
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘সাইবার সুরক্ষা আইন বহাল রেখে সংশোধিত খসড়া বাতিল’ করার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ : নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন?’-শীর্ষক সেমিনারে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের বয়স ৭ মাস, সাইবার সুরক্ষা আইনের বয়স ৪/৫ মাস। এই ৪/৫ মাসে এমন কী ঘটেছে যে এ আইন সংশোধন করতে হবে? সরকারের মধ্যে অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ নামে পাস হয়েছে। কিন্তু সাইবার সুরক্ষা আইন পাস হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে সরকার হীন উদ্দেশে এ আইন সংশোধন করতে চাচ্ছে।
জামায়াতের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ আয়োজিত সেমিনারে খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক রফিকুজ্জামান রুমান। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার-মিডিয়া টিম সদস্য মো: জাহিদুর রহমানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য নাজমুন নাহার নিলু এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লা সিবগা, গ্রিনওয়াচের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক জনতার সম্পাদক ওবায়দুর রহমান শাহীন, দৈনিক আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও দৈনিক মানব কণ্ঠের সম্পাদক মো: শহিদুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান, এনটিভির হেড অব নিউজ ফখরুল আলম কাঞ্চন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন, ব্যারিস্টার আল মামুন রাসেল, ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ প্রমুখ।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস করেছে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করেছে, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলমত দমন করতে এবং সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ প্রকাশ যাতে না হয় সেজন্য মিডিয়াকে দমন করতে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের পথে হাঁটছে। সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে তিনি আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিএনপি সরকারের কার্যক্রমে বোঝা যায় একটি নির্বাচিত সরকার কিভাবে ফ্যাসিবাদ হয়ে ওঠতে পারে। তারা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ গুম করে দিয়েছে, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করেছে, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করেছে এমনকি গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সব কিছু বাতিল করতে করতে একদিন জনগণ সরকারকে বাতিল করে দেবে। বাতিল হওয়ার আগে জনরায় মেনে নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ সংসদে পাস হয়েছিল। কিন্তু ওই অধ্যাদেশ পাস হওয়ার পর সরকার দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘৃণ্য উদ্দেশে আইনটি সংশোধনের জন্য একটি খসড়া আইন তৈরি করেছে। সংশোধিত খসড়া আইনটি বাকস্বাধীনতা দমনের এক ভয়ঙ্কর আইন! সংশোধিত এই আইনটি হবে জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা। এবং এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। এ সময় তিনি আরো বলেন, প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য অষ্টম ওয়েজ বোর্ড গঠন হলেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য কোনো ওয়েজ বোর্ড গঠন হয়নি। অন্য দিকে শুধুমাত্র বাসসের জন্য নবম ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বৈষম্য কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, সরকারের সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ হচ্ছে আমাদের হাত-পা বেঁধে নদীতে সাঁতার কাটার জন্য ছেড়ে দেয়ার মতো। তিনি আরো বলেন, এই আইন হচ্ছে সরকার যা খুশি তা করবে কিন্তু জনগণ কিছুই বলতে পারবে না। বললেই মানহানি মামলায় অভিযুক্ত হতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানি মামলায় আওয়ামী লীগের শাস্তির বিধান করেছিল তিন বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিন্তু বিএনপি সেই আইনকে সাইবার সুরক্ষা আইন নাম দিয়ে সংশোধন করে শাস্তির বিধান করতে যাচ্ছে ৫ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড! তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চেয়েও বিএনপির সাইবার সুরক্ষা আইন বেশি ভয়ঙ্কর।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেন, আমাদের আইন হচ্ছে একচোখা। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে মামলা হয়, আটক হয়। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা বা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যাচার করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সাইবার সুরক্ষা আইন সরকার আরো কঠোরভাবে তৈরি করতে চাচ্ছে কেবলমাত্র গণমাধ্যম ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম বলেন, গণমাধ্যম ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬। তিনি আরো বলেন, সরকারের দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিকে প্রটেক্ট করার জন্য এই আইন সরকার সংশোধন করতে যাচ্ছে। এই কালো আইন বাংলাদেশে করতে দেয়া হবে না বলে তিনি সরকারকে সতর্ক করেন।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লা সিবগা বলেন, সরকার সংবিধানের বাইরে যেতে চায় না কিন্তু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইনের নামে জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে। এই আইনে সরকার শুধু জনগণের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণই করবে না বরং দমনও করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের ফটোকপি বিএনপির মধ্যে দেখা যায়। তারা আওয়ামী লীগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে আরো কঠোরভাবে সংশোধনের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইন করতে চাচ্ছে। এই কালো আইনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেও ভূমিকা রাখতে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে আবুল আসাদ বলেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বলে সরকার জুলাই সনদ অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। গণভোটের রায় মেনে নেয়নি। তার মানে সরকার জুলাই সনদ মানে না। জুলাই সনদ মানে বলেই সরকার পুরনো কালাকানুন সংশোধন করে আরো জঘন্যভাবে আইন করতে চাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয় তবে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের নামে কালাকানুন তৈরির পথ থেকে সরে আসতে হবে।
বিএফইউজের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, গত ৪২ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। সব সময়ই কালাকানুনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরতে সরকারগুলো সব সময় কালাকানুন তৈরি করে। ঠিক তেমনি এ সরকারও একটি কালাকানুন তৈরি করছে। যে আইনের মাধ্যমে আবারো সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হবেন।
নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, যে আইন করা হচ্ছে তা জানলে গা শিউরে উঠবে। সংবাদপত্রে কোন নিউজ করলে সেটা যদি সরকার মনে করে গুজব ছড়ানো হয়েছে তাহলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার, এসাইনমেন্ট এডিটর, প্রুফ রিডার সবাই শাস্তির মুখোমুখি হবে। তাদের ১০ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন সমালোচনামূলক লেখা লিখলে সেটা যদি সরকার মনে করে ওই লেখার মাধ্যমে ঘৃণা ছড়াচ্ছে সেটা রাষ্ট্র বিরোধী দেখিয়ে শাস্তি দেয়া দিতে পারবে। এ আইন যদি প্রয়োগ করা হয় তাহলে সেটি উত্তর কোরিয়ার শাসনের মতো হয়ে যেতে পারে। এখন দেখতে হবে সরকার আসলে এ আইন কিভাবে ব্যবহার করে।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, শেখ মুজিব থেকে দেশে যত শাসক এসেছে তারা আইন করে সাংবাদিকদের দমনপীড়ন করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন করা হয় ভালো কথা বলে। কিন্তু পরে তা সরকারের ক্ষমতাকে নিরাপদ করতে ব্যবহার করা হয়। আর সাংবাদিকদের এসব আইনে নিরাপত্তার পরিবর্তে জেল খাটতে হয়েছে। এ কালাকানুনও সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করবে। এজন্য এ আইনের প্রতিবাদে সাংবাদিকদের আবারো রাজপথে সোচ্চার হতে হবে।
ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, এ ধরনের আইন সব সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের নিপীড়নের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন করে যে আইন করা হচ্ছে তাতে পুলিশকে তদন্ত ও মামলার ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। অতীতে কখনো পুলিশকে আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। আগামীতেও তাদের বিশ্বাস করা যায় না। তারা ইচ্ছা করলে এ আইনের অপপ্রয়োগ করতে পারবে। এতে সাংবাদিকদের দমনের পথ সুগম হবে। তিনি বলেন, কোনো সরকারই সাংবাদিকদের কল্যাণের জন্য কোনো আইন করেনি। উল্টো সাংবাদিকদের নিপীড়নের হাতিয়ার করেছে আইন। ডিআরইউ সভাপতি বলেন, এ আইন করতে সাংবাদিকদের মতামতও নেয়া হয়নি। এজন্য সরকারের কাছে আহ্বান থাকবে সবার মতামত নিয়ে সবার জন্য কল্যাণ হয় এমন আইন করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








