মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো— তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে ওই তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ এটি ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ এর মতো যৌথ প্রতিরক্ষা তৈরি করেছে। 
চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া গত ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত এ ফোরামের প্রথম সভায় প্রতিরক্ষা শিল্প, যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদন নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিন দেশ বলছে, এর লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় বলে জানিয়েছে। অনেকেই একে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বললেও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষও বলেছে, কোনো সামরিক বা ধর্মীয়/সাম্প্রদায়িক জোট এটি নয়।
চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সংশ্লিষ্ট তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানরা এর প্রথম স্ট্রাটেজিক, পলিটিক্যাল এবং ডিফেন্স  কমিটি গঠন করে। তারা  সৌদি আরবে এর একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসহ প্রথম তিন বছরের জন্য পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধিকে ‘সেক্রেটারি জেনারেল’ নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জে. নোমান মাহমুদকে এ পদে মনোনয়ন  দেয়া হয়েছে।
চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো— মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা ধীরে ধীরে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কাঠামো থেকে বহুমুখী কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। 
সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উত্তেজনা কমানোর দিকেও এগিয়েছিল। ফলে রিয়াদ সম্ভবত ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক জোটের পরিবর্তে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সামনে একটি বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
ইরান একক আঞ্চলিক শক্তি নয়; বরং সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামোর মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে ইরানকে আরো বেশি কূটনৈতিকভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করতে হতে পারে। 
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় নিরাপত্তার প্রধান বাহ্যিক গ্যারান্টর ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব এখন একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রাখছে; চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে; পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করছে; তুরস্কের সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
এর মানে সৌদি নীতি ক্রমশ বৈচিত্র্যের দিকে যাচ্ছে। সৌদি আরবের অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক অবকাঠামোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এ চুক্তি ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনটি দেশের সমন্বিত শক্তি নিম্নোক্ত ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও উপসাগরীয় কৌশলগত অবস্থান। তুরস্ক বড় সামরিক শক্তি এবং  পাকিস্তানের আছে পরমাণু অস্ত্র।
এর ফলে ইসরাইলকে ভবিষ্যতে শুধু আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের হিসেব শুধু নয়; বরং পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি ত্রিভুজকেও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এটিকে সরাসরি ইসরাইলবিরোধী সামরিক জোট বলা যাবে না। কারণ চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে যৌথ প্রতিরোধ। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে শত্রু ঘোষণা করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নীতিগত সমন্বয় যদি আরো বাড়ে, তাহলে ইসরাইলের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরব ও তুরস্কের নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা। ভারত দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক উন্নত করেছে। আবার তুরস্কের সাথে ভারতের সম্পর্ক পাকিস্তান ইস্যুতে অনেক সময় জটিল হয়েছে। এখন যদি তিন দেশ নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বিত অবস্থান নেয়, তাহলে ভারতের কৌশলগত হিসেবে কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের সাথে চুক্তি সংশ্লিষ্ট তিন দেশের সাথেই গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের বিশেষত বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা শিল্প, অবকাঠামো ও কুটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে সৌদি আরবের সাথে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও ধর্মীয় সম্পর্ক আছে। সর্বোপরি পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতি। তাই বাংলাদেশ যদি সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে সম্ভাব্য গুরুত্ব দেয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চাইলে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার প্রশ্নে সহযোগিতা বাড়াতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশকে কোনো সামরিক ব্লকের অংশ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। 
চীনের জন্য চুক্তিটি সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়; বরং কিছু দিক থেকে সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, সংশ্লিষ্ট তিন দেশের সাথেই চীনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। যদি চীন এ নতুন ব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব আরো বাড়বে। 
চুক্তির রাজনৈতিক সঙ্কেত শক্তিশালী। এর অর্থ হলো— সৌদি আরব, আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না; সে একই সাথে তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে একটি নিজস্ব আঞ্চলিক  প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— এটি যদি ধীরে বিস্তৃত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, রাজনীতি, প্রথমবারের মতো অনেক বেশি সরাসরি পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে মিসর, কাতার, জর্দান, আজারবাইজান বা অন্য কোনো মুসলিম দেশ এতে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন তিন দেশের চুক্তির চেয়ে অনেক বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে।
 চুক্তির পক্ষগুলো এটিকে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং কোনো নির্র্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে সম্পাদিত হয়েছে— এমন কথা বলেনি। তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এ চুক্তিতে যোগ দিয়েছে। সে ন্যাটোকে ত্যাগ করেনি; বরং একই সাথে ঘঅঞঙ+ ৎবমরড়হধষ ংবপঁৎরঃু ঢ়ধৎঃহবৎংযরঢ়ং; এ দুই স্তরে কাজ করছে। তাই তুরস্কের জন্য এটি মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির একটি উপায়। 
বাংলাদেশ যদি এতে যোগদানের কথা বিবেচনা করে, তাহলে শুধু মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য হিসেবে বিষয়টিকে দেখা যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশকে বরং পাশাপাশি দেখতে হবে— ভারতের সাথে সম্পর্কের ওপর কি প্রভাব পড়বে? 
যদি ভবিষ্যতে তিন দেশ, যৌথ কম্যান্ড, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টিগ্রেশন, স্পেসিফিক মিউচুয়াল সহযোগিতা মেকানিজম তৈরি করে, তাহলে এটি সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী জোট হয়ে উঠবে। বিপরীত পক্ষে— এটি যদি রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর সামরিক প্রভাব অনেক কম হবে।
ভারতের দৃষ্টিতে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের একই কাঠামোয় যোগদান, দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করবে। অনেকে এটিকে ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টিকারী বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। 
চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের নিয়ম, যতক্ষণ পুরোপুরি পরিষ্কার হচ্ছে না, ততদিন বাংলাদেশকে না জেনে চুক্তিতে যোগদান করা যুক্তিসঙ্গত হবে না।
চীন, বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। একই সাথে পাকিস্তানও চীনের ঘনিষ্ঠ নেতিবাচক হিসেবে দেখবে না। বাংলাদেশ এর পূর্ণ সদস্য হওয়ার বিষয়ে ধীরস্থির ভাবে, আবেগ বর্জিতাবস্থায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
লেখক : নিরাপত্তা গবেষক

Advertisement