হামলা, দখল, গুলি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সালমান মুক্তাদির
মিরপুর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা । নয়া দিগন্ত

 

Advertisement

রাজধানীতে জমি ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘাতের নতুন এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। একই সময়ে রাজধানীর দুই প্রান্তে অস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার, বাড়ি ও স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে সশস্ত্র একটি দল গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঢুকে কনটেন্টক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্য দিকে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে পিস্তল, রামদা ও চাপাতি নিয়ে ১৫-২০ জনের একটি দল একটি আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাড়ির বাসিন্দারা। ইসিবি চত্বরের ঘটনায় সালমান মুক্তাদিরের মামলায় প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি স্টুডিওর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন এবং এর জন্য বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক বক্তব্যে ঘটনাটিকে জমিজমা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের ফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত নেপথ্য, কারা পরিকল্পনাকারী এবং কার স্বার্থে হামলা হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল রাত পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে প্রধান আসামি শাহরিয়ার, রাজধানীর ভাসানটেক বস্তির মো: মামুন, মজুমদারের মোড়ের আসলাম ও মুন্না রয়েছেন। আরেকজনের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পাঁচ পিকআপে এসে গুলি
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিউগিনি প্রপার্টিজের কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি পাঁচটি পিকআপে করে নিউগিনি প্রপার্টিজে ঢোকে। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সেখানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চলে।
নিউগিনি প্রপার্টিজের কর্মকর্তা মো: পল্লব আলী বলেন, হামলাকারীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে হাউজিংয়ের ভেতরে ঢোকে। প্রবেশমুখের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকে তারা লুটপাট করে এবং মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে যায়।
এরপর হামলাকারীরা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে যায়। সেখানে ব্যাপক ভাঙচুরের পাশাপাশি বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়। হামলা থেকে রেহাই পায়নি নিউগিনি প্রপার্টিজের অফিসও। নির্মাণশ্রমিকদের মারধর করে তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন পল্লব আলী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে হামলাকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। কয়েকটি গুলির শব্দও শোনা যায়। হামলাকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় একপর্যায়ে পুলিশ পিছু হটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে একটি ফটক ভেঙে হামলাকারীরা বেরিয়ে যায়।
‘তিন কোটি টাকার ক্ষতি’
হামলার পর সালমান মুক্তাদির তার ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিওর ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরা, ভাঙা সোফা, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দেখা যায়। তার দুই সহকর্মীকেও কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
সালমান বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্টুডিওটি তৈরি করেছিলেন। সেখানে ক্লায়েন্টদের গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ, শুটিংয়ের সরঞ্জামসহ নানা সামগ্রী ছিল। এসব নষ্ট ও হারিয়ে যাওয়ায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, ভবিষ্যৎ কাজ নিয়েও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কাজ বন্ধ করবেন না বলে জানান তিনি। তার মামলায় প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জমির বিরোধেই কি সশস্ত্র হামলা?
ঢাকা মহানগর  পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম গতকাল দুপুরে নিউগিনি হাউজিং এলাকায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে। জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিউগিনি প্রপার্টিজে দুই পক্ষের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। এক পক্ষ তাদের জমিতে যেতে পারছিল না। পরে ওই পক্ষের লোকজন সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই একপর্যায়ে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে- জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও পাঁচটি পিকআপে করে বিপুলসংখ্যক লোকের আসা, আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, গুলি ছোড়া, একাধিক স্থাপনায় হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা কিভাবে ঘটল? কারা তাদের সংগঠিত করেছিল? অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এলো? হামলাকারীদের কাছে আগেই কি লক্ষ্যবস্তু ও স্থাপনার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আদাবরে একই ধরনের আরেক ঘটনা
ইসিবির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর আদাবরে একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি আটতলা বাড়ির সামনে ১৫-২০ জনের একটি দল জড়ো হয়। তাদের কয়েকজনের হাতে চাপাতি ও রামদা ছিল। একজনকে পিস্তল হাতে দেখা যায় বলে বাড়ির বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।
বাড়িটির মালিক ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান। তার ভাতিজা মনির হোসেনের অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়ির প্রধান ফটক খুলে সবাইকে বের হয়ে যেতে বলে। তারা ‘টাকা দে, বাড়িতে থাকিস, টাকা দিস না- বের হ’- এ ধরনের কথা বলতে থাকে। একপর্যায়ে চাপাতি ও রামদা দিয়ে গেটে কোপানো শুরু করে।
বাড়ির সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ও জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়। ইট ছুড়ে দ্বিতীয় তলার আরো দু’টি জানালার কাচও ভাঙা হয় বলে অভিযোগ করেন মনির।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে না পেরে প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
মনির হোসেন দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও একবার বাড়িটি দখল করা হয়েছিল। শনিবারের ঘটনার সাথে আগের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ বাড়িটি পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দখল বিরোধ থেকে সন্ত্রাস- নতুন উদ্বেগ
রাজধানীতে জমি ও বাড়ি দখলের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে তা হলো- দখল বা সম্পত্তি বিরোধের সাথে প্রকাশ্য অস্ত্রের ব্যবহার ও দলবদ্ধ হামলার অভিযোগ যুক্ত হচ্ছে।
ইসিবির ঘটনায় হামলাকারীরা পাঁচটি পিকআপে করে এসেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তার বক্তব্য। আদাবরের ঘটনায় ১৫-২০ জনের একটি দল অস্ত্রসহ বাড়ির সামনে উপস্থিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দু’টি ঘটনাতেই লক্ষ্যবস্তু ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি। একটি ঘটনায় ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে; অন্যটিতে বাড়ির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিই হয় না; সম্পত্তির নিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে কোনো সম্পত্তি বিরোধ যদি সশস্ত্র দল নিয়ে মীমাংসার চেষ্টা পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে প্রচলিত আইনগত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক অভিযোগ, তদন্তে ভিন্ন চিত্র
সালমান মুক্তাদির তার ভিডিও বার্তায় হামলার জন্য বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। অন্য দিকে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের পরিবর্তে জমির বিরোধকে ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এই ঘটনায় দু’টি বিষয় আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি- এক. হামলার তাৎক্ষণিক কারণ কী; দুই. হামলার পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা।
তদন্তে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যবহৃত পিকআপগুলোর মালিকানা ও গতিবিধি, অস্ত্রের উৎস এবং হামলার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় বার্তা
ইসিবি ও আদাবরের দু’টি ঘটনা একই সূত্রে যুক্ত- এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলোর সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ভিন্ন। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই সম্পত্তি দখল বা বিরোধকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘবদ্ধভাবে হামলার অভিযোগ রয়েছে।
একটিতে গুলি ছোড়ার অভিযোগ, অন্যটিতে পিস্তল-রামদা-চাপাতি প্রদর্শনের অভিযোগ। ফলে দু’টি ঘটনা রাজধানীতে সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ কতটা দ্রুত সহিংস রূপ নিতে পারে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
ইসিবির ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেফতার শুরু হয়েছে। আদাবরের ঘটনাতেও তদন্ত চলছে। এখন তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হতে পারে- এসব কি বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির নতুন তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-  কে হামলা করেছে তা নয়; প্রশ্ন হলো- রাজধানীতে জমি ও সম্পত্তির বিরোধ মেটাতে আইনের বদলে অস্ত্রধারী দল নামানোর সাহস তারা কোথা থেকে পাচ্ছে?
দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসঙ্কেত : টিআইবি
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মধ্যরাতে পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখল; কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হওয়া এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয় উল্লেখ করে এসব সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসঙ্কেত বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 
গতকাল এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সংগঠনটি বলছে, বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় এই হামলা চালানো হয়।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপিতে লুটপাট, ভাঙচুর ও জবরদখলকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য ‘বিব্রতকর দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব-অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে? রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতাকর্মীদের এ জাতীয় কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে?’
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা দলীয় নেতাকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কি?’
‘এক্ষেত্রে সরকারি দল যদি তাদের দুর্নীতিবিরোধী নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের আর সুযোগ বা ক্ষমতা তারা চাইলেও পাবেন না। অন্তত নিকট অতীতের দৃষ্টান্ত সেটাই বলছে। শক্ত হাতে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে দমন করতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, তখন হয়তো কিছুই করা সম্ভব হবে না।’
ড. ইফতেখার বলেন, আগস্ট ২০২৪ থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে সারা দেশে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তৃণমূলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দলটির অনেক নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন, যা গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সাথে আলোচিত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘দৈনিক, মাসিক ও এককালীন চাঁদাবাজির এই অপতৎপরতা শুধু চলমান থাকেনি, বরং সরকারের একজন মন্ত্রী যখন ‘চাঁদাবাজি দুর্নীতি নয়, সমঝোতার লেনদেন’ মর্মে একাধিকবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলশ্র“তিতে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি অধিকতর স্বাভাবিকতা লাভ করায় ওই ঘটনাগুলো ঘটছে, যা সরকারের জন্য অশনিসঙ্কেত।’
কিশোরগঞ্জের জলমহাল দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ এবং ক্রিয়েটিভ স্টুডিও ভাঙচুরের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকে সংঘটিত ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা মাত্র, যা সরকারের যাবতীয় ভালো উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকে ম্লান করে জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা উপস্থাপন করার জন্য যথেষ্ট।
ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় নেতাকর্মীদের এ ধরনের অপতৎপরতায় উচ্চপর্যায় থেকে বিব্রতবোধ করে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হলেও একদিকে কঠোরতর প্রতিরোধমূলক কৌশলের ঘাটতি এবং অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মূলত সরকারি দলের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরং বাস্তবে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যার বহুমুখী দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। তাই অবিলম্বে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে টিআইবি।