তেলের আগুনে পুড়ছে যাত্রীরা

 আব্দুল কাইয়ুম


* লক্কড়-ঝক্কড় বাসে ভিআইপি ভাড়া
* প্রজ্ঞাপনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২০-১০০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায়
* বেআইনি ওয়েবিল নামে পকেট কাটছে যাত্রীদের
* বাসভাড়ার নৈরাজ্যে পিষ্ট সীমিত আয়ের রাজধানীবাসী

 

রাজধানীর কলাবাগান থেকে পল্টন মোড়ে আসবেন বলে থেকে দিশারী বাসে উঠেন রবিউল হাসান। বড়জোর সাড়ে চার কিলোমিটারের এই পথটুকুর জন্য রবিউল যখন ১৫ টাকা ভাড়া দিতে চাইলেন, তখনই শুরু হলো কুরুক্ষেত্র। কন্ডাক্টর সপাটে দাবি করে বসলেন ২৫ টাকা। যুক্তি একটাই-তেলের দাম বেড়েছে। তাছাড়া তাদের দু’টি ওয়েবিল আছে যার কারণে এই টাকাই দিতে হবে। পরে এক প্রকার জোর-জবরদস্তি করেই তার কাছ থেকে আদায় করা হলো।
একই চিত্র দেখা গেছে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে। সেখান থেকে গুলিস্তানগামী এক যাত্রীর কাছে দাবি করা হলো ৩০ টাকা। অথচ দূরত্ব বিবেচনায় এই ভাড়া হওয়া উচিত ছিল সর্বোচ্চ ১৫ টাকা। রাজপথের এই অস্থিরতা কেবল রবিউল বা সেই অজ্ঞাত যাত্রীর ব্যক্তিগত সঙ্কট নয় বরং এটি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের পর রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক রুদ্ধশ্বাস জনদুর্ভোগের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
স্বল্প ও দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিটি রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী নি¤œ ও মধ্যবিত্ত আয়ের সাধারণ মানুষ বাসভাড়ার এই নৈরাজ্যে চরম বিপাকে পড়েছেন। বাসে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা না থাকা এবং সরকারি নির্দেশনা না মেনে বাড়তি টাকা নেয়ার কারণে প্রতিনিয়ত বাস হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দূরপাল্লার জন্য দুই দশমিক ৪০ টাকা এবং মহানগর এলাকার জন্য দুই দশমিক ৭০ টাকা কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারিত হলেও কোনো বাসেই এর চিহ্ন নেই। কিলোমিটার প্রতি ১৭ পয়সা বাড়ার অর্থ হলো পাঁচ কিলোমিটারে ভাড়া বাড়বে মাত্র ৮৫ পয়সা। কিন্তু রাজপথে ৫ টাকা থেকে ১০ টাকার নিচে কোনো বাড়তি ভাড়ার হিসাব নেই। এই গাণিতিক লুণ্ঠনই প্রমাণ করে যে, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আজ মালিকপক্ষের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে সম্পূর্ণ অসহায়।
যাত্রীদের অভিযোগ- সরকার ঘোষিত ১৭ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি আদতে বাস মালিকদের তোষণ করার এক প্রশাসনিক কৌশল হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর এই সামান্য বৃদ্ধির যে ‘আইওয়াশ’ দেয়া হয়েছে, মাঠপর্যায়ে তার কোনো কার্যকারিতা নেই; বরং এই সিদ্ধান্তের আড়ালে মালিকরা কয়েকগুণ বেশি লুণ্ঠনের বৈধতা খুঁজে নিয়েছে।
বাস চালক ও হেলপারদের দাবি- তেলের দাম বাড়ার পর মালিকরা তাদের ওপর দৈনিক জমার চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাদ্দাম হোসেন নামের একজন বলেন, সরকার হুট করে দাম বাড়ালো, এখন যাত্রীরা বাড়তি টাকা দিতে চায় না, আবার মালিককে ঠিকই বেশি টাকা দিতে হয়। এই দ্বিমুখী চাপে শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে যাত্রীদের সাথে হাতাহাতি ও বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছে। 
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের চিত্র চোখে পড়েছে। প্রতিটি বাসে নেয়া হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া। কলাবাগান থেকে শাহবাগগামী দিশারী পরিবহনের বাসে উঠে দেখা যায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনির হোসেনের সাথে বাসের হেলপারের চরম বাকবিতণ্ডা। ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা দাবি করায় ক্ষুব্ধ মনির হোসেন বলেন, আমরা নি¤œমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। আমাদের কোনো এক্সট্রা ইনকাম নেই। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি, তার ওপর এই অন্যায্য বাসভাড়া আমাদের জন্য সরাসরি জুলুম।
একইভাবে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে দৈনিক বাংলা মোড়ে নামা যাত্রী মহিউদ্দিন ৮ নম্বর বাসে এক কিলোমিটারের কম পথের জন্য ১০ টাকার জায়গায় ১৫ টাকা দিতে বাধ্য হন। সাভার থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত যাতায়াতকারী ফারজানা আহমেদ ও শিক্ষার্থী আশফাক রহমান জানান, আগে যে পথে ১০ থেকে ২০ টাকা ভাড়া ছিল, এখন তা এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়াবে ২০ থেকে ৩০ টাকায়- যা শতকরা ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।  ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনির হোসেনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল অসহায়ত্ব, ভাই, আমরা গোনা টাকায় চলি। বাড়তি টাকা কোথায় পাব? এক্সট্রা তো ইনকাম নেই। 
 বেশির ভাগ বাসের ফিটনেস নেই, সিট তেলচিটচিটে, দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করে যেতে হয়; অথচ ভাড়ার বেলায় তারা কোনো ছাড় দিচ্ছে না। গোনা টাকায় সংসার চালানো মানুষের কাছে এই বাড়তি পাঁচ থেকে ১০ টাকা মানেই সন্তানের শিক্ষার খরচ বা ওষুধের টাকা থেকে কাটছাঁট করা।
এ দিকে ওয়েবিল নামে অবৈধভাবে বাস মালিকদের দ্বারা উদ্ভাবিত এই ব্যবস্থা সরকারি কোনো আইনি কাঠামোতে পড়ে না। এটি কিলোমিটারের দূরত্ব নয় বরং মালিকদের বসানো নির্দিষ্ট পয়েন্ট অতিক্রম করলেই যাত্রীর পকেটে কাঁচি চালানো হয়। রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, কাটাবন বা ফার্মগেটসহ বিভিন্ন পয়েন্টগুলোতে গেলেই দেখা যায় ওয়েবিল সিস্টেমের ভয়াবহতা। প্রতি এক থেকে দুই কিলোমিটার অন্তর চেকপোস্ট বসিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। কন্ডাক্টর আশিকের অকপট জবানবন্দী, আমাদের কিছু করার নাই, ওয়েবিল সিস্টেমে মালিকদের বাড়তি টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। এক কিলোমিটার পথ গেলেই ১০ টাকা, আবার দুই কিলোমিটার পরে আরেক ওয়েবিলে আরো ১০ টাকা- এভাবেই সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ লুটে নেয়া হচ্ছে যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইনের অবমাননা।
তাছাড়া বিভিন্ন রুটের দূরত্ব ও ভাড়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার প্রতিটি রুটে নির্ধারিত হারের চেয়ে ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। দেখা গেছে, আসাদগেট থেকে ফার্মটের দূরত্ব এক দশমিক পাঁচ কিলোমিটারের এই রুটে আগে নির্ধারিত ভাড়া ছিল ১০ টাকা এবং প্রজ্ঞাপিত নতুন ভাড়াও ১০ টাকা রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা, যা প্রজ্ঞাপিত ভাড়ার চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। ফার্মগেট থেকে শাহবাগের দূরত্ব দুই দশমিক পাঁচ কিলোমিটার, প্রজ্ঞাপিত ভাড়া ১০ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা যা ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত।
এছাড়াও কলাবাগান থেকে পল্টন দূরত্ব সাড়ে চার কিলোমিটার, পূর্বে ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা এবং প্রজ্ঞাপিত নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১২ থেকে ১৩ টাকা। তবে বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ২০ টাকা, যা প্রজ্ঞাপিত হারের চেয়ে ৬৬ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। অন্য দিকে সায়েন্সল্যাব থেকে গুলিস্তান তিন দশমিক পাঁচ কিলোমিটার রাস্তায় আগের ১৫ টাকা এবং প্রজ্ঞাপিত ১৫ থেকে ১৬ টাকার স্থলাভিষিক্ত করে আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা, যা ঠিক ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত।
অন্য দিকে শনির আখড়া থেকে নীলক্ষেত আট কিলোমিটার সড়কের ভাড়া ২৬ থেকে ২৭ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা ২০-৫০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া। সাভার থেকে টেকনিক্যালে ১৪ কিলোমিটার সড়কে প্রজ্ঞাপিত ২২ থেকে ২৩ টাকা ভাড়ার বিপরীতে হাঁকা হচ্ছে ৩০ টাকা ৫০ শতাংশ বেশি। সাভার থেকে পল্টনে নির্ধারিত ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা প্রজ্ঞাপিত ভাড়ার জায়গায় আদায় করা হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা অর্থাৎ ২৫-৩৩ শতাংশ অতিরিক্ত। চিটাগাং রোড থেকে শাহবাগের দূরত্ব ১৬ কিমি প্রজ্ঞাপিত ৪২ থেকে ৪৩ টাকার বিপরীতে আদায় করা হচ্ছে ৫০ টাকা।
বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বৈশ্বিক ও দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছুটা সমন্বয় করতে হয়েছে। তবে নির্ধারিত ভাড়ার এক পয়সা বেশি আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট সরাসরি বাতিল করা হবে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, মন্ত্রীর এই কঠোর হুঁশিয়ারি কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে; বাস্তবে কোনো বাসের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞের মতে, সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু প্রতিটি বাসে বিআরটিএ অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট টাঙানো এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও রুট পারমিট বাতিলের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা অবিলম্বে বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। তা না হলে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন বিনষ্ট হবে, তেমনি গণপরিবহন খাতের সিন্ডিকেট আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।