
গ্যাসসঙ্কটে দেশের শিল্প খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সাথে গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় একদিকে যেমন উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে রফতানি আদেশ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। দীর্ঘস্থায়ী এই জ্বালানি সঙ্কট অব্যাহত থাকলে শিল্পের ক্ষতির পরিধি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সঙ্কট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রফতানি এবং শিল্পের সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে একদিকে কারখানার উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে অনেক ইউনিট আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঙ্কটের শুরুতে ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ১৭ শতাংশ কমে যায়। পরবর্তী সময়ে এলএনজি সরবরাহে আরো বিঘœ তৈরি হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ অনেক ক্ষেত্রে শূন্য থেকে ২-৩ পিএসআইয়ে নেমে আসে। অথচ ভারী শিল্পের বয়লার ও বিভিন্ন উৎপাদনযন্ত্র সচল রাখতে সাধারণত ১০ পিএসআই বা তার বেশি চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না।
এদিকে গ্যাসের অভাবে নরসিংদীর মোমিন টেক্সটাইল মিল সঙ্কটে। কারখানাটির ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি বন্ধ হয়ে গেছে। দৈনিক ২২-২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ৮-১০ হাজার ঘনফুট। দৈনিক কয়েক লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ২০ হাজার গজে। কারখানাটির ২,৫০০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ জন বর্তমানে কাজের বাইরে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০ লাখ গজের বিদেশী অর্ডার থাকলেও তা সময়মতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসসঙ্কটে পোশাক খাতের ডাইং, ওয়াশিং ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ঘাটতি কিছুটা সামাল দেয়া গেলেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে সময়মতো রফতানি নিশ্চিত করতে অনেক কারখানাকে অতিরিক্ত সময় জেনারেটরে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইল বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে। নরসিংদীর চাওলা শিল্প এলাকায় অন্তত ৫০টি কারখানা গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাঠ ব্যবহার করছে এবং প্রতিটি কারখানায় দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। স্থানীয় শিল্প মালিকদের হিসাবে শুধু চাওলা এলাকার কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ায় দৈনিক ক্ষতি প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে আবেদ টেক্সটাইল মিলের উৎপাদন টানা ২০ দিন বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কারখানাটির ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের বদলে শ্রমিকদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে রাখার চেষ্টা করেছে, যাতে কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আতঙ্ক না বাড়ে।
তিথি টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে যাওয়ায় প্রায় আড়াই লাখ গজ রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত কাপড় নষ্ট হয়েছে। কারখানাটির উৎপাদন ও জেনারেটর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফাজলে শামিম এহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রায় ৭৮ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানায় আংশিক উৎপাদন বন্ধ হয়েছে এবং ৮৭ শতাংশ কারখানায় শিপমেন্ট বিলম্ব হয়েছে। তিনি বলেন, সঙ্কট কত দিন চলবে- এ বিষয়ে অনিশ্চয়তাই ব্যবসার জন্য বড় সমস্যা। নির্দিষ্ট সময়ের বিলম্ব জানা থাকলে উদ্যোক্তারা পরিকল্পনা করতে পারেন; কিন্তু অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ও রফতানি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের সৈকত টেক্সটাইলের ডাইং কার্যক্রমও গ্যাসের অভাবে বন্ধ ছিল। কারখানায় উৎপাদনের পরিবর্তে ওয়েল্ডিং ও মেরামতের কাজ চলছিল। একই এলাকার ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং কারখানাতেও স্বাভাবিক উৎপাদনের বদলে নীরবতা নেমে আসে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ও রফতানি উভয়ই চাপে পড়ছে। তিনি জানান, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পরবর্তী মৌসুমের অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখাচ্ছেন। উৎপাদন বিলম্ব হলে রফতানি সময়সীমা রক্ষায় এয়ার শিপমেন্টের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে যা উদ্যোক্তাদের ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ক্ষেত্রে সঙ্কটটি সরাসরি রফতানিতে আঘাত করেছে। ডাইং কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি টানা সাত দিন বন্ধ রাখতে হয়। পরে খুললেও একদিনের মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ হাজার ডলারের পণ্য বিমানে পাঠাতে বাধ্য হয় এবং শ্রমিকদের প্রায় ১৪ দিন কাজ না থাকলেও মজুরি দিতে হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
এদিকে আশুলিয়ার এআর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডের উৎপাদন সঙ্কট আরো তীব্র। কারখানাটির দৈনিক সক্ষমতা ৫০ হাজার পিস হলেও বাইরে থেকে গ্যাস সংগ্রহ করেও সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ অব্যবহৃত থেকেছে; সঙ্কটের একপর্যায়ে পুরো কারখানাই বন্ধ হয়ে যায়।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল টেক্সটাইল শিল্পে গ্যাসসঙ্কটকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ক্যাপটিভ পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল টেক্সটাইল মিলগুলো গ্যাসের কম চাপের কারণে সমস্যায় পড়ছে। সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের একটি কার্যকর ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, যাতে বিদ্যমান শিল্পগুলো উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে।
গাজীপুরের স্প্যারো অ্যাপারেলসে গ্যাসের চাপ কম থাকায় ডেনিমের প্রেসিংয়ের মতো যান্ত্রিক কাজ হাতে করতে হচ্ছে। একই অঞ্চলের মিতালী ফ্যাশনের ডাইং বিভাগ আট দিন বন্ধ থাকায় ৩০টি সেলাই লাইনের ১৮টিই অলস পড়ে আছে। এদিকে গাজীপুরের পারাগন সিরামিকসও এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসসঙ্কটে ভোগছে। এদিকে গ্যাসসঙ্কটের মধ্যে এবিএম ফ্যাশন সাময়িক বিরতির পর উৎপাদন শুরু করলেও আজিম টেক্সটাইলের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের ঘাটতি তখনো উৎপাদন চালানো কঠিন করে তুলেছে। লিড টাইম অ্যাপারেলসে গ্যাস ও বিদ্যুৎসঙ্কট প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এবং জেনারেটরও সচল রাখা যাচ্ছে না।
এদিকে চট্টগ্রামের ভারী শিল্পগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ইস্পাত, সিমেন্ট ও কাচ কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান প্রায় অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় প্রায় ১,২০০ ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিল্পের এই সঙ্কট শুধু কারখানার গেটের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমলে প্রথমে কমে কাজের ঘণ্টা ও ওভারটাইম। এরপর কাঁচামাল সরবরাহে সমস্যা হয়, রফতানি পণ্য প্রস্তুতিতে বিলম্ব হয়, ক্রেতাকে বাড়তি পরিবহনব্যয় বা ছাড় দিতে হয়। দীর্ঘ হলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, জ্বালানি সঙ্কট এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট শিল্পের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অর্থায়ন ও ট্রেড ফাইন্যান্সের সমস্যাও শিল্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এদিকে তিনি বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনায় শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।









