জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির জেরে সড়কে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য

 নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথেই দেশজুড়ে বাস ও ট্রাক ভাড়া নিয়ে শুরু হয়েছে এক ধরনের নৈরাজ্য। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই কোথাও কোথাও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়েছে, যা নিয়ে সড়কে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীরা বাগি¦তণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছে। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও পড়েছে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে ট্রাক ভাড়া গন্তব্যভেদে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাসযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত রোববার মধ্যরাত থেকে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ১৫৫ টাকা, অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিলেও এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর প্রথম দিনে সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই রাজধানীর গণপরিবহনসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটের বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদ করায় বাস মালিক এবং যাত্রীদের মধ্যে বাগি¦তণ্ডার সৃষ্টি হয়। 
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আমিনুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ বাসের টিকিট ৫০০ টাকা নির্ধারিত ছিল। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে গতকাল তাকে ৫৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয়েছে। ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তার জন্য ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৫০ টাকা। প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩৭ পয়সা বাড়িয়েছে বাস মালিকরা।
সাভার থেকে মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত মনিরুল ইসলাম জানান, জ¦ালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির আগে সাভার থেকে পল্টন আসতে ৬০ টাকা বাস ভাড়া নিত। এখন সেই ভাড়া ৭৫ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত যাত্রীদের থেকে আদায় করছে বাস মালিকরা। এটা নিয়ে বাসের টাকা সংগ্রহকারীদের সাথে যাত্রীদের বাগি¦তণ্ডার সৃষ্টি হয় বেশ। 
জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয় ২০২২ সালের আগস্টে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই সময় ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। লিটারে বেড়ে যায় ৩৪ টাকা। যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২৩ দিনের মাথায় লিটারে ৫ টাকা কমানো হয় দাম।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরই বেড়ে যায় বাস, ট্রাক ও লঞ্চের ভাড়া। পণ্যের পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ে। ওই সময় মূল্যস্ফীতি। সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছিল সাড়ে ৯ শতাংশ।
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। গত জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরো ৫ টাকা করে বাড়ে।
এ দিকে ট্রাকভাড়াও বেড়েছে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা। রাজশাহীর সবজি ব্যবসায়ী নয়ন মৃধা নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজশাহী থেকে একটি ট্রাক ২২ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছিলাম। এখন আর এই ভাড়ায় ট্রাক মালিকরা যেতে রাজি হচ্ছে না। ৬ হাজার টাকা বাড়িয়ে এখন ২৮ হাজার টাকা দাবি করছেন ট্রাক মালিকরা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবে বারবার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশে দারিদ্র্য বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে। 
বিশেষত স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ, যাঁরা পরিবহন ব্যয়ের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এই নতুন মূল্যবৃদ্ধিকে অনেকেই বাড়তি বোঝা হিসেবে দেখছেন। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও যাতায়াত, বাজার-সদাই ও সংসার খরচ বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের সংসার পরিচালনা আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহীতে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ছে ১৭ পয়সা
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রাজশাহীতে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এতে যানবাহন পরিচালনার খরচ বাড়ছে।
এরই মধ্যে রাজশাহীতে পরিবহন ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন ভাড়া বুধবার থেকে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন।
এ দিকে পাম্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, দাম বৃদ্ধির কারণে কেউ কেউ আগের তুলনায় কম পরিমাণে জ্বালানি কিনছেন।
তেল কিনতে আসা মেহেদী হাসান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য যারা যানবাহন ব্যবহার করেন, তাদের খরচ আরো বেড়ে যাবে। আয় একই থাকলেও ব্যয় বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকার ক্রেতা ওমর ফারুক বলেন, ‘তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিক বা চালকদের খরচ বাড়ে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার খরচও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে।’
নগরীর রুয়েটের সামনে নয়ান পেট্রোলিয়াম পাম্প এজেন্সির কর্মচারী সাফওয়ান বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। বেচাকেনাও কিছুটা কমেছে। আগে যারা পাঁচ লিটার তেল নিতেন, তাদের কেউ কেউ এখন তিন লিটার করে নিচ্ছেন।

Advertisement