মতামত
মাসুম খলিলী। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিস্তার শুধু একটি বিকল্প আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ নয়; এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে দেশের কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ, আমানতকারীর কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্থায়ন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা। সুদভিত্তিক লেনদেনের প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ, প্রকৃত সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন এবং ঝুঁকি ও মুনাফার ন্যায্য বণ্টনের ধারণা ইসলামী ব্যাংকিংকে অনন্য ও স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। তবে যেকোনো আর্থিক খাতের সাফল্যের মূলে শুধু মানুষের আদর্শগত আগ্রহ বা আবেগ থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা, বিনিয়োগের গুণগত মান, কঠোর স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলো ঈর্ষণীয় বিকাশের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা কর্তৃত্ববাদী ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন শাসনের জাঁতাকলে এ খাতের ওপর নজিরবিহীন সঙ্কট নেমে আসে। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা কৌশলে ছিনিয়ে নেয়া হয়। এদের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় দেশী-বিদেশী প্রভাবশালী চক্রের মদদপুষ্ট বিশেষ একটি অলিগার্ক শ্রেণীর হাতে। ঠাণ্ডামাথায় ইসলামী ব্যাংক-ব্যবস্থাকে ধ্বংস ও দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে মূলত জাতীয় অর্থনৈতিক ভিতের শেকড়কে দুর্বল করে দেয়ার হীন ষড়যন্ত্র করা হয়। যার চড়া মূল্য আজ পুরো ইসলামী ব্যাংক খাতের পাশাপাশি বহন করতে হচ্ছে দেশের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকেও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত চিত্রে এক মিশ্র ও বাস্তবমুখী দৃশ্যপট ফুটে উঠেছে। একদিকে খাতটিতে আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে; অন্যদিকে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর তুলনায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রফতানি আয় ও প্রবাসী রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান সম্ভাবনার তুলনায় বেশ সীমিত। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো তৃণমূলমুখী ও জনসম্পৃক্ত কিছু ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক শক্তিশালী ও ভালো অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পথপরিক্রমায় যেমন গভীর সঙ্কট ও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, তেমনি আছে ঘুরে দাঁড়ানোর অপার সম্ভাবনাও।

Advertisement

বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু বাজারের নেতৃত্ব নয়
বাংলাদেশে আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু ১৯৮৩ সালে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে আরো একাধিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সাথে প্রচলিত ধারার অনেক প্রথাগত ব্যাংকও পৃথক ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডো খুলে শরিয়াহসম্মত সেবা প্রদান শুরু করে। ফলে ইসলামী ব্যাংকিং আজ আর কোনো সীমিত পরিসরের খণ্ডিত কার্যক্রম নয়, বরং এটি দেশের মূলধারার আর্থিক ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। তবে ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ‘বিস্তার’ এবং ‘সক্ষমতা’ কখনো সমার্থক বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের মোট আমানত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক শ্লথ। আমানতকারী ব্যাংক নির্বাচনে মূলত অর্থের নিরাপত্তা, যেকোনো প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা তোলার সক্ষমতা, আধুনিক সেবার মান, মুনাফার আকর্ষণীয় হার, ডিজিটাল লেনদেনের সহজলভ্যতা এবং সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার বিষয়টি সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের জন্মগত ও ধর্মীয় আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যদি আমানতকারীরা তাদের মূলধনের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্যতমও উদ্বিগ্ন থাকেন, তবে সেই সুপ্ত আগ্রহ কখনো সন্তোষজনক আমানত প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে না।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা, তারল্য ও সুশাসন নিয়ে যে ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আমানতকারী মহলে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছিল। তবে সব ইসলামী ব্যাংককে একই কাঠামোগত বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যায় আক্রান্ত মনে করা যেমন ভুল, তেমনি খাতটির সামগ্রিক দুর্বলতাগুলো কেবল একটি সাময়িক পরিস্থিতি বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও কোনোভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।

আমানতের চেয়ে বড় প্রশ্ন : সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে
একটি ব্যাংকের সত্যিকারের সাফল্য শুধু আমানত সংগ্রহের স্ফীত পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সংগৃহীত সেই আমানতের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল ও বাস্তবসম্মত খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, বিনিয়োগ থেকে নিয়মিত আয় আসছে কি না, বিতরণ করা ঋণ বা অর্থায়ন যথাসময়ে ফেরত আসছে কি না এবং তার বিপরীতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখা হচ্ছে কি না— এ প্রশ্নগুলো ব্যাংকের সুস্থতায় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের বেশির ভাগ নির্দিষ্ট কয়েকটি পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল— যার একটি বড় অংশ বাই-মুরাবাহা, হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক (এইচপিএসএম) এবং বাই-মুয়াজ্জাল কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। শরিয়াহসম্মত সীমার মধ্যে এ পদ্ধতিগুলো আইনগতভাবে বৈধ হলেও, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল অর্থনৈতিক দর্শন কেবল প্রচলিত সুদি ঋণের পরিবর্তে নতুন নামকরণ বা চুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন প্রকৃত সম্পদ ও ব্যবসাভিত্তিক অর্থায়ন, বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে লেনদেনের নিখুঁত সংযোগ এবং ঝুঁকির ন্যায্য মূল্যায়ন।
মুশারাকা ও মুদারাবার মতো প্রকৃত অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য উপযোগী বিশেষায়িত পণ্য এবং কৃষি, উৎপাদনমুখী শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের উদ্যোগে অর্থায়ন আরো বাড়াতে পারলে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা আরো বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে। তবে এ ধরনের বহুমুখী অর্থায়নে নিখুঁত হিসাবরক্ষণ, ব্যবসার সঠিক তথ্য যাচাই, প্রকল্প তদারকি এবং আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

সম্পদ বাড়ছে, কর্মী কমছে : কাঠামোগত অসঙ্গতি
ব্যাংকের সামগ্রিক সম্পদ বৃদ্ধিকে সাধারণত তার সম্প্রসারণ ও শক্তির ইতিবাচক সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সম্পদের বাহ্যিক পরিমাণ বাড়লে যে তার গুণগত মান বা ভিত মজবুত— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বোকামি হবে। এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক খাতের জনবলসংক্রান্ত উপাত্তগুলো অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সাথে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিগত কিছু সময়ে খাতটিতে সার্বিক জনবলের মান ও সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাসের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
বিপরীতে শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিংয়ের তদারকি ও বিশেষায়িত দক্ষতার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও, তা পুরো খাতের বিশাল জনবল হ্রাস, সেবা সম্প্রসারণের পরিধি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণগত প্রয়োজনের তুলনায় মোটেও পর্যাপ্ত নয়। ডিজিটাল ব্যাংকিং, অটোমেশন এবং শাখাবহির্ভূত সেবার ব্যাপক বিস্তারে স্বাভাবিকভাবে প্রথাগত জনবলের প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের ধাক্কায় বা অব্যবস্থাপনায় কর্মী কমে যাওয়াকে কেবল প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ফল বলে চালিয়ে দেয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না। ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন, ব্যবসার অযাচিত সঙ্কোচন, ব্যয় কমানোর চাপ কিংবা দক্ষ পেশাজীবীদের স্বেচ্ছায় প্রস্থান— কোন বিষয়টি কতটা প্রভাব ফেলেছে, তার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন জরুরি। বিশেষ করে শরিয়াহ তদারকি, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গ্রাহকসেবা ও জালিয়াতি প্রতিরোধের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবল কমে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

বৈদেশিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় ব্যাংক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। রফতানি আয় দেশে আনা, আমদানির এলসি দায় পরিশোধ এবং প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক সচলতা বজায় রাখে। আগস্ট ২০২৬-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় রফতানি আয় ও প্রবাসী রেমিট্যান্স গ্রহণে ইসলামী ব্যাংকগুলো অতীতে শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে তাদের সেই প্রতিযোগিতামূলক অংশ কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছে।
প্রবাসী রেমিট্যান্স বা রফতানি আয় আসার বিষয়টি বহুলাংশে নির্ভর করে আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ হাউজের সাথে শক্তিশালী চুক্তি, বিদেশী ব্যাংকের করেসপনডেন্ট নেটওয়ার্ক, আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, লেনদেন খরচ, দ্রুত অর্থ পৌঁছানোর গতি এবং প্রবাসীর পরিবারের আস্থার ওপর। ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক শ্লথ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এ ক্ষেত্রগুলোতে তাদের আধুনিক সক্ষমতা নতুন করে পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি। রফতানিকারক, আমদানিকারক ও প্রবাসীদের জন্য দ্রুততম সময়ে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাজারে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এজেন্ট ব্যাংকিং : সম্ভাবনার এক নতুন জানালা
সব সূচকে ইসলামী ব্যাংকিং পিছিয়ে আছে— এমনটি নয়। দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সাফল্য এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী উদাহরণ। জাতীয় এজেন্ট ব্যাংকিং খাতের আমানতের একটি বিরাট ও শক্তিশালী অংশ ইসলামী ব্যাংকগুলোর দখলে আছে।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত জনপদে ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে দিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সুদৃঢ় ভিত্তি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কাজ করেছে। তবে এ অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার কৌশল, সেবার ডিজিটাল মানোন্নয়ন এবং এজেন্ট নেটওয়ার্কের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এজেন্ট ব্যাংকিং কেবল আমানত সংগ্রহের প্রথাগত মাধ্যম নয়; এটি প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, নারী এবং আর্থিক সেবার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষকে মূলধারার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করার মোক্ষম হাতিয়ার। যথাযথ তদারকি ও গ্রাহক সুরক্ষা বজায় রাখা গেলে ক্ষেত্রটি হতে পারে আগামী দিনের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আস্থা ফেরাতে জরুরি কাঠামোগত সংস্কার
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সঙ্কট ও স্থবিরতা থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি নেয়া প্রয়োজন, তা হলো— শরিয়াহসম্মত আর্থিক সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের অন্তরের টান এবং একটি ব্যাংকের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মুখে শরিয়াহ পালনের স্লোগান দিয়ে সাময়িকভাবে গ্রাহক আকৃষ্ট করা সম্ভব, কিন্তু সেই আস্থা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে আমানতের শতভাগ নিরাপত্তা, করপোরেট সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
এ লক্ষ্যে নিম্নলিখিত কাঠামোগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি :
১. স্বচ্ছতা ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ : দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। খেলাপি ও অনাদায়ী বিনিয়োগ, বিগত দিনে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের অনুকূলে নেয়া বেনামি ঋণ, সম্পদের প্রকৃত গুণগত মান এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা সংস্থানের ঘাটতি দূর না করলে টেকসই সংস্কার অসম্ভব।
২. কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকি : বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিব্যবস্থাকে আরো কঠোর ও গতিশীল করতে হবে। প্রশাসক নিয়োগ বা সাময়িক তারল্য সহায়তা দিয়ে সাময়িকভাবে বাজার স্থিতিশীল করা গেলেও, এর মূল সাফল্য নির্ভর করবে অতীতের নগ্ন অনিয়মের দৃষ্টান্তমূলক প্রতিকার এবং আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষার ওপর।
৩. শরিয়াহ তদারকির কার্যকারিতা : শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড বা তদারকি ব্যবস্থাকে শুধু নামসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ কার্যকর করতে হবে। ব্যাংকের প্রতিটি পণ্য ও চুক্তি প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহসম্মত কি না, মাঠে লেনদেনের বাস্তব অস্তিত্ব আছে কি না এবং চুক্তির শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালিত হচ্ছে কি না— তা নিয়মিত স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
৪. বিনিয়োগের বহুমুখীকরণ ও মানোন্নয়ন: শুধু নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি, রফতানিমুখী উৎপাদন, এসএমই এবং আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক উদীয়মান ব্যবসায় অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে হবে। প্রকল্পের সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক।
৫. ডিজিটাল রূপান্তর ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক : প্রবাসী আয় সংগ্রহ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নিজেদের হারানো অবস্থান ফিরে পেতে আধুনিক বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এর বিশাল বাজারভিত্তি রয়েছে, আছে গভীর সামাজিক শেকড় ও ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু আমানত, বিনিয়োগ, সম্পদ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রথাগত ধারার ব্যাংকগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা প্রমাণ করে যে, কেবল সম্ভাবনাকে পুঁজি করে বসে থাকলে চলবে না; বরং তাকে বাস্তব ও টেকসই সাফল্যে রূপান্তর করতে হবে। লুটে নেয়া অর্থ ব্যাংকিং সিস্টেমে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে।
ব্যাংকের প্রকৃত স্বাস্থ্য কখনো কেবল তার বাহ্যিক সাইনবোর্ড বা পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তা নির্ধারিত হয় সম্পদের নিখুঁত গুণগত মান, পর্যাপ্ত মূলধন, তারল্য এবং স্বচ্ছ সুশাসনের মাপকাঠিতে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল শক্তি হওয়া উচিত নৈতিক অর্থায়ন, স্বচ্ছ ও ন্যায্য চুক্তি এবং বাস্তব অর্থনীতির সাথে সুদৃঢ় সংযোগ। এই মৌলিক নীতিগুলো যদি দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রমে সততার সাথে প্রতিফলিত না হয়, তবে কেবল ইসলামী স্লোগান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের মন জয় করা সম্ভব নয়।
অতএব, বর্তমান সময়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ইসলামী ব্যাংকিংয়ের শুধু স্ফীত আকার বা শাখা বাড়ানো নয়; বরং একে আরো বেশি নিরাপদ, পুরোপুরি জবাবদিহিমূলক, উৎপাদনমুখী এবং প্রতিযোগিতাসক্ষম একটি আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। আস্থার এই কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা গেলে কেবল খাতের প্রবৃদ্ধির পথ চিরতরে প্রশস্ত হবে। আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র পরীক্ষিত উপায় হলো— নীতির সাথে বাস্তবতার নিখুঁত মিল, প্রতিশ্রুতির সাথে কার্যক্রমের শতভাগ সামঞ্জস্য এবং আমানতের আমানতদারিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। যাদের ব্যবস্থাপনায় এসব নিশ্চিত হতে পারে তাদের ব্যাংক পরিচালনায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com