
বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা বিদ্যমান; কিন্তু অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কোনো লক্ষণ নেই। রাজনীতির স্থিতিশীলতায় দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, থাইল্যান্ডে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও দেশটি অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গিয়েছে। প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। বাস্তবে তা হয়নি; বরং ব্যাংক খাতে গভীর সঙ্কট, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, দুর্বল বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আহরণ এবং রফতানির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ আরো বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে ২০২৬-২৭-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে। গত এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। ছয় মাসের ব্যবধানে সেই পূর্বাভাস ১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থবছর ২০২৭-২৮-এ তা কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। তবে এ পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে জ্বালানি সঙ্কট কমানো, বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে ও বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে এখনই সংস্কার এগিয়ে নেয়ার সময়। সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসম বলেছেন, ব্যাংক খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী-সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জরুরি সংস্থাগুলো দ্রুত এগিয়ে নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখন ব্যাংক খাতে। জুন ২০২৬-এ খেলাপি ঋণের অনুপাত মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২০ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় ব্যাপক বৃদ্ধি। ইসলামী ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যি ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত; এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে গেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম মান ১০ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুন পর্যন্ত প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এ ধরনের সহায়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রক ছাড় ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক পুনর্গঠন বিলম্বিত করতে পারে। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের পরিবর্তে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হওয়ায় অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সঙ্কটে শিল্প উৎপাদন
অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে জ্বালানি সঙ্কট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমেছে; কোথাও কোথাও শিল্পকারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। জ্বালানি সঙ্কটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ব্যয়ে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রাজস্ব খাত
অর্থনীতির আরেকটি দুর্বল জায়গা হলো রাজস্ব খাত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কর-রাজস্ব জিডিপির ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্নহার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জন করেছে।
এ দিকে সরকারি ব্যয় বাড়ছে। নতুন বেতনকাঠামো, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ, ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে সরকারি ঋণ ২০২৮ অর্থবছরে জিডিপির ৪৫ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
উদ্বেগের বিষয় হলো— সরকারের অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ থেকে এসেছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ঋণ ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি পরস্পরের সাথে আরো বেশি যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে চলতি অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি কমছে এবং ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক তিন ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। ফলে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সময়ে আয় ও ভোগের বৈষম্য বেড়েছে।
ডাইনামিক সোস্যাল রেজিস্ট্রির ওপর গুরুত্ব
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক সময়ে সহায়তা দিতে ডাইনামিক সোস্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এটি এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা এবং তাদের ক্রমাগত তালিকাভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, ডাইনামিক সোস্যাল রেজিস্ট্রি, ফ্যামিলি কার্ড, এবং অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচি যেমন— কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি পরস্পরের সাথে যুক্ত করা গেলে সঙ্কটের সময়ে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেয়ার সরকারি সক্ষমতা বাড়বে।
এ আই প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আইয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেকে পিছিয়ে। তারপরও প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে এআই ব্যবহার করছে এবং সরকারগুলোও সম্মুখসারির কর্মীদের কর্মক্ষমতা বাড়াতে ক্রমবর্ধমানভাবে এআই ব্যবহার করছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল এআইভিত্তিক বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং কর্মী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এআই ব্যবহারে সক্ষম করে এমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যেতে না পারায় সরকারের অদক্ষতা-ব্যর্থতা ফুটে ওঠে। সরকার অভিজ্ঞ ও দক্ষ হলে দেশ অর্থনীতিতে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রাণশক্তি অর্থনীতি এ কথা মনে রাখতে হবে। তাই অর্থনীতির ওপর জোর দিতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








