মুজতাহিদ ফারুকী
মুজতাহিদ ফারুকী। নয়া দিগন্ত

ফ্রান্সে চলমান জেন-জি আন্দোলন রীতিমতো সহিংস প্রতিবাদে রূপ নিয়েছে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ মাত্রা ছাড়িয়েছে। জ্বলছে গাড়ি, ঘরবাড়ি, অফিস ভবন। লুট হয়ে যাচ্ছে দোকান, শপিংমল। কথিত সভ্য দেশের নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী কেউ লুটপাটে বিরত থাকেনি। ধরপাকড় চলছে। কিন্তু সামাল দিতে পারছে না সরকার। যে দেশে বিক্ষোভ সমাবেশে সাধারণত দুই-তিন শতাধিক লোক সমাগম হয় না, সেই দেশের রাজপথে গত শনি ও রোববার নেমে এসেছে পাঁচ থেকে আট লাখ মানুষ।
সহিংসতা শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেই, উত্তরাঞ্চলের লিল, লিয়ঁ, বোর্দো ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। লিমোজ শহরের প্রাচীন সিটি হল ভবন আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি ভবনে হামলা ও দোকানপাটে লুটপাটের খবর এসেছে। এ এক অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি! 
শুধু ফ্রান্স নয়, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, আলবেনিয়া, স্পেনেও ছড়িয়ে পড়েছে গণ-অসন্তোষ। এক কথায়, গোটা ইউরোপ এখন বিস্ফোরণে থরথর করে কাঁপছে। কেন এই পরিস্থিতি? আর কিছু নয়, যুদ্ধের প্রভাব। 
ইউরোপ যুদ্ধে জড়ায়নি। যুদ্ধ করছে রাশিয়া আর আমেরিকা। ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপের সংশ্লিষ্টতা আছে। রাশিয়ার রাশ টানতে বিপুল অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করেছে দেশগুলো। দেশটির বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিয়েছে ক্রুসেডের জজবা নিয়ে। ফলস্বরূপ রুশ জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ। সেই চাপ জনগণ সহ্য করছিল। এরপর আক্রান্ত ইরান বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম পকেটে টান ফেলেছে। সরকারের সামাজিক পরিষেবার মান কমেছে অথবা সঙ্কুচিত হয়েছে। জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল ও কঠিন। এ চাপ নিতে পারছে না আরাম আয়েশে অভ্যস্ত ইউরোপীয়রা। ইউরোপের প্রায় সব দেশের একই অবস্থা।
ফ্রান্সে আন্দোলন শুরু করেছে তরুণ শিক্ষার্থীরা, যাদের বলা হয় জেন-জি। পথ কিন্তু দেখিয়েছে বাংলাদেশ। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের জেন-জি অভ্যুত্থানের অভিঘাতে যে নেপালে সরকারের পতন ঘটেছে, এখন ভারতের কেন্দ্রস্থলে আছড়ে পড়েছে, এটি সবাই মানেন। এবার একই বিপ্লবের জবরদস্ত ঢেউ ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রে শাবল হানতে শুরু করেছে। 
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে গত সেপ্টেম্বরে। দাবি ছিল, জরাজীর্ণ শিক্ষা অবকাঠামো, শিক্ষক সঙ্কট, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বৈষম্য এবং তীব্র মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম কমানো এবং ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে কাঠামোগত রাজনৈতিক সংস্কারেরও দাবি তুলেছে। 
এ আন্দোলন শুরুর আগে আমাদের কল্পনায়ও ছিল না যে, এমন উন্নত দেশের স্কুলে শিক্ষকের স্বল্পতা থাকতে পারে, স্কুলভবন জরাজীর্ণ হতে পারে বা ক্লাসরুমে তাপমাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।  এ অবস্থার কারণ কী? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে বেশুমার অর্থ ব্যয় এর কারণ। বাস্তবে আরো অনেক কারণ আছে। সে প্রসঙ্গ পরে। 
গত সপ্তাহে স্পেনে তুমুল বিক্ষোভ হয়। অগ্নিসংযোগ হয়, পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীরা সংঘর্ষে জড়ায়। আলবেনিয়ায় বিক্ষোভের কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও উচ্চ শিক্ষাব্যয়। এর সাথে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের কাছে দেশটির একটি মনোরম দ্বীপ বিক্রির উদ্যোগের প্রতিবাদ। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন। তারা পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রলবোমা, ধাতব বস্তু ও আতশবাজি ছোড়ে। গাড়ি ও ডাস্টবিনে আগুন জ্বালিয়ে পুলিশের সামনে ব্যারিকেড দেয়। পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। রাত পর্যন্ত চলে সংঘর্ষ। এ সময় আদালত, ব্যাংক ও ডাকঘরসহ বিভিন্ন ভবনে আগুন দেয়া হয়। সেগুলো ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্পেনেও বিক্ষোভ হয়েছে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে। সরকার সমস্যা সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ নিলেও সংসদে ডান ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পেড্রো সেনচেজের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক সরকার আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। 
এদিকে গত ১৬ অক্টোবর ইতালিতে জেন-জি পালন করে ‘নো মেলোনি ডে’। রোম, মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়ার মতো প্রধান শহরগুলোতে শিক্ষার্থীরা রাজপথ অবরোধ করে। মিলানে জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে। কট্টর ডানপন্থী মেলোনি সরকারের শিক্ষানীতি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অভাব এবং শ্রেণিকক্ষে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বিদেশী শিক্ষার্থী রাখার বৈষম্যমূলক আইন, শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামরিক ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা ও জলবায়ু সঙ্কটে বরাদ্দ দেয়া, বৈষম্যমূলক ‘স্কুল ডিক্রি’ ও অভিবাসন নীতি বাতিলের দাবি তাদের। 
আলবেনিয়া, পর্তুগালের মূল সমস্যা আবাসন সঙ্কট, কম মজুরি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা। আছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন খরচ কমানো ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের দাবি। 
পিছিয়ে নেই খোদ আমেরিকার মানুষও। গত সোমবার দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শহরে প্রায় এক কোটি মানুষ যুদ্ধবাজ ট্রাম্পের পদত্যাগের দাবি জানায়। এমন সময় এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে যখন দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন আসন্ন। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে ট্রাম্পের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও উত্তাল জেন-জি আন্দোলনে। আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র নেহা বোরা সম্প্রতি এক সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলন মূলত বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের গান দেদার বাজছে দিল্লির যন্তর মন্তরে। ভারতের তরুণরা দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাবের পাশাপাশি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই তীব্র করে তুলেছে। সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এতে সংহতি জানিয়েছেন। একাট্টা হয়েছে বিরোধী দলও। আন্দোলনের মুখে এর আগে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে চলমান আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিকভাবে উসকানিমূলক’ এবং বিদেশী মদদপুষ্ট বলার চেষ্টা হচ্ছে। তবে তা জনগণের কাছে তেমন পাত্তা পাচ্ছে না। 
সম্ভাব্য ফল কী হতে পারে   
ফ্রান্সের আন্দোলন ২০২৭ সালের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। ম্যাখোঁ সরকারের এ সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সুবিধা নিয়ে কট্টর ডান বা বামপন্থী দলগুলো শক্তিশালী হতে পারে। ইতালিতেও আগামী বছর সাধারণ নির্বাচন। তার আগে মেলোনি সরকার পড়েছে বড় সঙ্কটে। এ আন্দোলনের ধারায় ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন প্ল্যাটফর্ম বা রাজনৈতিক দল গঠনের প্রবণতা বাড়তে পারে। যেমনটি বাংলাদেশ ও নেপালে দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় যে ফল আসতে পারে সেটি হলো— বিশ্ব রাজনীতির একটি বিরাট গুণগত পরিবর্তন। এটি বুঝতে হলে ফ্রান্সের আন্দোলনে ঘটে যাওয়া ছোট একটি ঘটনা কিন্তু প্রভাবে গভীর, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। 
আমরা ফিলিস্তিনের জন্য প্রায়ই মায়াকান্না কাঁদি; কিন্তু আসল কাজ করেছে প্যারিসের জেন-জি। তারা মনে রেখেছে ফিলিস্তিনিদের প্রথম মহাবিপর্যয়, ‘নাকবা’র দিন। সেই দিনের স্মরণে ফ্রান্সের জেন-জি প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে উড়িয়ে দিয়েছে ফিলিস্তিনের পতাকা। এটি ছিল ফরাসি পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠন ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন ফ্রান্স’- এর সুপরিকল্পিত এক প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচি। 
কেন আইফেল টাওয়ারে ফিলিস্তিনের পতাকা
এই কর্মসূচিটি ফিলিস্তিনিদের ‘নাকবা দিবস’ বা ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রগঠনের সময় লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোর করে নিজের দেশ ও ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি স্মরণের অংশ। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সরাসরি সংহতি জানানো হয়। গাজা সঙ্কটের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। গাজায় চলমান গণহত্যা এবং সেখানে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর নীরবতারও প্রতিবাদ এটি। এর মধ্য দিয়ে ফরাসি সরকারের ‘দ্বিমুখী নীতি’র প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা স্পষ্ট করে অভিযোগ তুলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলার পর সরকার খুব দ্রুত আইফেল টাওয়ারকে ইসরাইলের পতাকার রঙে আলোকিত করে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের সাথে সংহতি ও সমবেদনা জানায়; কিন্তু গাজায় লাখো ফিলিস্তিনির মৃত্যুর পরও ফিলিস্তিনিদের স্মরণে আইফেল টাওয়ারে কোনো প্রতীকী সম্মান দেখানো হয়নি।
এ ঘটনা বিশ্বকে কী বার্তা দিচ্ছে
আইফেল টাওয়ারের মতো বিশ্বখ্যাত বৈশ্বিক প্রতীকে ফিলিস্তিনের পতাকা টানানোর মাধ্যমে কর্মীরা বিশ্বনেতা এবং বিশ্বের সাধারণ মানুষের কাছে এ বার্তা পাঠাতে চেয়েছেন যে, গাজার মানবিক সঙ্কটে বিশ্ব আর কতদিন নিশ্চুপ থাকবে, আর কতদিন চোখ ফিরিয়ে রাখবে?
ঘটনাটি ফ্রান্সের ভেতরে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ফরাসি-ফিলিস্তিনি সদস্য রিমা হাসানসহ অনেকে এতে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে, কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীকের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং একটি চরম ‘নাগরিক অবাধ্যতা’ (সিভিল ডিসওবেডিয়েন্স) হিসেবে বর্ণনা করছেন।
আমাদের বিবেচনায়, এটি হলো বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজের মানস গঠনে মৌলিক পরিবর্তনের আভাস। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ইউরোপ ও ইসরাইল যে নারকীয় অন্যায় চাপিয়ে দিয়েছে, সেই ইতিহাস নিজেদের জনগণকে কখনো জানতে দেননি পাশ্চাত্যের নেতারা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করলেও টুঁটি চেপে ধরেছে বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রবক্তা রাষ্ট্রগুলো। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি, তবে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেটির প্রতিফলন আইফেল টাওয়ারে ফিলিস্তিনের পতাকা। শিশুসহ লাখো নারী পুরুষকে নির্বিচারে হত্যার ঘটনায় আমেরিকা, ইউরোপসহ গোটা বিশ্ববাসীর নীরব সমর্থন নতুন প্রজন্মের তরুণদের ব্যথিত ও লজ্জিত করে। তাদের মনে অজান্তে ক্ষোভ জমে। এ মুহূর্তে ঘটছে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ। আমেরিকায় যেমন, ইউরোপেও তেমনি তরুণরা এখন বিশ্বব্যবস্থার আমূল সংস্কার চায়। নতুন করে লিখতে চায় ন্যায় ও সমতাভিত্তিক নতুন বৈশ্বিক ম্যাগনাকার্টা। বিশ্বব্যাপী জেন-জি আন্দোলনে আমরা সেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্ফুরণ দেখি। 
লেখক : সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর 
নয়া দিগন্ত

Advertisement