মতামত, উপসম্পাদকীয়
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

সম্প্রতি সৌদি আরবের একটি মসজিদে বাংলাদেশী এক পুরুষ ও এক নারীর ‘অনৈতিক কাজ’ করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সৌদি প্রেস এজেন্সির রিপোর্ট থেকে প্রতীয়মান হয় না যে, তারা মসজিদে যেনা বা ব্যভিচার করেছেন। অনৈতিক বা অশ্লীলতা বলতে তারা হয়তো ক্ষণিকের জন্য ঘনিষ্ঠ বা একান্ত মুহূর্ত পার করেছেন। ইসলামিক ক্রিমিনাল ল-এর ভাষায় এটিকে ‘খালওয়াত’ বলে, যার ইংরেজি পরিভাষা প্রোক্সিমিটি; অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি যেখানে জড়িত নারী ও পুরুষ অন্য কারো আগমন বা উপস্থিতি পছন্দ করবেন না বা তারা বিশ্বাস করবেন যে, সেখানে আর কেউ উপস্থিত নেই এবং এমন সুযোগে তারা ঘনিষ্ঠ হবেন। এই অনৈতিকতা বা ঘনিষ্ঠতা কোনোভাবে ব্যভিচার বা অ্যাডাল্টারিটির অন্তর্ভুক্ত নয়। 
অন্য দিকে মুসলিম শরিয়াহ আইনে শাস্তির বিধান দুই প্রকার। হুদুদ বা হদ ও তা’জির।  হদের ক্ষেত্রে শরিয়াহ কর্তৃক প্রদত্ত শাস্তি পরিবর্তন করার এখতিয়ার আদালতের নেই। অন্য দিকে তা’জির হলো এমন অপরাধের শাস্তি যেখানে শাস্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট করা নেই এবং যে ক্ষেত্রে আদালত যথেষ্ট ডিসক্রেশন বা স্বেচ্ছাক্ষমতা বা সুবিবেচনা ব্যবহার করতে পারে (Audah, abd. Al-Qadir, Al-Tashri’a Al-Jinai Al-Islami, Vol.II, Page.343)। মোটাদাগে কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে হদ বা নির্দিষ্ট শাস্তি প্রয়োগের বিধান আছে। যেমন— ব্যভিচার, কাজফ বা ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ, চুরি, দস্যুতা, ডাকাতি, মদ্যপান, রাষ্ট্রদ্রোহী ও ধর্মত্যাগ । (Dr. Anwarullah, The Criminal Law of Islam, Kuala Lumpur, Page-112)
অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে ইসলামিক শরিয়াহতে তা’জির বা বিচারকের বিবেচনাধীনে শাস্তি দেয়ার বিধান বিদ্যমান। ব্যভিচারের ক্ষেত্রে হদ অর্থাৎ অবিবাহিত নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত  এবং বিবাহিত ব্যভিচারীর ক্ষেত্রে পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান আছে। যদিও পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিষয়ে বেশ কিছু ইসলামিক ফকিহ দ্বিমত পোষণ করেন, যেহেতু পবিত্র কুরআনের মধ্যে পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিষয়ে কোনো আয়াত পাওয়া যায় না। তবে একাধিক মাশহুর হাদিস (একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দ্বারা হাদিস ও ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত) দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসূলুল্লাহ সা: তার জীবদ্দশায় ব্যভিচারের কারণে মোট তিনজন— একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলার পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, দ্বিতীয় খণ্ড, নাইলুল আওতার, সপ্তম খণ্ড ও সহিহ মুসলিম, দ্বিতীয় খণ্ড) অন্য দিকে রাসূল সা: মদিনায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দু’জন ইহুদি নারী-পুরুষের ব্যভিচারের দায়ে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। (বুখারি) যেসব ফকিহ বিবাহিত নারী-পুরুষের ব্যভিচারের দায়ে পাথর নিক্ষেপের বিধানের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন তাদের যুক্তি হলো— সূরা আন-নূর (২৪ নম্বর সূরা) এর ২নং আয়াত যার অর্থ হলো—  ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী— তাদের প্রত্যেককে ১০০ বেত্রাঘাত কর। আল্লাহ বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহতে ও আখিরাত দিবসে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ তাদের মতে, নবীর সুন্নাত কখনো আল্লাহর দেয়া বিধানকে বাতিল করতে পারে না। অন্য দিকে রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধানের পক্ষে যেসব ফকিহ মত দেন, তারা আগে উল্লিখিত মাশহুর  হাদিসের রেফারেন্স দেন এবং তারা মনে করেন, পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত এর বিধান মাশহুর হাদিসের দ্বারা রূপান্তরিত আকারে পরিবর্তিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। একই সাথে শাস্তি আরোপের ঘটনার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে তারা বলেন, রাসূল সা: বিবাহিত ব্যভিচারীকে সূরা নূরের ২ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার পরও পাথর নিক্ষেপে হত্যা কার্যকর করেছেন। আমাদের আজকের আলোচনার জন্য এ বিতর্কের খুব গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। 
পত্রপত্রিকা থেকে যা বোঝা যাচ্ছে— মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশী মসজিদের মধ্যে একে-অপরের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন, তবে ব্যভিচার করেননি। পবিত্র মসজিদে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত এবং ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী ঘৃণিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তারা অবশ্যই গর্হিত অন্যায় করেছেন। তাই বলে এ ঘনিষ্ঠ হওয়াকে কোনোভাবে ব্যভিচার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্র বা এর বিচারব্যবস্থা কোনোভাবে ব্যভিচার সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে ব্যভিচারে শাস্তি— তা রজম হোক বা বেত্রাঘাত হোক, বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বুখারি ও ইবনে মাজার বর্ণনায় পাওয়া যায়, মদিনাতে এক মহিলা ছিলেন যাকে প্রচলিতভাবে মোটামুটি সবাই জানত যে, সে বেশ্যাবৃত্তি করত। কিন্তু তার বিরুদ্ধে শাস্তি আরোপের পূর্বশর্ত হিসেবে যথাযথ প্রমাণ (চাক্ষুস সাক্ষী) ছিল না। রাসূল সা: তার বিষয়ে বলেছিলেন, আমি প্রমাণ ছাড়া পাথর নিক্ষেপে যদি কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতাম তবে ওই মহিলাকে দিতাম। তবু সমাজে কথিত থাকলেও প্রমাণের অভাবে তাকে কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। হাদিসের একাধিক ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, ব্যভিচার ছাড়া বিয়েবহির্ভূত ঘনিষ্ঠতা বা সম্পর্কের (খালওয়াত) কারণে তা’জির বা লঘুদণ্ড দেয়া হয়েছে। (Afzalur Rahman, Encyclopedia of Seerah, Vol. II, Page- 791-792). 

Advertisement

পত্রপত্রিকা বরাতে জানা যায়, সৌদির আদালত তা’জির বা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে মসজিদে অনৈতিক কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামী ফৌজদারি আইনসহ সারা পৃথিবীর আইনি কাঠামোতে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান বলা না থাকলে আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার মাধ্যমে কাউকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা যায়? অথচ শরিয়াহ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে— খুন, বিবাহিত নারী-পুরুষের ব্যভিচার ও ধর্মত্যাগ ছাড়া আর কোনো কারণে মৃত্যুদণ্ড আরোপের সুযোগ নেই (সুনানে আবু দাউদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৭) 
মানুষের দ্বারা গঠিত কোনো কিছু ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, এমনকি একটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতও নয়— এটি আইন বিজ্ঞানের একটি প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত নীতি। মানুষ নিজেও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ন্যায়বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আদালত নামক অস্তিত্বের নিজস্ব কোনো স্বকীয়তা নেই; বরং এটি মানুষ পরিচালনা করে। মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা আছে বলে ফৌজদারি অপরাধে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে (Beyond reasonable doubt) প্রমাণিত হতে হয়। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হলে সন্দেহের সুবিধা  (Benefit of Doubt) অভিযুক্ত ব্যক্তি পাবেন। এ সুবিধা রাষ্ট্র বা প্রসিকিউশন পেতে পারে না। আর মৃত্যুদণ্ড আরোপযোগ্য অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের বিষয়ে তো আরো বেশি গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হয়।  
ইসলামী শরিয়াহ আইনেও অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার বিষয় এবং সন্দেহের সুবিধা (Benefit of Doubt) অভিযুক্ত ব্যক্তি পাবেন এই নীতি কার্যকর, যা একাধিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যদি বিষয়বস্তুর আলোকে ন্যায়নিষ্ঠার ভিত্তিতে কারো কোনো কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকা যায়, তবে বিরত থাকো।’ (ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা-১৬২)  রাসূল সা: আরো বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার হাত থেকে ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে বাঁচানো যায়, তবে তাকে শাস্তি থেকে পরিত্রাণ দাও।’ (ইবনে আসির, জার-আল-উসুল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৪) 
অথচ সৌদির বিচারিক আদালত কী করল বাংলাদেশের নাগরিকের বিচার করার ক্ষেত্রে! যেখানে স্পষ্টত শরিয়াহ আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি, সেখানে আদালতের বিচারক অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার প্রয়োগ করে শুধু অনৈতিকতার অপরাধে দু’জন মানুষের ওপর মৃত্যুদণ্ড আরোপ করেছে। সেই সাথে সৌদি সরকার তা কার্যকর করেছে। সৌদি সরকার বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দফতরকে একটিবার অবহিত করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। 
শান্তি, কল্যাণ ও ক্ষমার এক অনন্য জীবন বিধান ইসলাম। ইসলামী শরিয়াহ কি আসলে মানুষের প্রতি এতটা রূঢ় হতে দীক্ষা দেয়? কখনো না। ইসলামী শরিয়াহ আরো বেশি ন্যায়বিচার, ক্ষমা ও সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করেছে; যা এর মৌলিক বিধিবিধান অর্থাৎ কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এখানে আত্মীয়তা বা সম্পর্কের কারণে কারো প্রতি বিচারে নমনীয়তা প্রদর্শনের সুযোগ নেই, তেমনি কাউকে দুর্বল পেয়ে তার প্রতি বেশি কঠোরতা প্রদর্শনেরও সুযোগ নেই। 
ইসলাম কতটা ক্ষমার বার্তা দেয় তা প্রমাণের শত শত আয়াত ও হাদিস আছে। আলোচ্য বিষয়ে একটি হাদিস উল্লেখ করতে চাই। যথা : ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত— এক ব্যক্তি এক পরনারীকে চুমো দেয়। অতঃপর সে নবী সা:-এর কাছে এসে নিজের কৃত অপরাধের বিষয়ে অবহিত করে। এ সময় আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাজিল করেন— ‘আর তুমি দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয় সৎকাজগুলো গুনাহর কাজগুলোকে মুছে ফেলে দেয়।’ (সূরা হুদ-১১৪) লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এটি কি শুধু আমার জন্য? জবাবে রাসূল সা: বলেন, ‘আমার সব উম্মতের জন্যই।’ (বুখারি ও মুসলিম) 
সৌদির আদালত ও সরকার একটি লঘু অপরাধে দু’জন মানুষকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ও কার্যকর করেছে বলে গণমাধ্যমের সংবাদে তা প্রতীয়মান হয়। যেখানে কৃত অপরাধের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি উল্লেখ নেই। তা’জিরের নীতি বা বিচারকের স্বেচ্ছা ক্ষমতা (Discretionary Power) ব্যবহার করে একটি লঘু অপরাধে এভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া যায়! এটি কি ন্যায়বিচার? যেখানে হাদিস দ্বারা প্রমাণিত একই অপরাধের কারণে রাসূল সা: কোনো শাস্তি দেননি; বরং নামাজ ও ভালো কাজের পরামর্শ দিয়েছেন। এ সাজা কার্যকরের প্রেক্ষাপট থেকে কি মোটেও অনুমেয় হয় যে, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? 
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
mahbublaw92@gmail.com