২৭ মাস ধরে ফাইলবন্দী ভাইভার ফল অনিশ্চয়তায় ৮ হাজার চাকরিপ্রার্থী

সরকার মাজহারুল মান্নান

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) ২০২০ সালের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অধীনে অনুষ্ঠিত ৬১০টি পদের ভাইভার ফলাফল দীর্ঘ ২৭ মাস ধরে ফাইলবন্দী হয়ে আছে। দফায় দফায় আন্দোলন, হাইকোর্টের নির্দেশ এবং দুদকের ছাড়পত্র সত্ত্বেও ফলাফল প্রকাশ না করায় ভাইভায় অংশ নেয়া প্রায় আট হাজার চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বয়সের সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়া এবং মানসিক অশান্তিতে ভুগে এদের অনেকেই এখন সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর ২৮টি ক্যাটাগরিতে চার হাজার ৩২টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ২৪টি ক্যাটাগরির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও প্রদর্শক (৫১৪টি), গবেষণা সহকারী (২১টি), সহকারী গ্রন্থাগারিক (৬৯টি) ও ল্যাবরেটরি সহকারী (৬টি) সহ মোট ৬১০টি পদের নিয়োগ স্থগিত হয়ে যায়। ২০২৪ সালের এপ্রিল-জুনে সাত হাজার ৯৬৩ জন প্রার্থীর লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও তৎকালীন সরকারের আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত জটিলতা এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোটাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে প্রক্রিয়াটি আটকে থাকে।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রার্থীরা হাইকোর্টে রিট (নং ১১৯৩১/২০২৫) করলে আদালত ৩০ দিনের মধ্যে ফলাফল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। তৎকালীন শিক্ষা সচিব রেহেনা পারভীন ফল প্রকাশের অনুমতি দিলেও মাউশি তা ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট দুদক ও মাউশির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের রুল জারি করেন। চলতি  বছরের ২৭ জানুয়ারি দুদক নিশ্চিত করে যে উক্ত নিয়োগে দুর্নীতির কোনো আবেদন জমা পড়েনি। তবুও মাউশি মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলসহ ঊর্ধ্বতন কর্তাদের একাধিক আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি।
চলতি বছর ৭ মার্চ শিক্ষা ভবন এবং ৮ মার্চ দুদকের সামনে এবং চলতি মাসের ১৩ তারিখে রংপুরে মাউশির বিভাগীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে নিয়োগ প্রত্যাশীরা। সেখান থেকে মাউশি পরিচালক এবং বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে ফলাফলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয় তারা।
দীর্ঘ ২৭ মাসের অপেক্ষায় চাকরিপ্রার্থীদের জীবন চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিক্ষকতা বা উচ্চশিক্ষা শেষ করা অনেক প্রার্থী জীবনধারনের জন্য টিউশনি, কৃষি কাজ বা দোকানদারির মতো পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। বয়স পার হয়ে যাওয়ায় নারীদের বিয়ে আটকে গেছে এবং অনেকেই পরিবারে মানসিক নির্যাতন ও চরম হতাশার শিকার হচ্ছেন। সুবিচারের আশায় প্রার্থীরা মাউশির সামনে অনশন, লংমার্চ এবং স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।
মাউশি চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যাশী ঐক্য পরিষদের সভাপতি জোবায়ের আহমেদ ও সমন্বয়ক লিটন কুমার বিশ্বাস জানান, সরকারি কলেজগুলোতে দুই হাজার পদ ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও ফল প্রকাশ করা হচ্ছে না। দ্রুত সমাধান না এলে শিক্ষা ভবনে আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। মাউশির রংপুর আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ প্রার্থীদের দাবি যৌক্তিক বলে স্বীকার করলেও মাউশির প্রশাসন শাখা এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করেনি।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম ক্যাটালগার পদের ভাইভা প্রত্যাশী শেরপুরের শ্রীবরদীর কবির হোসেনের চাকরির বয়সসীমা শেষ হয়ে গেছে। তিন সন্তান ও পরিবার নিয়ে মানবেতর দিন কাটানো কবির হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেও ফলাফলের অনিশ্চয়তায় আমি পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে পড়েছি। জীবিকার তাগিদে এখন শ্রীবরদী বাজারে ভেটেরিনারি ওষুধের দোকান চালিয়ে সংসার টানতে হচ্ছে।’
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে ভাইভা দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের শৈলকুপার কাচেরকোল গ্রামের মো: সোহাগ। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ভালো হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ অপেক্ষায় তার সরকারি চাকরির বয়স পার হয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার কারণে পরিবার বিয়ে দিতে পারছে না। এখন টিউশনি করে কোনোমতে বেঁচে আছি।’
মাউশি চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যাশী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও গবেষণা সহকারী পদের ভাইভা প্রার্থী পিরোজপুরের জাকারিয়া হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি চাকরি পাননি উল্লেখ করে বলেন, ‘বর্তমানে বেকার অবস্থায় বাবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিয়েশাদি না করে তীব্র মানসিক অস্থিরতায় জীবন পার করছি।’
তাদের মতই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আকতারা খাতুন (৩৬), চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের খাদিজা আখতার, নীলফামারীর দেলোয়ার হোসেন, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার রিক্তা খাতুনসহ (৩১) আরো অনেকেই অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ফল প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।