মতামত
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

অসুস্থ মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসে একটিই আশা নিয়ে, যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাবেন। সেখানে উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, চিকিৎসকের উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দ্রুত পরীক্ষা এবং মানবিক আচরণই রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা নেয়। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে পরিদর্শনের তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা তাৎক্ষণিক নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে জনবল, ওষুধ, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিভিত্তিক স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারে রূপ নেবে।
গত ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা ও জনপরিসরসহ ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন। তিনি যান কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার এই কর্মসূচিতে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা, ব্যবস্থাপনা ও সেবার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিন সময় দেয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে অবহেলা, অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো মেনে নেয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের ইতিবাচক দিক হলো, এটি প্রশাসনিক তদারকিকে কাগুজে প্রতিবেদন ও নিয়মিত দাফতরিক বৈঠকের বাইরে এনে বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আকস্মিক পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যে জবাবদিহির তাগিদ সৃষ্টি হয়। বিশেষত জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সময়ে হাসপাতালের পরিবেশের প্রতি এই মনোযোগ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পরিদর্শনের গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি এটিও মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের সামগ্রিক সেবার মান কেবল পরিচ্ছন্নতা কিংবা কয়েকটি কক্ষের অবস্থা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। চিকিৎসক-নার্সের সংখ্যা, ওষুধের মজুদ, পরীক্ষাগারের কার্যকারিতা, শয্যাসঙ্কট, রোগীর চাপ এবং জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় সঙ্কট জনবল সঙ্কট। ২০২৬ সালের ১০ জুন জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ৯ হাজার ৪০৭টি শূন্য ছিল। একইভাবে ৪৯ হাজার ৫০১টি নার্স পদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৩২টি এবং ২৬ হাজার ৫৪৪টি স্বাস্থ্যকর্মীর পদের মধ্যে আট হাজার ৭৮৪টি শূন্য ছিল। অর্থাৎ, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলিয়ে ২৩ হাজারের বেশি পদে জনবল ছিল না।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য গভীর। একটি হাসপাতালে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি রোগীকে পরীক্ষা করার মতো চিকিৎসক ও সেবা দেয়ার মতো নার্স থাকা অপরিহার্য। জনবল না থাকলে যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সেবা দেয়া সম্ভব হয় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে রোগীকে জেলা সদর কিংবা রাজধানীতে ছুটতে হলে তার চিকিৎসাব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং বড় হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
তাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত হাসপাতালভিত্তিক জনবলের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী পদায়ন এবং কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক ধরে রাখতে নিরাপদ আবাসন, প্রয়োজনীয় কর্মপরিবেশ, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে দায়িত্বে অবহেলা বা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, জনবল সঙ্কটের দায় শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না; নিয়োগ, পদায়ন ও ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক দুর্বলতাও দূর করতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওষুধের প্রাপ্যতা। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র পাওয়ার পর রোগীকে যদি অধিকাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই ব্যয় অনেক সময় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিটি হাসপাতালের ওষুধের মজুদ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কোন ওষুধ কত এসেছে, কত বিতরণ হয়েছে এবং কত অবশিষ্ট রয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ন্যূনতম মজুদ নির্ধারণ করে ঘাটতি দেখা দেয়ার আগেই সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ওষুধের অপব্যবহার ও চুরি রোধে নিয়মিত নিরীক্ষা এবং অভিযোগ তদন্তও নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি বিভাগকে কার্যকর করা স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত। সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, প্রসূতি জটিলতা কিংবা শিশুর সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হলে জীবনহানির ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও নার্স, অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, সচল পরীক্ষাগার এবং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেসব পরীক্ষা উপজেলা পর্যায়ে সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে রোগীকে কোথায় পাঠানো হবে, কিভাবে দ্রুত স্থানান্তর করা হবে এবং পরবর্তী হাসপাতালে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা কিভাবে বজায় থাকবে, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি।
পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। হাসপাতালের শৌচাগার, ওয়ার্ড, পানির ব্যবস্থা, চিকিৎসাবর্জ্য অপসারণ ও খাবারের পরিবেশ রোগীর নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। পরিদর্শনের আগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে পরিবেশ ঠিক করা যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট জনবল, বাজেট এবং তদারকি থাকতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন প্রতিবেদন সংরক্ষণ এবং ত্রুটি সংশোধনের অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ‘দৃশ্যমান সেবা, দ্রুত ফল’ নামে একটি সময়াবদ্ধ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। প্রথমপর্যায়ে প্রতিটি বিভাগে নির্বাচিত জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষামূলকভাবে কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। চিকিৎসকের উপস্থিতি, ওষুধের প্রাপ্যতা, জরুরি সেবার কার্যকারিতা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, পরিচ্ছন্নতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা হবে মূল্যায়নের প্রধান সূচক। তিন মাস পর ফলাফল পর্যালোচনা করে দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে এবং সফল উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করতে হবে।
প্রতিটি হাসপাতালের প্রবেশপথে নাগরিক সনদ দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা প্রয়োজন। সেখানে বিনামূল্যে পাওয়া যায় এমন ওষুধের তালিকা, সেবার সময়সূচি, সরকারি ফি, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগাযোগের তথ্য থাকবে। অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন, এসএমএস, অনলাইন ব্যবস্থা ও সরাসরি অভিযোগ বাক্স চালু করা যেতে পারে। অভিযোগ গ্রহণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত এবং গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিযোগকারীকে অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি রোগীর গোপনীয়তা ও চিকিৎসকদের পেশাগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাসপাতাল পরিদর্শন যেন ব্যক্তিনির্ভর তদারকিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় কোনো হাসপাতালে গিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন; কিন্তু দেশের প্রতিটি হাসপাতাল নিয়মিত পরিদর্শন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। সেটি কাঙ্ক্ষিতও নয়। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন এবং হাসপাতাল পরিচালকদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট আছে। প্রতি মাসে হাসপাতালভিত্তিক সেবার অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রতি তিন মাসে স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কতজন রোগী সেবা পেলেন, কত দিন ওষুধের ঘাটতি ছিল, কতটি যন্ত্রপাতি অচল ছিল, কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতটি পদ শূন্য রয়েছে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনকে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখা যায়। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পরিদর্শনের নির্দেশনাকে বাজেট বরাদ্দ, জনবল নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির সাথে যুক্ত করতে হবে।
দেশের একজন দরিদ্র নাগরিক যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের অপেক্ষায় কোনো সঙ্কটাপন্ন রোগী যেন অসহায় হয়ে না পড়েন এবং উপজেলা পর্যায়েই যেন অধিকাংশ সাধারণ রোগের প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায়, স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারকে এই লক্ষ্য সামনে রেখেই এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের প্রকৃত সাফল্য সংবাদে প্রকাশিত ছবি কিংবা তাৎক্ষণিক নির্দেশনার সংখ্যায় পরিমাপ করা যাবে না। সাফল্যের মাপকাঠি হবে কয়েক মাস পর একজন রোগী হাসপাতালে গিয়ে কত দ্রুত, সুলভ, নিরাপদ ও মানবিক চিকিৎসা পাচ্ছেন। পরিদর্শন যদি নিয়মিত তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং সেবার মানোন্নয়নের স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ নেয়, তবেই এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। 
লেখক : কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক

Advertisement

msislam.sumon@gmail.com