
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর মুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। ইতোমধ্যে নতুন সরকার সাড়ে সাত মাসের বেশি সময় অতিক্রম করেছে। এ সময়ে নাগরিক আশা-আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হলো, সেই হিসাব আপাতত পাশে সরিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা জনপরিসরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। ঘটনাগুলোতে সরকারের নেয়া কিছু পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে নাগরিক মনে প্রশ্ন জাগছে, সরকারের কি স্বল্প সময়ে ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে? ক্রমে সমালোচনার প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে? ঘটে যাওয়া ওই সব ঘটনায় সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপে অল্পেতে চটে যাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষণীয়; আপাতত সে ভাবনা জনমনে দানা বাঁধছে বলে মনে হয়।
সময়ানুক্রমিকভাবে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা ও এসবের প্রেক্ষাপট আজকের লেখায় বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা করব আমরা।
১.
বেশ কিছু দিন আগে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে গালিগালাজ করায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’ হাসিনা আমলের আগের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গাজীপুরে সিফাত আবদুল্লাহ নামে এক তরুণ তার বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও আপলোড করে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কটু ও অশোভন ভাষা প্রয়োগ করেন। এর জেরে তাকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলের বহুল বিতর্কিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে’ ফ্যাসিবাদী জমানায় দায়েরকৃত একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। প্রশ্ন হলো— সাধারণ নাগরিকের একটি মৌখিক অপপ্রচারের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ কতটুকু যৌক্তিক ছিল। পুলিশের এমন অতি উৎসাহী কাণ্ড দেশজুড়ে বিস্ময়ের জন্ম দেয়। সামান্য আইন জানাশোনা আছে, এমন যে কারো মনে হবে— অনভিপ্রেত গালিগালাজের জন্য সর্বোচ্চ মানহানির মামলা হতে পারত। তা ছাড়া পুরনো সংস্কৃতির আদলে তাকে পুলিশি হেফাজতে নেয়াকেও বিরোধী দল ও সুশীল সমাজ সরকারের আচরণকে ‘বাড়াবাড়ি’ হিসেবে মনে করছে; তা সহজে অনুমেয়।
২.
মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গভীর রাতে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি’ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রেখে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ঘটনার সাথে পরোক্ষভাবে জড়ানোর অভিযোগে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমদ মিষ্টি তার এমপি পদ হারিয়েছেন। একই সাথে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারের অভ্যন্তরীণ দলীয় শৃঙ্খলার ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
৩.
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও গুঁড়িয়ে দেয়া নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি আবাসনে সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে পিকআপ ভ্যানে করে আসা দেড় শতাধিক সশস্ত্র লোক হামলা চালায়। ভাঙচুর ও লুটপাটের মাধ্যমে বিপুল ক্ষতির পর এক প্রতিক্রিয়ায় সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতার কড়া সমালোচনা করেন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তার অসন্তোষ প্রকাশের পরপর বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তার ব্যাংক হিসাব তলব ও তথ্য চাওয়ার নির্দেশ দেয়। ভুক্তভোগী নাগরিকের বিরুদ্ধে আর্থিক নজরদারির এই পদক্ষেপকে অনেকে বাকস্বাধীনতা ও প্রতিবাদের ওপর সরকারের অসন্তোষের ফল হিসেবে দেখছেন।
৪.
বিমানবন্দরে নিত্যদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করে সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মেজর আখতারুজ্জামান গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায়ও সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পয়লা অক্টোবর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ ও ট্রলি সঙ্কটের জেরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সেখানে হয়রানির প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানের সাথে বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাগি¦তণ্ডা হয়। এ ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা ও লাঞ্ছনার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে এক দিনের পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। উল্লিখিত ঘটনাটিও সাধারণ মানুষের মনে বহু জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। এর কারণ, মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান যে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৈনন্দিন ঘটনা। এ অব্যবস্থাপনা দীর্ঘ দিন ধরে সেখানে জেঁকে বসেছে।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে বিমানবন্দরে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিকে এ ক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিদেশে গমনকারী সাধারণ যাত্রীরা।
এটি সত্যি যে, সরকার এ ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে। তবু একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিকের প্রতিবাদের পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এমন কঠোর পদক্ষেপ সরকারের পরমতসহিষ্ণুতার প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি সরকার আরো সহনশীলতার সাথে মোকাবেলা করতে পারত বলে অনেকে মনে করেন।
৫.
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে কটূক্তির অভিযোগে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় মো: মামুন নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। গত রোববার সকালে মৌলভীবাজার সদর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ৩ অক্টোবর শনিবার রাত ১১টায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে ভিডিও তৈরি করে নিজের টিকটক আইডিতে পোস্ট করেন মামুন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। মামুনের বিরুদ্ধে থানায় আগের আরেকটি মারামারির ঘটনার লিখিত অভিযোগ আছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই যুবক প্রধানমন্ত্রীকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও আপলোড দিয়েছে। এ রকম কর্মকাণ্ডে আমরা কোনো ছাড় দেবো না। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’ (নয়া দিগন্ত, মুদ্রণ সংস্করণ, ৫ অক্টোবর)
উল্লিখিত পাঁচটি ঘটনার ধরন একই রকম বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। ফলে বাংলা প্রবাদ— ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে যেমন ভয় পায়, ঠিক তেমনি এ দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী জমানায় যেভাবে নাগরিক অধিকারহারা হয়েছিলেন; তারা সেই আশঙ্কায় ভয় পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় সম্মিলিত নাগরিক মনে যে গভীর প্রভাব ফেলবে, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই নাগরিক সংবেদনশীলতার প্রতি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সদা সচেষ্ট থাকা উচিত। এর ব্যত্যয় হলে গণমানুষ সহজভাবে তা নেবে না। সরকারের জন্য এমন পরিস্থিতি জন-আস্থার সঙ্কট তৈরি করবে বলে আমাদের ধারণা।
এই প্রেক্ষিতটি বিবেচনায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা আবশ্যক, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা স্বাভাবিক বিষয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবাদের আইনি ও শিষ্টাচারের সীমা রক্ষা করা নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু সরকারের ব্যবস্থার নামে প্রতিবাদের জবাব যদি হয় সন্ত্রাসবিরোধী মামলা, বিএফআইইউ তলব কিংবা পুলিশি হেফাজত; তবে সেটি আইনের শাসনের বদলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার মনোভাবকে ফুটিয়ে তোলে। সমালোচনা সহ্য করা এবং ভুল সংশোধন করা হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই বিমানবন্দর বা সরকারি অফিসে তাদের জবাবদিহি চাওয়ার অধিকারকে ‘ষড়যন্ত্র’ বা ‘সরকারি কাজে বাধা’ হিসেবে দেখার কি কোনো সুযোগ আছে? সংবিধানে আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হলেও, বাস্তবে যদি ভিন্নমত দমনে ক্ষমতার ব্যবহার ঘটে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর সেটি হবে সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত।
উপরে উল্লিখিত পাঁচ ঘটনায় সরকারের প্রতিক্রিয়া কি শুধু আইনি পদক্ষেপ? নাকি ধৈর্যচ্যুতির আলামত, সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। সামনের দিনগুলোতে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সরকার কিভাবে সুরাহা করে বা সামাল দেয় তার ওপর নির্ভর করবে। তবে সরকারের সব দফতরে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এই সঙ্কটের টেকসই সমাধান।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








