
আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, আফ্রিকার শৃঙ্খলা ও কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে বাড়ছে গভীর উদ্বেগ। ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে নতুন করে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ আর কেবল কেন্দ্রীয় সরকার ও তিগ্রায়ের বিদ্রোহী শক্তির মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে মিসর, ইরিত্রিয়া, সুদান, সোমালিয়া এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নীলনদের পানিবণ্টন, সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার এবং সুদানের গৃহযুদ্ধ— এই পারস্পরিক সংযুক্ত বিরোধগুলো আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে একটি জটিল ও বিপজ্জনক নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করছে।
৮ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত জিওপলিটিক্যাল মনিটরের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। বিশেষত, একসময় ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদার ইরিত্রিয়া এখন সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, মিসর ও সুদানের সাথে ইথিওপিয়ার দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে।
১. তিগ্রায়ের যুদ্ধের পুনরুত্থান ও আঞ্চলিক বিস্তার
ইথিওপিয়ার বর্তমান সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে তিগ্রায় পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ)। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০২২ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সেই চুক্তি সঙ্ঘাতের মৌলিক কারণগুলোর— যেমন পশ্চিম তিগ্রায়ের নিয়ন্ত্রণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং টিপিএলএফের রাজনৈতিক অবস্থান— স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। নিরস্ত্রীকরণ ও সাবেক যোদ্ধাদের পুনর্বাসনপ্রক্রিয়াও থমকে যায়। ফলে শান্তিচুক্তিটি কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবর্তে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে পরিণত হয়।
২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর টিপিএলএফের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী জোট শিরে, আকসুম ও মেকেলের বিমানবন্দর দখল করে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে। ৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকারপন্থী বাহিনী মেকেলে প্রবেশ করলেও এটি কেবল সাময়িক নিয়ন্ত্রণ ছিল। সঙ্ঘাতের ধরন পাল্টে এখন এটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের দিকে গড়াচ্ছে। তাছাড়া, এই অশান্তি শুধু তিগ্রায়ে সীমাবদ্ধ নেই; আমহারা অঞ্চলে ফানো সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং আফার অঞ্চলে বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ইথিওপিয়ার অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের অশনিসঙ্কেত।
২. ইরিত্রিয়া : মিত্র থেকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ
ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া সম্পর্কের অবনতি বর্তমান সঙ্কটের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক বাঁক। ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবি আহমেদ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেও ২০২০ সালের তিগ্রায় যুদ্ধে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার পক্ষে সরাসরি অংশ নেয়।
কিন্তু বর্তমানে সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ইথিওপিয়ার অভিযোগ, ইরিত্রিয়া টিপিএলএফকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে (যদিও এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত দৃশ্যমান প্রমাণ কম)। ১ অক্টোবর ২০২৬ ইথিওপিয়া আসমারায় নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে এবং ১০ জন ইরিত্রীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। জবাবে ইরিত্রিয়াও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
এই বৈরিতার মূল কারণ কৌশলগত। ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতার পর ইথিওপিয়া স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বর্তমানে আবি আহমেদের সরকার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার ও নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে, তা ইরিত্রিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আসাব বন্দরের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করে আসমারা।
৩. লোহিত সাগর ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর পাল্টা অবস্থান
৪ অক্টোবর মিসরের নিউ আলামেইনে মিসর, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও সুদানের শীর্ষ নেতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ চারদেশীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যৌথ ঘোষণায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতায় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ অধিকারের ওপর জোর দেয়া হয়। তবে স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়াকে এই আলোচনার বাইরে রাখা হয়।
এটি ইথিওপিয়ার জন্য একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা। কারণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক শক্তির আসনেই ইথিওপিয়া সমুদ্রপ্রবেশকে জীবনমরণ প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। বিপরীতে, উপকূলীয় দেশগুলো একে তাদের নিরাপত্তাসত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
৪. নীলনদের পানি : মিসর-ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের স্থায়ী কেন্দ্র
ইথিওপিয়ার ব্লু নাইলের ওপর নির্মিত ‘গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম’ (জিইআরডি) ইথিওপিয়ার জাতীয় উন্নয়নের প্রতীক হলেও ভাটির দেশ মিসর ও সুদানের জন্য এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। পানির প্রবাহ ও বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি যা পক্ষগুলোর জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে।
নিউ আলামেইন ঘোষণায় মিসর ও তার মিত্ররা আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবহারে আন্তর্জাতিক আইন এবং ‘ক্ষতি না করার নীতি’ কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। কায়রোর জন্য এই অবস্থান যেমন পানির অধিকার রক্ষার, তেমনি হর্ন অব আফ্রিকায় নিজস্ব প্রভাব বজায় রাখারও কৌশল।
৫. সুদানের গৃহযুদ্ধ ও আফার অঞ্চলের অর্থনৈতিক ঝুঁকি
সুদানে সঙ্ঘাতের ছায়া : সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর (আরএসএফ) মধ্যে ২০২৩ সাল থেকে চলমান গৃহযুদ্ধ পুরো অঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে। ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহায়তার অভিযোগ আনা হলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তা অস্বীকার করেছে।
আফার করিডোরের বিপত্তি : ইথিওপিয়ার প্রধান আমদানি পথ— জিবুতি থেকে আসা সড়ক ও রেললাইন আফার অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে। আফার অঞ্চলে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইথিওপিয়ার সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি আমদানি এবং পুরো অর্থনীতি এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
৬. হর্ন অব আফ্রিকায় ইসরাইলের কৌশলগত স্বার্থ ও ভূমিকা
ইথিওপিয়ার সঙ্কটের বহুমাত্রিক ক্যানভাসে ইসরাইলের ভূমিকা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তেলআবিবের জন্য হর্ন অব আফ্রিকা এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ (বাব আল-মান্দেব প্রণালী) ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব : লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবেলায় ইসরাইল এই অঞ্চলে শক্তিশালী মিত্র খুঁজছে।
সমুদ্র প্রবেশে প্রকাশ্য সমর্থন : ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইথিওপিয়ায় নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্রাহাম নেগুইসে লোহিত সাগরে ইথিওপিয়ার প্রবেশাধিকারের প্রচেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। এই নীতিগত সমর্থন আবি আহমেদের সরকারকে কূটনৈতিকভাবে শক্তি জোগালেও মিসর ও ইরিত্রিয়ার সাথে ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সোমালিল্যান্ড কার্ড : ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং বেরবেরা বন্দর ও এর আশপাশে নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ইথিওপিয়ার সাথে সোমালিল্যান্ডের বন্দরভিত্তিক যোগাযোগের চেষ্টার সাথে ইসরাইলের এই পদক্ষেপের একটি ভূরাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে।
তবে মনে রাখা জরুরি, ইসরাইল তিগ্রায় যুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে না; বরং তাদের এই সম্পৃক্ততা বৃহত্তর লোহিত সাগরকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশলেরই অংশ।
উপসংহার
ইথিওপিয়ার বর্তমান গৃহযুদ্ধ আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। নীলনদের পানি, লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ, সুদানের সঙ্কট এবং ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হর্ন অব আফ্রিকা।
সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হলেও, রাজনৈতিক সংলাপ, প্রিটোরিয়া চুক্তির বাস্তবায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক সমঝোতা ছাড়া এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অসম্ভব। অন্যথায়, তিগ্রায়ের পাহাড় থেকে শুরু হওয়া এই দাবানল পুরো অঞ্চলকে এক গভীর বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








