
মেধা-দেউলিয়াত্ব একটি জাতির জন্য বিপজ্জনক। এই দেউলিয়াত্ব রাতারাতি পূরণ বা মেরামত করা সম্ভব নয়। এটি একটি জাতির প্রকৃত শক্তিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, গভীরভাবে দুর্বল ও দেউলিয়া করে ফেলে। বিশেষজ্ঞ, চিন্তাবিদ, লেখক ও রাজনৈতিক নেতাদের মতো নীতিনির্ধারকরা যখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে অক্ষম হন, তখন তাকে জাতির জন্য মেধা-দেউলিয়াত্ব বলা হয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই আমরা মেধা-দেউলিয়াত্বের সময় পার করছি।
আমাদের সমাজে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রবাদ আছে, ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা ভাবে কাল।’ যদিও ভারতে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, রাজা রামমোহন রায়, নবাব সলিমুল্লাহ, আল্লামা ইকবাল, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধী, জওয়াহেরলাল নেহরু এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল, বাংলা উপহার দিয়েছে স্যার পিসি রায়, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এবং ড. কুদরাত-ই-খুদার মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন কিংবদন্তি বাঙালি ভাষাবিদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা ছিল তা; কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এটি একটি ঐতিহাসিক সত্যের সংযোজন যে, পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মেধার ফলে, যা বিশ্ব ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়— বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী এখনো জিন্নাহর এই মহান অবদানকে অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করে।
পূর্ব পাকিস্তানে অনেক পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী তাদের মেধা, পাণ্ডিত্য ও স্বাধীন চিন্তার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অধ্যাপক ডি. ডব্লিউ চৌধুরী, ড. রশীদুজ্জামান, ড. হাসান জামান, ড. মুজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী এবং পরবর্তীকালে ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান আমাদের সমাজে বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন। ড. মোহার আলী বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও স্বাধীন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন আমাদের সমাজের স্বাধীন চিন্তাবিদের অন্যতম উদাহরণ। অধ্যাপক আলী আহসান, সিকান্দার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ ছিলেন আমাদের সমাজের বিখ্যাত কবি ও স্বাধীন চিন্তাবিদ। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, ড. এ বি এম হাবিবুল্লাহ, ড. এম আর তারাফদার, ড. আহমদ শরীফ, ড. মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান এবং পরবর্তীকালে ড. সিরাজুল ইসলাম ও ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ছিলেন পাকিস্তান ও প্রাথমিক বাংলাদেশ যুগের বিখ্যাত, মস্কোপন্থী অথচ স্বাধীন চিন্তাবিদ।
মাওলানা আকরম খাঁ এবং আবুল মনসুর আহমেদের মতো সাংবাদিকরা কলকাতায় বাঙালি মুসলিম সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক ছিলেন; অন্য দিকে মানিক মিঞা, আবদুস সালাম খান, খন্দকার আবদুল হামিদ, আক্তারুল আলম, ওবায়দুল হক, মোহাম্মদ মুসা, আনোয়ার জাহিদ, এম এম আলী, আতাউস সামাদ এবং সানাউল্লাহ নূরী বাংলাদেশে তাদের স্বাধীন লেখার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন। আরো অনেকেই ছিলেন যারা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শুরুর দিনগুলোতে স্বাধীন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
বর্তমান যুগে এলে আমাদের মেধার মানদণ্ডের এক করুণ চিত্র দেখতে পাই। সমাজ দিন দিন মেধাগতভাবে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানের আশাও দেখা যাচ্ছে না। বিগত স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে গড়ে ওঠা নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমাজে বুদ্ধিজীবীদের বিকাশ না ঘটার সবচেয়ে জনপ্রিয় কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
যদিও কঠোর নিপীড়নের কারণে স্বাধীন বুদ্ধিজীবীদের বিকাশ সম্ভব হয়নি, তবুও হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি সরকারের লাল চোখকে উপেক্ষা করে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তি ফলাফলের পরোয়া না করে তাদের বক্তৃতা ও লেখার মাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করেছেন। তারা হলেন— ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. আকবর আলি খান, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, ড. শহীদুজ্জামান, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ড. সলিমুল্লাহ খান, ড. আবদুল লতিফ মাসুম, ড. পিয়াস করিম, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং সাংবাদিক ড. মাহমুদুর রহমান— যারা সত্য কথা বলার সাহসের জন্য বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের সমাজের জন্য তারা যথেষ্ট নন; আমাদের আরো স্বাধীন বুদ্ধিজীবী প্রয়োজন, যারা সরকারি অনুগ্রহের পরোয়া করেন না; বরং জনগণ ও দেশের পরোয়া করেন। আমাদের সমাজে কিভাবে আরো স্বাধীন বুদ্ধিজীবী তৈরি করা যায়, তা এখন যুক্তিযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের চারপাশে সম্ভাব্য ব্যক্তিরা রয়েছেন; কিন্তু সত্য বলার মতো পর্যাপ্ত সাহসের অভাব আছে তাদের; তার বদলে তারা ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের লাভের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই মানসিকতা আমাদের সমাজের অধিকাংশ সম্ভাবনাময় পণ্ডিত, লেখক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে বিদ্যমান। বাংলাদেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী কোনো না কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকছেন। পতিত স্বৈরাচারী শাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের একটি বড় অংশ ছিল ভারতপন্থী; জামায়াতেরও ভালো সংখ্যক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যেখানে বিএনপি একটি বড় দল হওয়া সত্ত্বেও কম বুদ্ধিজীবী দেখা যায়। তবে এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণী রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবে কাজ করতেও দ্বিধা করে না।
এটিই পুরো সমস্যার মূল এবং এই সামাজিক ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। অথচ মাত্র কয়েক দশক আগেও পরিস্থিতি আজকের চেয়ে অনেক ভালো ছিল এবং এমন বহু মানুষ ছিলেন যারা ব্যক্তিগত স্বার্থে চালিত হতেন না। কিন্তু এখন বেশির ভাগ সম্ভাবনাময় মুক্তচিন্তাবিদ সঠিক পথ ছেড়ে সেই পথ ধরছেন যেখানে জীবনে ‘সাফল্য’ অর্জন করা সহজ।
ব্যক্তিগত লাভের আশা না করে দেশের জন্য কাজ করবেন এমন প্রকৃত অরাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ ও স্বাধীন বুদ্ধিজীবী খুঁজে পাওয়া সমাজের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের পাশে দাঁড়াতে এবং জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে আমাদের কিছু নিবেদিতপ্রাণ আত্মা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সমাজে এমন কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। মনে হয় এ বিষয়ে কারো কোনো তোয়াক্কাও নেই।
আমাদের চাহিদা এখন অসীম এবং এই চাহিদাই আমাদেরকে বেশি করে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। কিন্তু আমরা যদি চাহিদা কমাতে পারি, তবে তা অন্যের ওপর আমাদের নির্ভরতাও কমিয়ে দিতে পারে। চারপাশে এমন মানুষ আছেন, যারা মেধাসম্পন্ন, কিন্তু স্বাধীন নন। তাদের মেধা আছে; কিন্তু সাহস নেই। তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেশি যে, তারা সত্য বলার মূল্য পরিশোধ করতে পারেন না।
আগে স্বাধীন বুদ্ধিজীবীরা আসতেন আইনজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার ও সাংবাদিকদের মধ্য থেকে; কিন্তু গত পাঁচ দশকে সে দৃশ্যপট বদলে গেছে। অনেক ধনী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং জীবনে আরো সাফল্য প্রত্যাশা করছেন। অথচ স্বাধীন পেশার মানুষগুলো এ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এটি সমাজের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার মধ্যে এক নতুন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে : একদম অবসরের দ্বারপ্রান্তে এসে পিএইচডির মতো সর্বোচ্চ একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করা। এটি ভুল নয়; কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে এ ধরনের ডিগ্রি অর্জন ব্যক্তি বা সমাজ— কারো কাজে আসে না। এই ডিগ্রি সময়মতো অর্জন করা উচিত যাতে অর্জিত জ্ঞান চাকরিতে থাকাকালীনই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় অবদান রাখতে ব্যবহার করা যায়।
আমরা বর্তমানে যে মেধা-দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হচ্ছি, তা সমাধানের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ সমাজের কল্যাণে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও লিখতে অনুপ্রাণিত হবে। একটি সমাজে অবশ্যই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি থাকতে হবে, যারা সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দেশের সেবা করাকে অগ্রাধিকার দেবেন। জাতির জন্য স্বাধীন বুদ্ধিজীবীদের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এটি এখন দেশের জন্য এক জরুরি দাবি। সমাজের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য সত্যবাদী এবং নিঃস্বার্থ দিকনির্দেশনা অপরিহার্য, তা কেবল তখনই সম্ভব যখন সমাজে স্বাধীন বুদ্ধিজীবী থাকবেন। আমরা যেন কোনো অজানা দ্বীপে বা ধ্বংসের এমন চূড়ান্ত বিন্দুতে না পৌঁছে যাই, যেখান থেকে ফেরার উপায় নেই, তাই সরকারকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক : আইনের অধ্যাপক








