
এস এম মিন্টু
শিশুরা খুন হচ্ছে তাদের পরিচিতদের হাতে। এমনকি নিজেদের ঘরের ভেতরেই অনেকে হত্যার শিকার হচ্ছে। আবার নিখোঁজ হওয়ার পর কারো কারো লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে দ্রুত সাড়া না পাওয়া ও বিচারহীনতার কারণে এমন খুনোখুনি বাড়ছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও নিখোঁজের ঘটনায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, একেবারে ছোট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অভিযুক্তদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে বাবা-মা, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা অন্যান্য পরিচিত মুখ। কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যু বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। শিশুরা নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে, পাশাপাশি পরিচিতদের কাছেও তারা ঝুঁকিতে আছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন বা সহিংসতার পর ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে পুরো বছরজুড়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৮৬ শিশু। এ ছাড়াও চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ শিশুর। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গত সাত মাসে নিখোঁজ হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশু। তার মধ্যে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফেরত এসেছে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন শিশু। এখনো হদিস পাওয়া যায়নি দুই হাজার ৩৮ জন শিশুর।
শিশু অধিকার সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৭৮টি ঘটনায় খুনের শিকার হয়েছে ৮৬ জন শিশু। ২০২৫ সালে খুন ১২৪ শিশু, যৌন নির্যাতনের ঘটনা ৩০৮টি। খুনের অর্ধেকের বেশিতে জড়িত মা-বাবা ও নিকট আত্মীয়। যৌন নির্যাতনে বেশির ভাগ অপরাধী শিশুর পরিচিত এবং খুনের ঘটনায় সাজার খবর মাত্র তিনটিতে।
‘শিশুরাই সব’ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১২৪ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই বছর শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ৩০৮টি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যা ও যৌন নির্যাতন- দুই ক্ষেত্রেই শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা ছিল তাদের নিজের বাড়ি, আর অপরাধীদের বড় অংশই শিশুর পরিচিত।
প্রতিবেদনের হিসাবে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১১টি শিশু খুন হয়েছে; এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বছরজুড়েই চলছে। নিহতদের ৬৩ জন মেয়ে, ৫৯ জন ছেলে, দু’জনের লিঙ্গ পরিচয় মেলেনি। ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু সবচেয়ে বেশি- ৬৪ জন (৫১.৬১ শতাংশ); ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৩৭ জন, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১২ জন। বিভাগওয়ারি সর্বোচ্চ ৩৮টি ঢাকায়; সবচেয়ে কম সিলেট ও বরিশালে, পাঁচটি করে।
৬৬.১২ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে এবং শিশুর নিজের ঘর বা আত্মীয়ের বাড়িতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (মাদরাসা/স্কুল) ১২.৯ শতাংশ, ঝোপঝাড়-মাঠ-নির্জন স্থানে ৮.৮৭ শতাংশ, জলাশয়ে ৬.৪৫ শতাংশ ও রাস্তায় ৪.৩ শতাংশ। গ্রামে মূলত পারিবারিক কলহ ও জমিজমার বিরোধ, শহরে বেশির ভাগ ঘটনা প্রকাশ্য স্থানে ঘটেছে। ৬৪টি (৫১.৬১ শতাংশ) ঘটনায় জড়িত ছিল পরিবারের সদস্যরা- ৩৮টিতে মা-বাবা, ২৬টিতে নিকট আত্মীয়। মা-বাবার ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি ও মানসিক অসুস্থতার কথা এসেছে। প্রতিবেদনে একে সমাজে ‘নতুন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা’ বলে কারণ বিশ্লেষণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেশী বা পরিচিত ১৮টিতে (১৪.৫২ শতাংশ), শিক্ষক বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ১৫টিতে (১২.১০ শতাংশ) জড়িত ছিল; শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো ‘পড়া মুখস্থ না হওয়া বা শাসন করার নামে’ পিটিয়ে হত্যা বলে বর্ণিত। বাকি ২৭টি ‘অন্যান্য’ শ্রেণীতে, যার মধ্যে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া ঘটনাও আছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত কারণের শীর্ষে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্ব ৪৭টি (৩৭.৯ শতাংশ)। এরপর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা (১২টি), যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ (৯টি), মুক্তিপণ ও অপহরণ (৭টি), মাদরাসায় নির্যাতন (৬টি)। ৩২টির (২৫.৯ শতাংশ) সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি বা তদন্তাধীন। প্রতিবেদন বলছে, এসব কারণ প্রায়ই প্রাথমিক তথ্যনির্ভর।
এ দিকে জবাবদিহির চিত্রও ক্ষীণ। ১২৪টি খুনের মধ্যে মামলা হয়েছে ৩৫টিতে, আটক ২৯টিতে; ৩২টির তদন্ত চলছে। সাজার খবর প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ২টি ঘটনায়।
যৌন নির্যাতনের চিত্র : ৩০৮টি ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ ১৯৭টি (৬৩.৯৬ শতাংশ), ধর্ষণের চেষ্টা ৭৭টি (২৫ শতাংশ), দলগত ধর্ষণ ২৪টি (৭.৭৯ শতাংশ), ধর্ষণের পর হত্যা বা মৃত্যু ১০টি (৩.২৫ শতাংশ)। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় ৯০টি (২৯.২২ শতাংশ), চট্টগ্রামে ৫২টি (১৬.৮৮ শতাংশ), রাজশাহীতে ৩০টি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি- ১২৬ জন (৪০.৯১ শতাংশ); ০ থেকে ৬ বছর বয়সী ৯৬ জন, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৮৬ জন। মেয়ে শিশু ১৩০ জন, ছেলে শিশু ১১ জন; ১৬৭টি ঘটনায় (৫৪.২২ শতাংশ) লিঙ্গ উল্লেখ নেই, যা তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত। ৫৯.০৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে ঘরে- ভুক্তভোগী বা অপরাধীর বাড়িতে; বাইরে ২৭.৬০ শতাংশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৩.৩১ শতাংশ। প্রতিবেশী জড়িত ১২৫টিতে (৪০.৫৮ শতাংশ), পরিচিত ৬৬টিতে, শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক ৪৫টিতে, আত্মীয় ৪২টিতে; অপরিচিত ৩০টিতে (৯.৭৪ শতাংশ)। প্রলোভন (চকোলেট, টাকা, স্বর্ণের আংটি), মিথ্যা সাহায্যের আশ্বাস, প্রতিশোধ এবং শিশুকে একা পাওয়ার সুযোগ- এসব কারণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি ভয়ের অভাব এবং দারিদ্র্য ও ঘিঞ্জি পরিবেশকেও সহায়ক উপাদান বলা হয়েছে। ২৪৬টি ঘটনায় (৭৯.৮৭ শতাংশ) মামলা বা গ্রেফতারের তথ্য আছে; ৪২টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। চূড়ান্ত সাজার তথ্য খুব কম প্রতিবেদনে মিলেছে; অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী পালিয়েছে বা জামিনে মুক্ত হয়েছে।
আলোচিত তিন ঘটনা : মাগুরা সদরের আট বছরের শিশু আছিয়ার ঘটনা ছিল ২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত। ৫ মার্চ রাতে বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সে নিখোঁজ হয়, পরে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তার আপন দুলাভাই ও বোনের শ্বশুর তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেন। ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি থাকা অবস্থায় ১৩ মার্চ সে মারা যায়। দেশজুড়ে প্রতিবাদে আদালত ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি হয়। ২০২৫ সালের ১৭ মে দুই মাসের মধ্যেই মামলার রায় হয়। ১৩ জুলাই যাত্রাবাড়ীর একটি হোটেলে ১২ বছর বয়সী এক ছেলেশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। খাবার কিনে দেয়ার কথা বলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তাকে হোটেলে নেয়া হয়েছিল। পরদিন হোটেলকর্মীরা লাশ পেয়ে পুলিশকে জানান। থানায় অজ্ঞাতপরিচয়দের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। পিবিআই আল-আমিন (৩৪) ও সাদ্দামকে শনাক্ত করে; আল-আমিন টঙ্গী থেকে গ্রেফতার হয়ে আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষনের পর মাথা কেটে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্ন্ আক্তারকে ৭ জুন অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
পুলিশের তথ্য : পুলিশের তথ্যে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের খবর জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। দুই হাজার ৩৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি। এখনো নিখোঁজদের মধ্যে ৬৮ জনের বয়স ৯ বছর পর্যন্ত এবং এক হাজার ৯৭০ জনের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, শিশুরা নানা কারণে নিখোঁজ হয়। অনলাইন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) চালু হওয়াও নিখোঁজের অভিযোগ বাড়ার একটি কারণ। তবে আসকের কাছে বিষয়টি কেবল কতজন শিশু নিখোঁজ হচ্ছে তা নয়; কর্তৃপক্ষ তাদের নিরাপদে ঘরে ফেরাতে যথেষ্ট দ্রুত সাড়া দিতে পারছে কি না সেটিও।
আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, আমরা শুধু নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে পেতে চাই না; আমরা চাই তাদের জীবিত উদ্ধার করা হোক। নিখোঁজ থাকার পর কোনো শিশুর লাশ উদ্ধার হলে তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, শিশুটি কিভাবে নিখোঁজ হয়েছিল, তাকে খুঁজে পেতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কোনো অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না এবং অপরাধে কারা জড়িত ছিল তাদের খুঁজে বের করা। অপ্রতিমের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিখোঁজের খবর জানানোর পর ফোন ট্র্যাকিংয়ের সহজলভ্য প্রযুক্তি যথেষ্ট দ্রুত ব্যবহার করা হয়েছিল কি না সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।
বিপদ ঘরের কাছে, কখনো ঘরেই। অপ্রতিমের মৃত্যুই সে দিন শিশুদের নিয়ে ঘটা একমাত্র ট্র্যাজেডি ছিল না। উদ্বেগ কেবল নিখোঁজ শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে, সুনামগঞ্জে বাবা তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে পরে নিজে বিষ খেয়েছেন বলে অভিযোগ। তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, বাবা হাসপাতালে ভর্তি।
মানিকগঞ্জে মা-বাবার সাথে একটি শিশুকেও মৃত পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহ, স্ত্রী ও শিশুকে হত্যার পর স্বামী আত্মহত্যা করেছেন। সামগ্রিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বলতা ও বিচারে বিলম্বের কারণে শিশুদের প্রতি সহিংসতা চলতেই থাকে। আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে আলোড়ন তুললে তখন পদক্ষেপ শুরু হয়, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তিনি বলেন, নতুন ঘটনার দিকে জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের মনোযোগ সরে গেলে মামলাগুলো দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় আটকে যায়। প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর আইনিব্যবস্থা ও সময়মতো শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আরো সম্পৃক্ততা এবং মা-বাবার আরো কড়া তত্ত্বাবধানের আহ্বানও জানান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








