
জিয়াউর রহমান এমন এক রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরেছিলেন, যা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দিকে এগিয়ে নেয়। তিনি দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর করেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবেলা করে নতুন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন। তার রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীলতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, বেসরকারি উদ্যোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীকে সম্পৃক্ত করা এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষকে সম্পৃক্ত করা। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
জিয়াউর রহমান মনে করতেন, বিপুল রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত। তিনি দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের পেশা কৃষিকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের কথা চিন্তাও করতে পারেননি। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষি। এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বসবাস গ্রামে। ফলে জিয়াউর রহমান গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী না করে জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে খাল খনন ও পুনঃখনন, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পতিত জমির ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া হয়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সেচের সুযোগ, কৃষি-উপকরণের সহজ প্রাপ্যতা এবং কৃষকের উৎপাদন উদ্যোগকে উৎসাহিত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। সেই সাথে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। এ জন্য ১৯ দফা কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। খাল খনন কর্মসূচির সাথে কৃষকের কর্মসংস্থান, সেচের সুবিধা এবং স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ধারণা যুক্ত ছিল।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বেসরকারি খাতের বিকাশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের প্রাধান্য ছিল। তার সরকারের সময়ে এ কাঠামোতে পরিবর্তন এনে বেসরকারি বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্ব দেয়া হয়। বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা দূর করা, শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা, বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং রফতানি বৃদ্ধির উদ্যোগ জিয়া সরকারের নীতির অংশ ছিল। এসময় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হয়। এ নীতির পেছনে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল— সরকার একা সব উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব পালন করতে পারে না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ব্যক্তি, উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার উৎপাদিত পণ্য ও সেবা কতটা কার্যকরভাবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে তার ওপর। জিয়াউর রহমানের সরকার রফতানি সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছিল। এ সময় বাংলাদেশের শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালে তৈরী পোশাকশিল্পের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাতে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও তার সময়ের উদ্যোগ ও বৈদেশিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
এখানে তার রাষ্ট্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়; দেশের উন্নয়ন শুধু অভ্যন্তরীণ সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং শ্রমশক্তির সুযোগের সাথে যুক্ত করা।
জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন চিন্তায় গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। গ্রাম-সরকার প্রতিষ্ঠার ধারণা, স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন উদ্যোগ এবং গ্রামীণ সমস্যা সমাধানে জনগণের অংশগ্রহণের প্রচেষ্টা ছিল এ চিন্তার অংশ। রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত রাজধানীকেন্দ্রিক হলে স্থানীয় সমস্যার যথাযথ সমাধান দুরূহ হয়ে পড়ে। কৃষকের সেচ, গ্রামীণ সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ তার রাষ্ট্রচিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্যোগের সাথে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সম্পর্ক বিকশিত করা। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসনের পরিবেশে তার ক্ষমতার উত্থান ঘটে। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নাগরিকদের বাদ রেখে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কোনোভাবে সম্ভব নয়। জনগণকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই কারণে শেখ মুজিবের প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন করেন তিনি। শুধু তাই নয়; তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণে নির্ভরশীল নয়। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের সমান প্রয়োগও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। যে কারণে বাকশালী আমলে বদ্ধ করে দেয়া সব পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। একই সাথে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন।
শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকে উন্নয়নের চাবিকাঠি ধরে জিয়াউর রহমান তার প্রণিত ১৯ দফা কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি অনুধাবন করেন, দেশের জনসংখ্যাকে মানশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়ন অপরিহার্য। বাংলাদেশে একটি উৎপাদন ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার দর্শন নিয়ে কাজ শুরু করেন জিয়াউর রহমাম। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার এক অবিচল আপসহীন সংগ্রাম।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








