
এস এম মিন্টু
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় গ্রেফতার চার আসামির মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসানকে (১৫) গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালক) অবজারভেশন কক্ষে রাখা হয়েছে। গত সোমবার বিকেল ৪টার দিকে তাদের সেখানে নেয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রটিতে গিয়ে অপ্রতিম হত্যা মামলার দুই কিশোর আসামির পাশাপাশি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি, শিশুদের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হয়।
কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, অপ্রতিম হত্যা মামলার দুই কিশোর নিজেদের এ ঘটনায় জড়িত নয় বলে দাবি করেছে। তাদের কথাবার্তা ও আচরণে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনার স্পষ্ট লক্ষণ তারা দেখেননি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অন্য শিশুদের সাথেই আপাতত থাকতে হবে তাদের ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত।
কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষের কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, গত এক বছরে যারা এখানে বিভিন্ন অপরাধে বন্দী আছে তাদের আমরা বন্দী হিসেবে দেখি না। এখানকার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্তকিভাবে এখানে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা, নাসির্ং, প্রশিক্ষণ এবং কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন ছাড়াই ৯০৬ জন শিশুকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নিয়মমাফিক খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো, খেলাধুলা, পড়াশোনার জন্য আলাদাভাবে ক্লাস করানো, এমনকি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও চলমান রয়েছে।
বর্তমানে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩০০ আসনের বিপরীতে ৯০৬ জন রয়েছে। এর মধ্যে বিচারাধীন শিশু শতাধিক। তাদের জন্য বরাদ্দ মাসে মাথাপিছু পাঁচ হাজার টাকা। এখানে যারা রয়েছে, তাদের হত্যা, মারামারি, কিশোর গ্যাং মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে আনা হয়েছে। গত এক দশকে নি¤œবিত্ত মধ্যবিত্তর চেয়ে উচ্চবিত্ত সন্তানদের অপরাধ প্রবণতার হার বেশি লক্ষ করা গেছে।
শিশুদের অপরাধের জড়িত থাকার কারণ জানার চেষ্টা করা হলে তারা জানান, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের স্খলন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
শিশুদের সাথে কর্মকর্তারা কথা বলে যতটুকু জানতে পেরেছেন এটি একটি বহুমুখী সমস্যা, যার মূল রয়েছে আমাদের পরিবর্তিত সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে। শিশু-কিশোরদের এই অপরাধ প্রবণতা বাড়ার প্রধান কারণ এবং হিসেবে বেশ কিছু বিষয় চিহ্নিত হয়েছে। তার মধ্যে শিশু অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণগুলো সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি শিশুদের অপরাধে জড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ। খুব কম বয়সেই পর্নোগ্রাফি ও সহিংস অপরাধমূলক কনটেন্টের অবাধ বিস্তার, তাদের মানসিক বিকাশকে বিকৃত করছে এবং তারা সেসব অপরাধের অনুকরণ করার কারণেই শিশুরা অপরাধে জড়িয়েছে।
এ ছাড়াও পারিবারিক উদাসীনতা ও কলহ, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়া এবং মা-বাবা দু’জনেই ব্যস্ত থাকায় সন্তানরা একাকিত্বেও কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তারা জানান, পারিবারিক কলহ, মা-বাবার বিচ্ছেদ বা সন্তানের প্রতি অবহেলার কারণে শিশুরা সঠিক নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। সুস্থ বিনোদনের অভাব, মাঠের অভাব এবং পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপের কারণে শিশুদের খেলাধুলা ও বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। এই শূন্যতা পূরণে তারা মোবাইল গেম বা গ্যাং কালচারের (যেমন: কিশোর গ্যাং) দিকে ধাবিত হচ্ছে। নৈতিক শিক্ষার স্খলনের যেমন সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন প্রতিযোগিতার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। কিন্তু নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। অপরাধের বিচার না হওয়া ও অসৎ সঙ্গ অনেক ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা সংশোধন না হওয়ায় অপরাধের বিস্তার ঘটছে। পাশাপাশি এলাকার অসৎ সঙ্গ ও মাদকের সহজলভ্যতা তাদের দ্রুত অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ায় টেনে নেয়।
গতকাল কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো: এমরান খান নয়া দিগন্তেকে জানান, টঙ্গীতে অবস্থিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক) ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। কেন্দ্রের অনুমোদিত আসনসংখ্যা ৩০০ জন। সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালিত এই কেন্দ্রে বর্তমানে বিচারাধীন শিশু এবং আটকাদেশপ্রাপ্ত শিশুদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আগত শিশুদের রাখা হয়। তিনি বলেন, এখানে আসন সংখ্যার চেয়ে তিনগুণের বেশি শিশুদের রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে এক চ্যালেঞ্জর মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নবনির্মিত ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ তৃতীয় তলা পর্যন্ত প্রায় সম্পন্ন। ভবনটি আগে অ্যাডমিনিস্ট্রি, প্রশিক্ষণের জন্য করা হলেও শিশুদের সুরক্ষায় পুরনো ভবন থেকে নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হবে।
তিনি জানান, এখানে প্রতিটি শিশুর জন্য মাসিক মাথাপিছু মোট পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে খাদ্য, দুধ ও জ্বালানির জন্য চার হাজার টাকা। সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদ তিন শ’ টাকা, প্রশিক্ষণ সামগ্রী আড়াই শ’ টাকা, তেল, সাবান ও প্রসাধনী জন্য দেড় শ’ টাকা, শিক্ষা ও খেলাধুলা সামগ্রী ২শ’ টাকা এবং চিকিৎসা সামগ্রীর জন্য এক শ’ টাকা। সপ্তাহের প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকার মধ্যে সাধারণত সকালের নাশতায় ভাত-আলুভর্তা বা সবজি খিচুড়ি, দুপুরে ভাত-মাছ/মাংস-সবজি-ডাল, বিকেলে মুড়ি-চানাচুর, কলা-রুটি বা শিঙ্গাড়া এবং রাতে ভাত ও মুরগির মাংস, মাছ অথবা সবজি-ডাল দেয়া হয়। বর্তমানে স্কুল ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ট্রেডে (অটোমোবাইল, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক, দর্জিবিজ্ঞান, কম্পিউটার) নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে ৬৫ জন।
এমরান খান বলেন, গত এক বছরে এখানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। শৃঙ্খলার জন্য কেন্দ্রের দায়িত্বরতদের বাইরেও সাতটি কক্ষে রয়েছে সাতজন ক্যাপ্টেন। প্রতিকক্ষে একজন ক্যাপ্টেনের পাশাপাশি সহকারী ক্যাপ্টেন ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন রয়েছে। প্রত্যেক কক্ষে থাকা শিশুরাই নির্বাচন করেন কে ক্যাপ্টেন থাকবে।
শিশুদের মধ্যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা হলো, বেশি সময় ক্লাস করা, প্রশিক্ষণের সময় বাড়িয়ে দেয়া এবং বেশি বেশি বই পড়া। তবে কোনো শারীরিক নির্যাতনের সুযোগ নেই।
স্কুলে লেখাপড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা কোনো লেখাপড়া করেনি এবং বয়স বেশি হয়ে গেছে তাদের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের দিয়ে কাঠ শিল্প, ইলেকট্রনিক ট্রেড, দর্জি ট্রেড করানো হয়। এ ছাড়াও যারা শিক্ষিত তাদের দিয়ে কম্পিউটার ট্রেড করানো হয়।
আগে মাসে দুইবার শিশুদের সাথে স্বজনদের যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে মাসে চারবার কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে চারবার টেলিফোনে কথা বলতে পারবে শিশুরা।
গত এক বছরে দর্জি শাখায় ৮৫ জন, প্লাম্বিং ৭০ জন, কম্পিউটার ১৪৯, বৈদ্যুতিক শাখায় ১৬৫ এবং বিদ্যালয় শাখায় ৭৫০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
মূল ফটকের বাইরে কয়েকজন শিশুর স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অপরাধ করেই এখানে এসেছে তাদের ছেলেরা। তবে বাসায় থাকতে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন ছিল। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক। সন্তানরা নিজেই বলে, ‘বাবা ভুল করেছি তোমাদের কথা না শুনে’। এখানে যেভাবে শিক্ষা দেয়, মনে হয় বাইরে থেকে অনেক ভুল শিক্ষা পেয়েছি।’
অভিভাবকরা বলেন, সন্তানরা অপরাধ করে এখন তাদের ভুল বুঝতে পারছে। তাদের অপরাধের কারণ আমরাও দায়ী। এখানে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তারা শিশুদের সুরক্ষায় শতভাগ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করি সন্তানরা তাদের অপরাধ শুধরে আলোর পথে আসবে।
ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, সবুজে ঘেরা পুরো মাঠ। উত্তর পাশে দুই তলা ভবনটি জরাজীর্ণ। মাঝে খেলার মাঠ থাকলেও সেটি সংস্কারের মাটি ভরাটের কাজ চলমান রয়েছে। দক্ষিণের ৫ তলা ভবনের জরাজীর্ণ ভবনের ভেতর শিশুদের স্কুল পোশাকে আলাদা আলাদা তলায় ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেছে। বাইরে থেকে বেশ পুরনো ভবন দেখা গেলেও ভেতরে রঙ করা অবস্থায় দেখা গেছে। এ ছাড়াও পশ্চিমে স্কুল ও প্রশিক্ষণ ভবনটিও বেশ পুরনো। সেখানে প্রশিক্ষণ, স্কুল ও লাইব্রেরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়ে সেখানে চিকিৎসাকার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সেখানে দায়িত্বে আছেন ডা. আবু সুফিয়ান হাসান। তিনি বলেন, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক মো: এমরান খান এক বছরে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। শিশুদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করছেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা তিনি দিয়ে থাকেন। অন্যান্য জটিল রোগ ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আনা হয় চুক্তিভিত্তিক। তিনি বলেন, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যারা এসেছেন তারা সবাই কোনো না কোনো অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। তার মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রাখা হয়।








