জমি দখল, কিশোর গ্যাং, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, হামলা, ভাঙচুর
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ইন্টারনেট

 

* ভাড়াটে কিশোর গ্যাং দিয়ে তাণ্ডবের শুরু 
* আটক, মামলা ও কর্মকর্তাদের বদলিতেই শেষ পুলিশিং  কার্যক্রম

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি জবরদখল, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। আর এসব কাজে ভাড়াটে কিলার ও রাতের অন্ধকারে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মী ও এমপিরাও এই হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের নেপথ্যে জড়িত। ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গুঞ্জল উঠেছে, নির্দেশদাতা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের গ্রেফতার না করে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদেরই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। রাঘববোয়াল প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে ফের একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। গত শনিবার মধ্যরাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির চাঁদাবাজরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হলে গতকাল মামলার প্রধান আসামি শাহরিয়ারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মামলায় প্রায় তিন কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সালমান। 
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধনীর মিরপুরের একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র দখলের জন্য ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুই শতাধিক মানুষ। এই ঘটনার মূল হোতা হিসেবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এক নারী এমপির বিরুদ্ধে। শত কোটি টাকার ওই জমি দখলে দীর্ঘদিন মরিয়া হয়ে ছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। এর একদিন পর শনিবার মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে কিশোর গ্যাং দিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়। গতকাল বিকেলে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হলে ওই মামলায় মো: লিমন ও রমা. এনোয়ার হোসেন সাদ্দাম নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।  
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক প্রলোভন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে ভূমিদস্যু ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র সাধারণ মানুষের জমি জবরদখলের অপচেষ্টা চালায়। জমিসংক্রান্ত সঙ্ঘাত বন্ধ করতে হলে কেবল শাস্তি বাড়িয়েই সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিকমুক্ত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক তদন্ত। 
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ শনিবার বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে যেকোনো ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের অবস্থান সবসময় স্পষ্ট। কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। কোনো ধরনের দখল, বেআইনি বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না। যারা এসব করবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ডিএমপি কমিশনারের এমন বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই ইসিবি চত্বরে সালমান মুত্তাদিরের প্রতিষ্ঠানে এমন ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। 
শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইদানীং জমি দখল সংক্রন্ত সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় জমির বিরোধ থেকে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হন ১৫ জন। গত শুক্রবার নাটোরের সিংড়া উপজেলায় ঈদগাহ মাঠের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন।
জমি দখল ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিকমুক্ত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে এবং পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা না নিলে কেবল কাগজে-কলমে কঠোর আইন তৈরি করে জমি দখল ও হামলা থামানো সম্ভব নয়।
নেপথ্য কথা : মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র  রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ১০ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। বিরোধ থেকে মধ্যরাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, একটি পক্ষ জমি তাদের পারিবারিক সম্পত্তি বলে দাবি করছে। ওই পরিবারের সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা আছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা এখন এলাকাছাড়া। আরেকটি পক্ষ ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে দখলের চেষ্টা করছে। জমিটি নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা ও রিট রয়েছে। রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেছেন, ১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে জমিটি পান তারা। পরে কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। সবশেষ নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯৮৩ সালে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে অনাপত্তি পত্র পান।
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর রোডে ভবনসহ ১১ কাঠা জমি আব্দুল্লাহ আল মামুনের মায়ের নামে থাকলেও জমিটি স্থানীয় কয়েকজন দখলের চেষ্টা করছেন বলে থানার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এ দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজে রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জমির দখল-বেদখল কেন্দ্র করে হয়েছে উল্লেখ করে গতকাল ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো: মাহিদুল ইসলাম বলেছেন, এটা একটা হাউজিং বিজনেস, সেখানে একদলে অন্য দলের জমি দখল-বেদখল নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। তবে চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা এখনো তদন্তে উঠে আসেনি। 
ভাইরাল না হলে সহায়তা পায়! ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভাইরাল না হলে সহায়তা পাওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এগিয়ে আসে না। ঘটনার আসেপাশেই থাকছে থানা-পুালিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তবুও কেউ সহায়তা করে না। মিরপুরের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রটি ভাঙচুর ও লুটপাটের কাছেই শাহআলী থানা। ঘটনাটি দীর্ঘসময় ধরে হলেও থানা-পুলিশ সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। ঘটনার পরে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক পুলিশের ব্যবস্থা ও শাহআলী থানার ওসিকে প্রত্যাহারও করে ডিএমপি। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে মোহাম্মদপুরে জমি দখল ও ভাঙচুরের ঘটনাটি ভাইরাল হলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা ও ভাঙচুরে সালমান মুক্তাদিরের কাছে চাঁদা দাবির বিষয়টি সামনে নিয়ে এলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। 
দুর্বল ও অসহায়দের টার্গেট : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির ব্যবহার করে দুর্বল ও অসহায়দের টার্গেট করে জোরপূর্বক জমি দখল করা হয়। দেখা যায় প্রবাসী, সংখ্যালঘু পরিবার, বিধবা বা প্রবীণ ব্যক্তি এবং এলাকা থেকে দূরে থাকা জমি মালিকদের টার্গেট করে জোরপূর্বক জমি দখল করা সবচেয়ে সহজ হয়, কারণ তারা সহজে প্রতিবাদ বা সঙ্ঘাত করতে পারে না। মালিক জমি কিনে ফেলে রাখলে বা নিয়মিত তদারকি না করলে দখলদাররা সুযোগ বুঝে রাতে সীমানা প্রাচীর বা টিনের ঘর তুলে ফেলে। দখলদারিতে ভাড়া করা হয় কিশোর গ্যাং সদস্যদের। 
মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় টাকার বিনিময়ে কিশোর গ্যাং সদস্য ভাড়া করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যাহারকৃত শাহআলী থানা ওসি জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, ৩০০ থেকে ১০০০ টাকায় ওইদিন রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভাঙচুরের জন্য কিশোর গ্যাং সদস্যদের ভাড়া করা হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদপুরের জমি দখল ও ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলায়ও।   
পুলিশের পরামর্শ, হামলা-ভাঙচুর ও জোরপূর্বক দখলের ক্ষেত্রে প্রথমে আইনের সহায়তা নেয়া উচিত। ঘটনাস্থলে বা আক্রমণের সময় দ্রুত পুলিশি সহায়তার জন্য ৯৯৯-এ কল করতে হবে। মারধরের শিকার হলে চিকিৎসা শেষে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট নিয়ে নিকটস্থ থানা-পুলিশের কাছে যাবেন। থানার এজাহারে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ (স্থান, সময়, আসামিদের নাম ও অপরাধের বিবরণ) উল্লেখ করে মামলা করতে হবে। থানা যদি এজাহার নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে স্থানীয় ফৌজদারি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) আইনজীবীর মাধ্যমে সরাসরি মামলা দায়ের করতে পারবেন।