চার দিন পর ফের পুঁজিবাজার সূচকের বড় পতন

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে টানা পতনের পর সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল দেশের পুঁজিবাজারগুলো। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শিল্পকারখনায় নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের আশ^াস দেয়া হলে এরই প্রভাবে গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করে। এর আগে জ¦ালানি সঙ্কটে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু কারখানা বন্ধও ঘোষণা করা হয়। 
জ¦ালানি সঙ্কটের কারণে উৎপাদন খাতের পাশাপাশি সেবা খাতও প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। যেহেতু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই শিল্প ও সেবা খাতের, তাই স্বাভাবিক কারণেই এর প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারেও। পুঁজিবাজারে টানা দরপতন ঘটতে থাকে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এ সময় প্রায় ৫০০ পয়েন্ট সূচক হারায়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) হারায় প্রায় ৮০০ পয়েন্ট। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নানা উদ্যোগ সত্ত্বে¡ও থামাতে পারেনি বাজারের পতন। 
১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শিল্প কারখানায় নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের আশ^াস দিলে পরদিনই পাল্টে যায় বাজার পরিস্থিতি। ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বাজার। পরবর্তী চারটি কর্মদিবসে ঢাকা স্টকে সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটে । কিন্তু ২০ সেপ্টেম্বর সরকার জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিলে এর দ্রুত প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। ২১ সেপ্টেম্বর দিনভর সূচকের অস্থির আচরণের পর দিনশেষে দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়। 
ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪১ দশমিক ৭১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৫৯২ দশমিক ২০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৫৫০ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ২৬ ও ১১ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এদিন ৩৪ দশমিক ০৮ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৫৯ দশমিক ৭৮ ও ১৮ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট। 
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা সূচকের এ নেতিবাচক আচরণের কারণ হিসাবে তাৎক্ষণিকভাবে জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের মানুষের জীবন জীবিকার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জনজীবনে বিভিন্ন প্রতিকূলতা তৈরি হবে। একইভাবে এটি উৎপাদন ও সেবা খাতকেও কমবেশি প্রভাবিত করবে। আর খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে এ সঙ্কট পুঁজিবাজারকেও প্রভাবিত করছে। তবে তারা মনে করেন, বিনিয়োগকারীরা সচেতনতার সাথে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারলে পতন সামলে ওঠা সম্ভব। 
যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ¦ালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মার্চ মাসের শুরু থেকেই বিশ^বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো গত ১৯ এপ্রিল সব ধরনের জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ায়। এরই ৪ মাসের মাথায় ২০ সেপ্টেম্বর আবার সবধরনের জ¦ালানি তেলের দাম ২০ টাকা করে বৃদ্ধি ঘোষণা দেয়। 
গতকালের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজারে সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটলেও তা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা ছিল। বারবারই পতন ঘটতে থাকা বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সূচককে ঊর্ধ্বমুখী করেছে। এ সময় সূচকের আচরণে বেশ অস্থিরতা থাকলেও বাজারের গতি ছিল অনেকটা স্বাভাবিক। তবে শেষ দিকে এসে বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা হতাশা ভর করে। বেলা ১২টার পরই বাজারে বড় বিক্রয়চাপটি আসে যা আর অতিক্রম করে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে দিনশেষে বড় পতন ঘটে সূচকের। 
সূচকের অবনতি সত্ত্বেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে। ঢাকায় গতকাল ৭৮৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৪১ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৪৭ কোটি টাকা। একইভাবে লেনদেন বেড়েছে চট্টগ্রামেও। এদিন সিএসইর লেনদেন ছিল ২১ কোটি টাকা যা আগের দিনের চেয়ে ১১ কোটি টাকা বেশি। রোববার সিএসইর লেনদেন ছিল ১০ কোটি টাকা। 
ঢাকা স্টকে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং কোম্পানি ইস্টার্ন ব্যাংক। ২৭ কোটি ৭১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ২০ লাখ ৬৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় এক কোটি ৩২ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে টেক্সটাইল খাতের শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এনভয় টেক্সটাইল, আইপিডিসি, ওরিয়ন ইনফিউশন, বেক্সিমকো লিমিটেড, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স। 
মূল্যবৃদ্ধিতে গতকাল মিউচুয়াল ফান্ড ও বীমা খাতের প্রাধান্য ছিল। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড। গতকাল ফান্ডটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বীমা কোম্পানি ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ওরিয়ন ইনফিউশন, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, এল আর গ্লোবাল ফার্স্ট ৃমিউচুয়াল ফান্ড, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ফান্ড ও প্রাইম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড। 
দরপতনে গতকাল ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল আনলিমা ইয়ার্ণ ডাইং। এদিন ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল পিপলস লিজিং। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সমতা লেদার, নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, দেশ গার্মেন্ট, মতিন স্পিনিং, সিলকো ফার্মা, আরএসআরএম স্টিলস ও বে- লিজিং।