
কিশোর, মুসা আর রবিন— রকিব হাসানের ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের তিন চরিত্র। এ চরিত্রগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় সেই কিশোরবেলায়। কখনো কখনো নিজেকে মনে হয়েছে ‘কিশোর’। তিন গোয়েন্দার মতো দুঃসাহসিক অভিযানে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে। কোথাও কোনো রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় নাক খাড়া করে রেখেছি।
কিশোরবেলা হলো, দুঃসাহসিক অভিযানের ব্যাকড্রপ। এ কারণে কিশোর উপন্যাসের এত কদর। কিশোর উপন্যাস মানে, ম্যারম্যারা উপন্যাস নয়। এতে থাকে গোয়েন্দাগিরি, থাকে রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চার। মার্ক টোয়েনের ক্লাসিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার ‘টম সয়্যারের’ ডানপিটে কিশোর টম। টোয়েনের আরেক সৃষ্টি ‘হাকলবেরি ফিন’। এতে মিসিসিপি নদীতে ভেলা ভাসিয়ে পালিয়ে যায় ঘরহারা কিশোর হাক। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা চরিত্রের ছায়াসঙ্গী তোপসে (তপেশরঞ্জন মিত্র)। কিশোরবেলায় এ চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে নিজেকে দেখেছি।
এখনো ফিরে ফিরে সেই বেলায় যেতে হয়। কেন যেতে হয়? কারণ ওই সময়টা (কিশোরবেলা) ছিল ‘সেরা’— যে সময় ফেলে এসেছি ১২-১৮ বছর বয়সে। জার্মান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন কিশোরবেলাকে বলেছেন ‘দ্বিধাবেলা’। নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় থাকে কিশোররা। আর এ কারণে কিশোর সাহিত্য ভরপুর থাকে ফ্যান্টাসিতে। রোমাঞ্চকর ঢেউ খেলে যায় কিশোরদের রক্তে। তাদের বাস্তবতাও তেমন। ১২-১৮ বছর বয়সের মধ্যে মানুষের সামনে থেকে সরে যেতে থাকে কুয়াশার পর্দা; কিন্তু সরে যেতে গিয়েও পুরোটা সরে না। সেই কুয়াশা ভেদ করার অভিযানে নামে কিশোর। সেই অভিযানে পদে পদে ওঁৎপেতে থাকে বিপদ। তারপরও ‘নায়ক’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে চায় তারা।
কিশোরবেলায় মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ বেপরোয়া থাকে। এ অ্যামিগডালা আবেগ ও উদ্দীপনা বাড়ায়। বেপরোয়া অ্যামিগডালাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার ‘দায়িত্ব’ থাকে মস্তিষ্কের আরেক অংশ ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের’। কিন্তু কিশোরবেলায় যুক্তিবাদী সেই ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অপরিপক্ব থাকে। এ জন্য ঝুঁকি নেয় কিশোররা, রোমাঞ্চের পেছনে ছোটে। বিপদের মুখে ঝাঁপ দিয়ে মেটাতে চায় মনের ক্ষুধা। ওই সময় তারা সত্যের খোঁজ করে। ভালো বন্ধু চায়। ভালো কাজে উৎসাহ চায়। ভালো কাজের মাধ্যমে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে। সক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু ঝামেলাটা বাধে, যখন ভালো কাজে তাদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। ভাটার শুরুটা হয় পরিবার থেকে, সেই শিশুবেলায়। বাবা-মা যখন শিশুর কৌতূহলে সাড়া দেন না, প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন, তখনই একাকিত্ব পেয়ে বসে তাদের। আর একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে বিকল্প খোঁজ করে। বাবা-মা ও প্রতিবেশীদের থেকে কৌতূহলে সাড়া না পেলেও কৌতূহল কিন্তু মরে যায় না। কৌতূহলের তৃষ্ণা থেকে তার মস্তিষ্ক ঢুকে যেতে থাকে অন্য কোনো দিকে।
সেই দিকটা হতে পারে বিপজ্জনক, কিশোর গ্যাংয়ের মতো ভয়ঙ্কর। এখন শহরে শহরে এ গ্যাংয়ের ফাঁদ পাতা থাকে। সহজাত অ্যাডভেঞ্চারের পিপাসায় সেসব ফাঁদে পা দিয়ে দেয় কিশোর।
এখন পাড়ায়-মহল্লায় খেলার জন্য মাঠ পাওয়া যায় না। বাড়ি থেকে বের হলে সময় কাটাতে কিশোরদের যেতে হয় চায়ের দোকানে, গলির মোড়ে। এ আড্ডায় পরিচয় হয় ভালো-মন্দ অনেকের সাথে। তাদের ফোন নাম্বার বিনিময় হয়। এরপর ঢুকে যায় ডিজিটাল জগতে। ওখানে গ্রুপ খোলা হয়। গ্রুপগুলোতে নতুন সদস্য চাওয়া হয়। নতুন কিশোর দলে টানতে উসকে দেয়া হয় অ্যাডভেঞ্চারের উপাদান। উগ্র গতিতে বাইক চালায় তারা। আলো-আঁধারিতে আড্ডা দেয়। এগুলো নায়কোচিত মনে হয় কিশোরদের কাছে। স্মার্টফোনে ছবি তুলে আপলোড করে। যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা বাড়িতে স্মার্টফোন কিনে দিতে চাপ দেয়। বায়না ধরে অথবা ব্ল্যাকমেইল করে। শেষে স্মার্টফোন কিনে দিতে বাধ্য হন অভিভাবক। এ ফোন ব্যবহার করে চলে যোগাযোগ। নিজেদের আলাদা প্রমাণ করতে দলের নাম দেয়— এক্স বয়েজ, গিল্টুু বাহিনী। এক দলের সাথে অন্য দলের এলাকা দখলের লড়াই চলে। দেখা যায় ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্রুপ থেকে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে ‘ব্ল্যাক ক্রস’ গ্রুপকে। সতর্কবার্তায় জানিয়ে দেয়া হয়— এ এলাকা তাদের। এখানে যেন ‘ব্ল্যাক ক্রস’ গ্রুপের কেউ হিরোইজম দেখাতে না আসে।
হিরোইজম দেখাতে টিকটক, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে বেপরোয়া বাইক রাইডিং আপ করে তারা। ডিসকো গানের সাথে নেচে রিলস বানায়। ভার্চুয়াল জগতে লাইক-কমেন্ট আর ‘ফেম’ পাওয়ার প্রতিযোগিতা করে। এ প্রতিযোগিতা কিশোরদের বাস্তব জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। টেনে নেয়, আধিপত্যের লড়াইয়ে।
পরের ধাপে আসে ‘বড় ভাই’রা। এরাই ‘গডফাদার’— নেতা অথবা অপরাধ জগতের পাতি নেতা। এরা পাড়ার মোড়ে মোড়ে পথভ্রষ্ট কিশোর খুঁজে বেড়ায়। যে কিশোর সবচেয়ে বেশি অবাধ্য, যার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি দুর্বল, কিংবা যে কিশোর পারিবারিক সুরক্ষায় নেই তাকে বেছে নেয়া হয়। ছোটখাটো চায়ের খরচ, বাইকে চড়ানো বা কিছু পকেটমানি গুঁজে দিয়ে তাদের মন জয় করা হয়। এরপর শুরু হয় পরীক্ষা— মিছিলে যাওয়া, স্লোগান দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। অবৈধ কোনো পণ্যের বাহক হিসেবেও ব্যবহার করা হয় কিশোরদের। তাদের দেয়া হয় আশ্রয়ের আশ্বাস। তারা ভাবে— বড় ভাই সবসময় তাদের পেছনে থাকবে!
আইনের চোখে কিশোরদের জন্য ছাড় আছে। আর এ ছাড়ের মওকা নিচ্ছে বড় ভাইয়েরা। এরা কিশোরদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের দিয়ে মাদকের কারবার করায়। তার আগে মাদকে আসক্ত করানো হয়। এরপর মাদক সেবনের টাকা জোগাতে বড় ভাইদের পেছন পেছন ঘুরতে হয় তাদের। বড় ভাইয়েরা তখন হাতে চাপাতি তুলে দেয়, ধরিয়ে দেয় আগ্নেয়াস্ত্র।
মার্কিন অপরাধবিজ্ঞানী গ্রেশাম সাইকস ও ডেভিড মাতজার ‘ট্যাকনিকস অব নিউট্রালাইজেশন’ তত্ত্ব বলছে, অপরাধ করার পর নিজেদের মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেয় কিশোররা। তারা ভাবে— এ অপরাধ আমি তো একা করিনি, বড় ভাই করিয়েছে। অথবা সে আমাকে অপমান করেছিল বলেই মার খাওয়া তার পাওনা ছিল।
কিশোরমন মনে করে, সেও বুঝি কোনো থ্রিলার গল্পের শক্তিশালী চরিত্র হয়ে উঠেছে। ওই চরিত্রে সে নায়ক। বাইকে বিকট শব্দ তুলে সড়ক দাপিয়ে বেড়ায়। কিশোরের বেপরোয়া বাইক দেখে সড়ক থেকে সরে দাঁড়ায় মানুষ। তার সাহস বাড়তে থাকে। সে যখন দেখে— সবাই তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে তখন সে বিকৃত উল্লাস করে। এ উল্লাস তাদের নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত করে। কিশোর সাহিত্যের সেই খলনায়কদের মতো। অথচ তারা তো নায়ক হতে চেয়েছিল।
গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়া কিশোরদের পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাদের অনেকের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস নেই। মনন বিকাশের যে বয়সে বইয়ের অ্যাডভেঞ্চারে ডুবে থাকার কথা, সেই সুযোগ বা আগ্রহ তাদের তৈরি হয়নি। অ্যাডভেঞ্চার আর রোমাঞ্চের শূন্যতা মেটাতে তারা বাস্তব জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ রোমাঞ্চ খুঁজতে থাকে। পরিণত হয় ভয়ঙ্কর অপরাধীতে।
একসময় শৈশবে পড়ানো হতো ‘অল আনহলি ডিজায়ার অ্যান্ড অ্যাকশন আর সিন’— সব অপবিত্র ইচ্ছা এবং কাজ পাপ। এখন পাঠ্যবই থেকেও কমে এসেছে নৈতিক শিক্ষা। এ শিক্ষার জায়গায় বসানো হয়েছে শুকনো কিছু তথ্য আর সফলতার প্রতিযোগিতা। এতে ধসে গেছে নৈতিকতার দেয়াল।
দেয়ালে ধস নামায়, এখন বয়ে যাচ্ছে নীতিহীনতার সুনামি। এ সুনামিতে ভেসে যেতে বসেছে প্রজন্ম। একটার পর একটা অপরাধের খবর আসছে। দেখা যাচ্ছে, এসব অপরাধে জড়িয়ে আছে কিশোরদের গ্যাং। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. নাহিদা বেগমের সন্তান অপ্রতিমের মৃত্যুর পেছনেও জড়িয়ে এ গ্যাং। তার একটা শখের মোবাইল ফোন ছিল। আর তাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের ছিল একটা দামি ফোনের শখ। হতে পারে কেবল শখ মেটাতে খুন করতে দ্বিধা হলো না কিশোরের! ওই যে, ওই সময় কোনো যুক্তি কাজ করে না। মস্তিষ্কের যুক্তিবাদী অংশ ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ থাকে অপরিপক্ব। এ অংশ পরিপক্ব করে গড়ে তুলতে দরকার হয় নৈতিক শিক্ষার। এই শিক্ষার প্রক্রিয়াটার বড় ক্ষতি করে দিয়ে গেছে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিম। ওই সময় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কিশোর গ্যাং। এই গ্যাং আওয়ামী লীগের হয়ে পাড়ার মোড়ে মোড়ে মহড়া দিয়েছে। নির্বাচনের সময় কেন্দ্রে না যেতে ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। তখন যে বীজের চাষাবাদ করা হয়েছিল, এখন সেই বীজ থেকে গাছ গজিয়েছে। বিষফল দিতে শুরু করেছে।
এ ‘গাছ’ কেটে দিতে হবে। এর জন্য চাই সামাজিক ‘শুদ্ধি’। ফিরে যেতে হবে শিকড়ে। একক পরিবারের নিঃসঙ্গতা থেকে শিশুদের বের করে আনতে হবে। সেটি যেভাবে সম্ভব, সেভাবে করতে হবে। সন্তানের জন্য সময় রাখতে হবে বাবা-মাকে। সেই সময় যদি হাতে না থাকে, তাহলে ফিরে যেতে হবে যৌথ পরিবারে। দাদা-দাদী আর চাচা-চাচীদের আদরে বেড়ে উঠবে শিশু-কিশোররা। পরিবারের গুরুজনদের কাছে শুনবে গল্প, পাবে নৈতিক শিক্ষা।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
smmoshahid@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








