
হামিদুল ইসলাম সরকার
* ৩.৫ বছরের এখন সাড়ে ১০ বছরে
* খরচ বাড়ছে ১৫৩.৩৬ কোটি টাকা
* ৮৮ হাজার কন্ট্রোল পয়েন্টের ৭৫ হাজারই বাকি
অ্যানালগ গতিতে চলছে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল রূপ দিয়ে জমির মালিকানা নিশ্চিত করা এবং ভূমি বিরোধ কমিয়ে আনার প্রকল্প। ২০১৮ সালে সাড়ে তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য যে প্রকল্প শুরু হয়েছিল, আট বছরেও তার মূল কাজের বেশির ভাগ অসম্পন্ন রয়ে গেছে। অথচ খরচ বেড়েছে মোট ১৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। একদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ব্যয়ও। ৩৫২ কোটি টাকা থেকে খরচ এখন ৫০৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তিন দফা বাড়িয়ে মেয়াদ এখন ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্ধিত সময় ও ব্যয়ে প্রকল্পটি আবার সংশোধন সাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছে একনেক।
অনুমোদিত প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের পুরো নাম-‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা এবং দু’টি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থাপন।’ প্রকল্পটি ঘিরে আধুনিক প্রযুক্তির এক নজিরবিহীন মেলবন্ধন ঘটানো হচ্ছে। ড্রোন এবং এয়ারক্রাফটের সাহায্যে আকাশপথের ছবি (অবৎরধষ চযড়ঃড়মৎধঢ়যু) তুলে করা হবে ডিজিটাল ভূ-জরিপ। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে ‘ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যার’ (উখগঝ)। জাতীয় ডাটা সেন্টারে এই সফটওয়্যার বসিয়ে দেশের সব পুরনো সিএস ও আরএস ম্যাপ এবং খতিয়ান স্ক্যান করে তৈরি হবে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ৯২টি দফতরে কম্পিউটার, প্লটার, স্ক্যানার, ফায়ারওয়ালসহ তথ্যপ্রযুক্তির সম্পূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
মেয়াদ বাড়ল প্রায় সাত বছর
নথি থেকে জানা যায়, প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত- অর্থাৎ সাড়ে তিন বছর। প্রথম সংশোধনীতে সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর ব্যয় না বাড়িয়েই মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে আরো আড়াই বছর সময় চেয়ে মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই হিসাবে মূলত সাড়ে তিন বছরের একটি প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে গিয়ে ঠেকছে।
মাত্র ১২ শতাংশ মৌজার কাজ শেষ
প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল ৬৩৪টি মৌজায় ডিজিটাল ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা। কিন্তু ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ৭৬টি মৌজার জরিপ, বাকি রয়ে গেছে ৫৫৮টি। হিসাব করলে দেখা যায়, মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ শতাংশ কাজই বাকি। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে অস্থায়ী কন্ট্রোল পয়েন্ট (টিসিপি) স্থাপনের ক্ষেত্রেও। প্রকল্পে ৮৮ হাজার ৮৩৪টি টিসিপি স্থাপনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। যার বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৯৩৩টি। বাকি থেকে গেছে ৭৫ হাজার ৯০১টি, অর্থাৎ লক্ষ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ এখনো অসম্পন্ন। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, এই বাকি কাজ শেষ করতে আরো আড়াই বছর সময় প্রয়োজন।
৮ বছরে অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ
কাজের এই ধীরগতির মধ্যেও অর্থ ব্যয়ে ভাটা পড়েনি। প্রকল্পের সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৩৯৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আট বছরে খরচ হয়েছে ২২৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এতে আর্থিক খরচ দাঁড়িয়েছে ৫৮ শতাংশ, আর বাস্তব অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও মূল কাজের বড় অংশ এখনো বাকি রয়ে গেছে। যা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে।
ডলারের দাম বৃদ্ধিই বড় কারণ
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্য হলো, ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি। ঋণ চুক্তির সময় প্রতি ডলারের দাম ছিল ৭৮ টাকা ৪০ পয়সা। ২০২৬ সালের ১ জুন নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়। এই বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেই প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ অংশে (প্রকল্প সাহায্য বা চঅ) টাকার অঙ্কে বেড়েছে ৪১ কোটি ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা। প্রকল্পের অর্থায়নে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ)। দ্বিতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব অনুযায়ী মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অংশ দাঁড়াবে ১৫৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণের অংশ ৩৪৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এই হিসাবে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই নির্ভরশীল বৈদেশিক ঋণের ওপর- যা দেশের রাজস্ব ও পরিশোধের সক্ষমতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আয়করের বোঝা
তথ্য থেকে জানা গেছে, খরচ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও ঠিকাদারের আয়কর। প্রকল্পের সর্বশেষ অনুমোদিত পরিকল্পনায় (আরডিপিপি) এই খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এবারের সংশোধনীতে পরামর্শকদের জন্য ৩৫ শতাংশ হারে এক কোটি এক লাখ টাকা। ঠিকাদারের জন্য ১৫ শতাংশ হারে ৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু এই দুই খাতেই যোগ হচ্ছে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব ও উন্নয়ন প্রকল্প সাহায্য (ডিপিএ) খাতের ৪৪টি অঙ্গে ব্যয় বাড়ছে ১২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আবার ২২টি অঙ্গে ব্যয় কমছে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। দুই দিক মিলিয়ে নিট ব্যয় বৃদ্ধি দাঁড়াচ্ছে ১১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
কোন খাতে কত ব্যয়
নথির তথ্য থেকে জানা গেছে, দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী মোট ৫০৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার মধ্যে রাজস্ব খাতে বরাদ্দ ১৬০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ। ডিজিটাল জরিপ খাতে ব্যয় হবে ১৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা যা, মোট ব্যয়ের প্রায় ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামে ২২ কোটি ২০ লাখ, আইসিটি সরঞ্জামে ৩২ কোটি ৪০ লাখ, সার্ভে ইকুইপমেন্টে প্রায় ২৮ কোটি, ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে ২৭ কোটি ৩৮ লাখ এবং প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
তারপরও প্রশ্ন পরিকল্পনা কমিশনের:
পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা কমিশন বলছে, লক্ষ্যমাত্রার বেশির ভাগ কাজ এখনো অসম্পন্ন থাকায় মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বাস্তবায়নের গতি নিয়ে। ৬৩৪ মৌজার মধ্যে মাত্র ৭৬টির কাজ শেষ হওয়া কিংবা ৮৮ হাজারের বেশি কন্ট্রোল পয়েন্টের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাকি থেকে যাওয়া প্রমাণ করে। প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। আড়াই বছরের বর্ধিত সময়ে সেই ফারাক ঘোচানো সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের বাস্তবায়ন গতির ওপর।








