মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কিছু সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে যত সহজ, মানুষের জীবনযাত্রায় তার অভিঘাত তত জটিল। জ্বালানি তেলের দাম লিটার-প্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তার একটি বড় উদাহরণ। সরকারের হিসাব বলছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন— বিপিসির বিপুল লোকসান সামাল দিতে এ মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের হিসাব ভিন্ন। তার কাছে প্রশ্ন— তেলের দাম বাড়লে বাসভাড়া কত বাড়বে। বাজারের সবজি ও চাল-ডালের দাম কত বাড়বে। সেচের খরচ কত বাড়বে। কারখানার উৎপাদন ব্যয় কত বাড়বে। একই সাথে মাস শেষে সংসারের ঘাটতি কত বাড়বে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোকসান একটি আর্থিক সমস্যা; কিন্তু সেই লোকসান যদি পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও খাদ্যবাজার হয়ে জনগণের ঘাড়ে এসে পড়ে, তখন তা আর শুধু বিপিসির হিসাব থাকে না; হয়ে যায় জাতীয় অর্থনীতির সামাজিক ব্যয়ের প্রশ্ন।
সরকার ও বিরোধী দল— উভয় পক্ষ জনগণের স্বার্থের কথা বলছে। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তির অন্যতম বিষয় ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। এর অর্থ শুধু প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক সংস্কার নয়; রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা এবং নাগরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রত্যাশাও এর সাথে যুক্ত। সেই বাস্তবতায় সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও জনগণের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব দিয়ে বিচার করতে হবে।
২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। প্রধান প্রধান জ্বালানির দাম লিটার-প্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে আছে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি ও বিপিসির আর্থিক চাপ। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের হিসাবে, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও ফ্রেইটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে দেশের বাজারে পুরোপুরি মূল্য সমন্বয় না করায় মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারের দরে একপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। নতুন মূল্য সমন্বয়ে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এখানে সরকারের যুক্তির একটি বাস্তব ভিত্তি আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল ভর্তুকি দিয়ে যেতে পারে না। বিপিসির লোকসান শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থে মেটাতে হয়। সেই অর্থ আসে জনগণের করের টাকা থেকে। ফলে বিপিসির আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পুরো দায় কি ভোক্তার ওপর বর্তাবে?

তেলের দাম বাড়ে, ঢেউ সর্বত্র
জ্বালানি তেল কোনো বিচ্ছিন্ন পণ্য নয়। এটি অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। পরিবহন থেকে কৃষি, শিল্প থেকে বাজার— প্রায় প্রতিটি খাতের সাথে এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক আছে।
ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রথম অভিঘাত পড়বে পরিবহনে। বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও অন্যান্য যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এরপর বাড়বে পণ্য পরিবহনের খরচ। উৎপাদক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা— প্রতিটি স্তরে বাড়তি ব্যয়ের চাপ যুক্ত হবে। শেষ পর্যন্ত এর একটি বড় অংশ ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা আছে। কৃষিতে এর প্রভাব সরাসরি। সেচ, জমি প্রস্তুত, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা এবং ফসল পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার আছে। সেচের খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। কৃষক যদি বাড়তি ব্যয় বহন করতে না পারেন, এর প্রভাব উৎপাদনে পড়তে পারে; উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারদরে তার প্রতিফলন ঘটবে।
শিল্প খাতও এর বাইরে নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পণ্যের দাম, ব্যবসার মুনাফা এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। তাদের আয় সাধারণত মূল্যস্ফীতির সাথে সাথে বাড়ে না; কিন্তু ব্যয় বাড়ে তাৎক্ষণিকভাবে।

২০ টাকা একবারে কেন
আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকতে পারে; কিন্তু একবারে লিটার-প্রতি ২০ টাকা বাড়ানো কতটা প্রয়োজনীয় এবং এর বিকল্প কী ছিল— এ প্রশ্নও আলোচনায় থাকা উচিত। জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় যদি অপরিহার্য হয়, তাহলে তা ধাপে ধাপে করা যেত কি না, সেটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করা দরকার ছিল। হঠাৎ করে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতিতে দ্বিতীয় দফা চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, বাড়তি বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষাব্যয় ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে আছে, তখন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত আরো তীব্র হতে পারে।
এখানে সরকারের একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি— মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটা এবং এর বোঝা জনগণের ওপর কতটা চাপানো ছাড়া অন্য কী কী ব্যবস্থা নেয়া যেত?

বিপিসির মুনাফার টাকা গেল কোথায়?
প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ বছরে বিপিসির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ওই সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছর ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় ছিল। অন্য একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসির নিট মুনাফা চার হাজার ২১৬ কোটি টাকা এবং ১১ বছরে মোট মুনাফা প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যের হিসাব-পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিপিসি যখন আন্তর্জাতিক বাজারের অনুকূল সময়ে বিপুল মুনাফা করেছে, তখন সেই লাভের একটি অংশ কি ভবিষ্যৎ মূল্যঝুঁকি মোকাবেলায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে জনগণকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে কি কোনো কার্যকর মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল ছিল? যদি না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। ভালো সময়ে মুনাফা হবে আর খারাপ সময়ে জনগণের পকেট থেকে অর্থ তুলে লোকসান মেটানো হবে— এ কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বিপিসির ব্যবস্থাপনাও আলোচনায় আসুক
বিপিসির লোকসান কমানোর আলোচনা হলে শুধু বিক্রয়মূল্য নয়, প্রতিষ্ঠানটির পুরো অপারেশনাল কাঠামোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, ডিপো ব্যবস্থাপনা ও পাম্প পর্যায়ে বিতরণ— কোথায় কত ব্যয় হচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে, কোথায় দক্ষতার ঘাটতি আছে— এসবের স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে থাকা উচিত।
ডিজিটাল মিটারিং, ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, পাম্পভিত্তিক বিক্রির ডিজিটাল তথ্য এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট চালু করা যেতে পারে। এতে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি কমবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা শুধু জনগণের কাছ থেকে বেশি দাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও জবাবদিহিও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সরকার চাইলে মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত অনেকটা সীমিত করতে পারে। কৃষকদের জন্য সেচ মৌসুমে লক্ষ্যভিত্তিক ডিজেল সহায়তা দেয়া, গণপরিবহন খাতে বাস্তব পরিচালন ব্যয় ও ভাড়ার সম্পর্ক স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা বা লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। সেই সাথে বাজার নজরদারি কঠোর করা দরকার। জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে কোনো ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী যাতে তার প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক হারে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন একটি জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল। 
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে অতিরিক্ত মুনাফার একটি অংশ সেখানে জমা রাখা যেতে পারে। তাতে দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সেই অর্থ দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের ধাক্কা সাময়িকভাবে সামলানো সম্ভব হবে।

শেষ পর্যন্ত হিসাবটা জনগণের
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিপিসির লোকসান কমানো নয়; বরং লোকসান কমাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নতুন ক্ষত তৈরি না করা। রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো একটি ইতিবাচক সংখ্যা হতে পারে; কিন্তু সেই ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ যদি পরিবহন ব্যয়, কৃষকের উৎপাদন খরচ, শিল্পের ব্যয় এবং সাধারণ পরিবারের বাজার খরচ বাড়িয়ে আদায় করা হয়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতির অন্য খাতে তার মূল্য দিতে হবে।
অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন সত্যটি এখানে— এক খাতের সাশ্রয় অনেকসময় অন্য খাতের ব্যয়ে পরিণত হয়। জনগণ রাষ্ট্রের ব্যয় বহন করে— কর দিয়ে, ভ্যাট দিয়ে, শুল্ক দিয়ে, জ্বালানি কিনে, পণ্য কিনে। তাই নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দায়িত্ব।
একটি সরকার কত টাকা আয় করল, কত টাকা ব্যয় করল কিংবা কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোকসান কত কমল— এসব গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এ হিসাবের শেষ বোঝাটি কার কাঁধে গেল? রাষ্ট্র যদি আর্থিক সঙ্কট সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দেয়, তাহলে হিসাবের খাতা হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাবে; কিন্তু নাগরিকের সংসারের খাতা আরো ভারী হবে। জনগণের সংসারের সেই ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। 


লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক