
পটুয়াখালী প্রতিনিধি
সরকার নির্ধারিত মাত্র ৬৯ টাকা রাজস্বের বিপরীতে প্রায় চার লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে একটি ভুয়া মাছ ধরার অনুমতিপত্র (বিএলসি) ইস্যু করার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা বন বিভাগের সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগ ওঠার পর গত আগস্ট মাসে আজাদ স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেন। রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমকের বাবা।
তিন মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরার অনুমতিপত্র পেতে রাঙ্গাবালী উপজেলা যুব অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব মামুন কবিরাজ বন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদকে টাকা দিচ্ছেন। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিলেন উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন।
বন বিভাগের কার্যালয়ের একটি চেয়ারে বসে আজাদকে তখন আর্জেন্টিনা-মেসির প্রসঙ্গ টেনে বলতে শোনা যায়, তাদের কষ্ট সফল হলে মামুনদের কষ্টও সার্থক হবে। এরপর মামুন তার হাতে থাকা দু’টি বাদামি খাম হেলালের হাতে দেন, যাতে দুই লাখ টাকা থাকার কথা জানান তিনি। হেলাল তখন আরো এক লাখ টাকা দাবি করেন, যা দিতে অস্বীকৃতি জানান মামুন। এক পর্যায়ে হেলালকে বলতে শোনা যায়, ডিএফওকে বলে আরেকজনের আড়াই লাখের কাছাকাছি টাকা ফেরত দিতে হবে এমন মন্তব্যের জবাবে আজাদ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, তবে কি সে টাকা তাকেই দিতে হবে। দরকষাকষি শেষে টাকার খাম দু’টি নিজের হেফাজতে নেন আজাদ, আর বাকি টাকা বিএলসি হাতে পাওয়ার সময় দেয়ার কথা বলেন মামুনকে।
মামুন কবিরাজ (২৯) জানান, গত ১১ জুলাই হেলাল উদ্দিনের মধ্যস্থতায় তিনি আজাদকে নগদ দুই লাখ টাকা দেন। এরপর ১৩ জুলাই বিএলসি সংগ্রহের সময় আরো এক লাখ টাকা নগদ এবং জামানত হিসেবে ৮০ হাজার টাকার দু’টি পৃথক চেক জমা রাখতে হয় তাকে; পরে নগদে ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করে চেক দু’টি ফেরত নেন। সেই বিএলসি নিয়ে লোকজন মাছ ধরতে গেলে স্থানীয় সাইদুল গাজী বাধা দেন। এরপর আজাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হলে ১৬ জুলাই মামুন সরাসরি জেলা বন কর্মকর্তা ড. জাহিদুর রহমান মিয়ার কাছে অভিযোগ জানান। জেলা কার্যালয় থেকে তাকে জানানো হয় রেঞ্জ কর্মকর্তার বিএলসি ইস্যুর এখতিয়ারই নেই, এবং তার নামে ইস্যু করা কাগজটি নথিভুক্ত নয়, অর্থাৎ ভুয়া। এরপর মামুন মৌখিকভাবে টাকা ফেরতের আবেদন করলে জেলা কর্মকর্তা বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন বলে জানান তিনি।
মধ্যস্থতাকারী হেলাল উদ্দিনও লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আজাদ মামুনের কাছ থেকে তিন লাখ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জাল বিএলসি দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বিএলসি দেয়ার নামে তার কাছ থেকেও আজাদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা নিয়েছেন, যার মধ্যে তিন লাখ ১৫ হাজার টাকা এখনো তার পাওনা।
আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, তিনি মামুনের কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি, এমনকি তাকে চেনেনও না বলে দাবি করেন। ভিডিওতে টাকা লেনদেনের কোনো প্রমাণ নেই বলেও তার ভাষ্য। তবে একই সাথে তিনি বলেন, মামুনকে বিএলসি দিতে গিয়েই তার চাকরিতে সমস্যা হয়েছে এবং হেলালকে ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে তাকে নিয়ে সামনে আসার আহ্বান জানান। অপরাধ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নথি অনুযায়ী, গত ২৪ মে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী তথা পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল হক নুরের সুপারিশ সংবলিত আবেদনের ভিত্তিতে মামুন কবিরাজ চর খলিফা ডুবোচরে খুঁটা জাল ও বেড় জাল দিয়ে মাছ ধরার অনুমতি চান। এর ভিত্তিতে ১৩ জুলাই ২০৩ নম্বর সিরিয়াল ও ১৫৪০ নম্বর পত্রে মামুনের নামে বিএলসি ইস্যু করেন আজাদ, যাতে রাজস্ব দেখানো হয় মাত্র ৬৯ টাকা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, একই সিরিয়াল ও পত্র নম্বরে আছমত আলী গাজী, দেলোয়ার তালুকদার ও ইদ্রিস মৃধার নামেও পৃথক তিনটি বিএলসি ইস্যু করা হয়। যদিও বন বিভাগের বিধি অনুযায়ী একই সিরিয়াল-পত্র নম্বরে একাধিক ব্যক্তির নামে বিএলসি ইস্যুর কোনো সুযোগ নেই।
এই অনিয়ম ধরা পড়ার পর গত ২৬ জুলাই পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. জাহিদুর রহমান মিয়া মামুনসহ চারটি বিএলসিই বাতিল করেন। বাতিল আদেশে উল্লেখ করা হয়, জেলা কার্যালয়ের স্টোররুমে সংরক্ষিত ২০৩ নম্বর সিরিয়ালের বিএলসি বিধিবহির্ভূতভাবে ইস্যু হয়েছিল।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো: জাহিদুর রহমান মিয়া ও সহকারী বন সংরক্ষক ছুটিতে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বরিশাল বিভাগীয় বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে প্রতারণার অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার তাদের নেই, সেটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আওতাভুক্ত বলেও জানান তিনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








