিত করা হয়নি। 
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি পরিবহনে সর্বশেষ এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ শুধু উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এর সাথে তৃতীয় দেশের আকাশসীমা, আন্তর্জাতিক অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক সমন্বয়ও সরাসরি যুক্ত। ভবিষ্যতে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের ব্যবহৃত জ্বালানি বা পারমাণবিক বর্জ্য রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন হলে একই ধরনের আন্তর্জাতিক পরিবহনসংক্রান্ত অনুমতির প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে নিয়মিত নতুন জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য একাধিক পরিবহন রুট, প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমঝোতা, আগাম ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সমন্বয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রি-অ্যাক্টর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- রাশিয়া কোন বিকল্প রুটে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি বাংলাদেশে পাঠাবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমতি কত দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভাল্বের ত্রুটি কবে সমাধান হবে এবং কবে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে- সেটিও রূপপুর প্রকল্পের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।