
কাওসার আজম
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) সাবেক দুই মহাপরিচালক মো: বেনজীর আলম ও বাদল চন্দ্র বিশ্বাসকে ঘিরে পুরনো অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ও অডিট আপত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দায়িত্বকালে বিভিন্ন প্রকল্প ও খাতে অনিয়মের অভিযোগে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সংশ্লেষের অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্টদের পেনশন ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা নিয়েও জটিলতা রয়েছে।
অন্য দিকে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অসদাচরণের অভিযোগের পরও তাদের দায়মুক্তি দিতে খামারবাড়ির একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছেন।
বিশেষ করে সাবেক মহাপরিচালক মো: বেনজীর আলমের দায়িত্বকালের ৭৩৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৪ টাকার আর্থিক সংশ্লেষযুক্ত অডিট আপত্তির বড় একটি অংশ এখনো অনিষ্পন্ন। অডিট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার দায়িত্বকালে মোট ৪৯টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। এর মধ্যে ২৬টি নিষ্পত্তি হলেও ২৩টি আপত্তি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
৭৩৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি
অডিট নথি অনুযায়ী, বেনজীর আলমের দায়িত্বকালের অনিষ্পন্ন ২৩টি আপত্তিতে মোট আর্থিক সংশ্লেষ ৭৩৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৪ টাকা। এর প্রায় পুরো অংশই ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত।
এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের নয়টি আপত্তিতে আর্থিক সংশ্লেষ ৬২১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮২০ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের আরো ৯টি আপত্তিতে সংশ্লিষ্ট অর্থ ১১৪ কোটি ৭৪ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৭ টাকা। অর্থাৎ এই দুই অর্থবছরের ১৮টি আপত্তিতেই অনিষ্পন্ন আর্থিক সংশ্লেষের প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে।
অডিট আপত্তিগুলোর বড় অংশই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অগ্রাধিকার পাওয়া ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানের কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত।
একটি বড় অডিট আপত্তিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে ভর্তুকির বিল পরিশোধের অভিযোগে ২১১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকার আর্থিক সংশ্লেষ দেখানো হয়েছে।
আরেকটি আপত্তিতে ডিপিপির নির্দেশনা লঙ্ঘন করে যোগসাজশের মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন ও বিল পরিশোধের অভিযোগে ২০৯ কোটি ৬০ লাখ ৩০ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা ৫ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ার অভিযোগও অডিটে উঠে এসেছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়েও একাধিক আপত্তি
কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রেও একাধিক অনিয়মের কথা অডিট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি ক্রয়, কোটেশন বা আরএফকিউ পদ্ধতির অপব্যবহার, বার্ষিক ক্রয়সীমা অতিক্রম করে ব্যয় এবং বাজারদর যাচাই না করে উচ্চমূল্যে মালামাল কেনা।
এ ছাড়া কারিগরি কমিটির নির্ধারিত দরের বাইরে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে পণ্য কেনার অভিযোগও রয়েছে।
অডিট নথিতে তালিকাভুক্ত না থাকা ঠিকাদারকে ১৮৯ কোটি ৭৫ লাখ ৮ হাজার টাকা পরিশোধ এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও লিকুইডেটেড ড্যামেজ আদায় না করার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কাজ খণ্ড খণ্ড করে ক্রয়সীমা এড়িয়ে যাওয়া, ডিপিপি বহির্ভূত খাতে অর্থ ব্যয়, সরবরাহকারীর বিল থেকে প্রযোজ্য ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে কর্তন না করা এবং যানবাহন মেরামত ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও অডিটে এসেছে।
প্রকল্প পরিচালক থেকে ডিজি
মো: বেনজীর আলম কৃষি ক্যাডারের অষ্টম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক হিসেবে ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন।
প্রায় ৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের ওই প্রকল্পে কৃষকদের ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র সরবরাহসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। তার দায়িত্বকালের বিপুল অঙ্কের অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় অবসর-পরবর্তী পাওনা ও পেনশন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে এসব অডিট আপত্তিতে ব্যক্তিগতভাবে তার দায় কতটুকু এবং কোন কোন বিষয়ে তার প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে- তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি, জবাব এবং অডিট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বাদল চন্দ্রের সময়েও অডিট আপত্তি
ডিএইর আরেক সাবেক মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাসের দায়িত্বকালের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিবহন জ্বালানি খাতেও ৭৩ লাখ ১৬ হাজার ৪৭৮ টাকার অডিট আপত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি ব্যয় সঙ্কোচনসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি ব্যয় ২০ শতাংশ কমানোর কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
বাদল চন্দ্র বিশ্বাস ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ডিএইর চুক্তিভিত্তিক মহাপরিচালক ছিলেন। এর আগে তিনি এক দফা মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার পুনর্নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন নিয়ে সে সময় প্রশাসনের ভেতরে নানা আলোচনা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আন্দোলন নিয়ে বক্তব্যের ভিডিও
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট খামারবাড়ি এলাকায় আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বাদল চন্দ্র বিশ্বাসের একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিতে দেখা যায় এবং তাদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘রাজাকার-আলবদর’ হিসেবে আখ্যায়িত করার অভিযোগ রয়েছে।
ভিডিওটির সত্যতা, বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং সেটি কোন পরিস্থিতিতে দেয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে বিশেষ সুবিধা নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্তের ফলাফল কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে কি না তা এখনো সামনে আসেনি।
কর্মচারী নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, পরে দায়মুক্তির অভিযোগ
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে খামারবাড়িতে প্রভাবশালী কর্মচারী নেতা হিসেবে তায়জুল ইসলামের নাম আলোচিত ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
তার পাশাপাশি আরো কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় ডিএই।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে ওই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে চলমান ব্যবস্থা শিথিল বা নিষ্পত্তির জন্য একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দিয়ে প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
‘সিন্ডিকেট’ কতটা সক্রিয়?
ডিএইর একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক দুই মহাপরিচালকের অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করে পেনশনসহ অবসর-পরবর্তী সুবিধা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশাসনিকভাবে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথির গতিপথ, ফাইলের নোটশিট, অডিট আপত্তির জবাব, নিষ্পত্তি কমিটির কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা জরুরি।
কারণ অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি একটি নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাব, অডিট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ, আপত্তির প্রকৃতি এবং প্রমাণিত আর্থিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনা করার কথা। কোনো ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দেয়া হলে তার ভিত্তিও নথিতে থাকার কথা। এসব বিষয় যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রশ্ন উঠছে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে
খামারবাড়ির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে- বিপুল অঙ্কের অডিট আপত্তি কেন বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন থাকছে এবং সেগুলো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রাখছেন?
বিশেষ করে ৭৩৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি আর্থিক সংশ্লেষযুক্ত অনিষ্পন্ন আপত্তির ক্ষেত্রে প্রতিটি আপত্তির বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিত জবাব, অডিট অধিদফতরের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে আনা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
একই সাথে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে কাউকে দায়ী করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি তদন্ত বা অডিটে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের বিষয় উঠে আসার পর তা প্রভাব খাটিয়ে নিষ্পত্তি করার অভিযোগও প্রশ্নের বাইরে নয়। তাই খামারবাড়ির বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তিতে নথিভিত্তিক স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








