মতামত
মতামত নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধানতম রক্ষাকবচ হলো তার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তি। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যেকোনো সভ্যতার উত্থান, পতন, ভৌগোলিক সীমানার সম্প্রসারণ কিংবা তা রক্ষা করার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সামরিক সক্ষমতা। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থায় শাসকরা কেবল একটি পেশাদার ও বেতনভুক্ত স্থায়ী সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর ছিল না। যেকোনো আপৎকালীন পরিস্থিতি বা বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখে দেশের জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিংবা আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে যুদ্ধে অংশ নিতে হতো। রণক্ষেত্রে সৈন্য সংখ্যার সঙ্কট মানেই পরাজয়।
বর্তমানে জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুদ্ধের ধরন বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল তত্ত্বটি একই রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, সীমান্ত সঙ্ঘাত এবং পরাশক্তিগুলোর শক্তির ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে কেবল একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করে বসে থাকা যেকোনো দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক সামরিক বিজ্ঞান ও সমরনীতি অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিককে প্রতিরক্ষার একটি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং একটি সুশৃঙ্খল ও দেশপ্রেমিক জাতি গঠনে তরুণদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।
বিশ্বের প্রায় ৮৫টি দেশে নির্দিষ্ট বয়সের নাগরিকদের জন্য কোনো না কোনো মেয়াদে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, কৌশলগত ঝুঁকি এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এই আইন প্রণয়ন করেছে। নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে দেশভেদে কিছু ভিন্নতা থাকলেও, সবার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন— জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো সঙ্কটে তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য একটি বিশাল রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা।
একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে আমাদের তরুণসমাজকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে ‘ডিজিটাল ন্যাটিভ’ হিসেবে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উৎকর্ষতা আমাদের জীবনকে যেমন করেছে সহজ, ঠিক তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইস আসক্তির কারণে বর্তমান তরুণ-যুবসমাজের একটি বড় অংশ চরম অলস, শারীরিক পরিশ্রমবিমুখ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। মাঠের খেলার চেয়ে ভার্চুয়াল গেম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কাটছে তাদের সময়।
এই অলসতা ও স্থবিরতা তরুণদের কেবল শারীরিকভাবেই দুর্বল করছে না, বরং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অভাব এবং লক্ষ্যহীন জীবনযাত্রার কারণে মাদকের নীল দংশন ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণ সমাজকে এই গর্ত থেকে টেনে তুলতে সামরিক প্রশিক্ষণ একটি সময়োপযোগী সমাধান হতে পারে। সামরিক জীবনের শারীরিক কসরত এবং নিয়মানুবর্তিতা তরুণদের মন-মানসিকতা ও জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনবে। এটি তাদের অলসতা দূর করে কর্মঠ করে তুলবে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের পরিবর্তে বাস্তব জীবনে বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করার মতো দৃঢ় মানসিক শক্তি ও সাহসের জোগান দেবে।
আমাদের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগই হলো তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। সংখ্যায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী প্রায় চার কোটি ৭৪ লাখ। এই বিপুল এবং অফুরন্ত জনশক্তিকে যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ রক্ষা এবং জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা না যায়, তবে তা বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২ বছরের একটি বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই তরুণদের যদি দেশ রক্ষার মৌলিক জ্ঞান, আধুনিক অস্ত্র চালনা এবং রণকৌশল শেখানো যায়, তবে তারা দেশের এক একটি অমূল্য সম্পদে পরিণত হবে। প্রশিক্ষণ শেষে এই দক্ষ ও বাছাইকৃত তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসার বাহিনীতে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি এই প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় অবদান দৃশ্যমান হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়। বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছরই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা মানবসৃষ্ট নানা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্র যখন এই ধরনের কোনো সঙ্কটে পড়ে, তখন নিয়মিত বাহিনীর উদ্ধারকর্মীদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রমাণিত হয়। যদি দেশের প্রতিটি এলাকায় সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিক থাকে, তবে তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পালন করতে পারবে। 
আমাদের দেশের শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্যারিয়ারের চিন্তা অনেক সময় মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ তরুণদের মনে ‘ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র বড়’— এই দর্শনের বীজ বুনে দেয়। যখন দেশের ধনী-দরিদ্র, শহর-গ্রাম এবং বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের তরুণরা একই ব্যারাকে, একই পোশাকে, একই খাবার খেয়ে একসাথে  প্রশিক্ষণ নেবে, তখন তাদের মধ্যে সব ধরনের সামাজিক বৈষম্য ভেঙে যাবে। এটি জাতীয় ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠবে। 
একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে হুট করে কোটি কোটি তরুণের জন্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে যে পরিমাণ অর্থ, আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, বিশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকের প্রয়োজন, তা হয়তো একবারে জোগান দেয়া সম্ভব নয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এই উদ্যোগকে থামিয়ে রাখা যাবে না। একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে বিকল্প উপায়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
একজন সুশৃঙ্খল ও প্রশিক্ষিত তরুণ যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, তখন তার কর্মদক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং চাপের মুখে কাজ করার ক্ষমতা সাধারণ কর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে। এটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়া, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে যে নেতৃত্বগুণ ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে, তা তাদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বনির্ভর হতে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল চিন্তাধারার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করবে।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ‘জুলাই বিপ্লব’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে যে, দেশের তরুণসমাজ যখন ঐক্যবদ্ধ এবং সঙ্কল্পবদ্ধ হয়, তখন তারা যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। এই জাগ্রত তরুণসমাজকে এখন সঠিক দিশা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন। তরুণসমাজকে যদি সামরিক বিদ্যায় দীক্ষিত, সুশৃঙ্খল এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যেকোনো ধরনের সঙ্কটে ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। 
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং উন্নয়ন কর্মী