
মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের খাদ্য বিভাগে কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন ঘিরে অনিয়ম, তদবির ও ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই কর্মকর্তাদের ‘পারিবারিক সমস্যা’র কথা উল্লেখ করে সরিয়ে দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য গুদামে পদায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি পদায়নের জন্য ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সম্প্রতি ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার অন্তত ছয়টি খাদ্য গুদামে একই কৌশলে বদলি-পদায়নের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলমকে ঘিরে অভিযোগ উঠলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। অন্যদিকে, বদলি-পদায়নে মধ্যস্থতার অভিযোগ রয়েছে খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল হক কামালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের সাথে কামালের দীর্ঘ দিন একই এলাকায় অবস্থানের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তার মূল কর্মস্থল ঈশ্বরগঞ্জ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে রয়েছেন। প্রায় ২৬ বছরের চাকরি জীবনের বড় একটি সময় একই এলাকায় অবস্থান করায় প্রশ্ন উঠেছে- কোন প্রশাসনিক প্রয়োজন ও কোন আদেশের ভিত্তিতে তিনি বছরের পর বছর মূল কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করছেন?
বদলি-পদায়নে কথিত সিন্ডিকেট
সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য গুদামে পদায়ন পেতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অনেক কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে বদলির আবেদন করতে চাপ দেয়া হয়। পরে ওই পদে দ্রুত নতুন কর্মকর্তা বসানো হচ্ছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া সদর খাদ্য গুদামে সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিধিবহির্ভূতভাবে একজন উপ-পরিদর্শককে দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগ ওঠে। সেখানে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা থাকার বিধান থাকলেও ভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়ায় প্রশ্ন দেখা দেয়। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শেষ পর্যন্ত ওই পদায়ন আদেশ বাতিল করা হয়।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে নেত্রকোনা সদর, ঠাকুরাকোনা এবং ময়মনসিংহের গৌরীপুর, তারাকান্দা, ধলা ও শ্যামগঞ্জ খাদ্য গুদাম নিয়েও। তারাকান্দা খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মো: আলাল হোসেনকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় দুই মাস আগেই বদলি করা হয়। প্রথমে ফুলবাড়িয়া এবং মাত্র ১৭ দিনের ব্যবধানে তাকে গৌরীপুরে বদলি করা হয় বলে জানা গেছে।
খাদ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে চাপ প্রয়োগ করে বদলির আবেদন লিখিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করলে প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে বাধ্য হয়ে আবেদন করেছেন বলে তারা দাবি করেন।
ডেপুটেশন নিয়েও প্রশ্ন
খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল হক কামালের দীর্ঘ ডেপুটেশন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার দাবি, তিনি প্রায় এক বছর সাত মাস ধরে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে আছেন। তবে সুনির্দিষ্ট যোগদানের তারিখ তিনি বলতে পারেননি। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা কার্যালয়ে দীর্ঘ দিন অবস্থানের সুযোগে তিনি বদলি-পদায়ন এবং খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদারি নিয়ে তদবিরে প্রভাব বিস্তার করছেন।
কামালের বিরুদ্ধে চাকরির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। তথ্য দাতাদের দাবি, ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দোকান, জমি ও বাড়িসহ ঢাকার উত্তরা এলাকায়ও তার সম্পদ রয়েছে।
খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল হক কামাল বদলি-পদায়ন ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ঠাকুরাকোনা গুদামের কর্মকর্তা শামীম স্বেচ্ছায় আবেদন করে অন্যত্র গেছেন। অন্য ঘটনাগুলোতেও একই ধরনের পরিস্থিতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে।
আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগেই কামাল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ছিলেন। তার সময়ে কামালের ডেপুটেশন-সংক্রান্ত কোনো আদেশ হয়নি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাদ্য সচিব মাসুদুল হাসান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা সাধারণত দুই বছর একটি কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করবেন। দুর্নীতি বা প্রশাসনিক প্রয়োজন ছাড়া মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বদলির সুযোগ নেই। একসাথে এতজন কর্মকর্তার ‘পারিবারিক সমস্যা’ হওয়া স্বাভাবিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
একদিকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই একের পর এক বদলি, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ গুদামে কথিত অর্থের বিনিময়ে পদায়ন এবং একই কর্মকর্তার দীর্ঘ দিন ডেপুটেশনে অবস্থান- সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা খাদ্য বিভাগের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বদলি-পদায়নের আদেশ, ডেপুটেশন নথি, পদায়নের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদের তথ্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি।








