
পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, পুলিশ অনেক পরিশ্রম ও ঝুঁকি নিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে; কিন্তু তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অভিযোগটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়। সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী, সন্ত্রাসী, মাদককারবারি ও অভ্যাসগত অপরাধীদের কেউ কেউ জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধ করে। কিন্তু এ সমস্যাকে শুধু ‘পুলিশ ধরে, আদালত ছেড়ে দেয়’— এ বাক্যে ব্যাখ্যা করলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রকৃত দুর্বলতা আড়ালে থেকে যায়।
প্রথম সত্যটি হলো— গ্রেফতার বিচার নয়, হাজত শাস্তি নয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত অপরাধী নন। গ্রেফতারের উদ্দেশ্য কাউকে অনির্দিষ্টকাল কারাগারে রাখা নয়; আইনসম্মত তদন্ত, আদালতে উপস্থিতি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাই পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেছে— শুধু এ কারণে আদালত তাকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখতে বাধ্য নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আশ্রয় লাভ এবং কেবল আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইন ছাড়া কারো জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। ৩২ অনুচ্ছেদ বলেছে— আইন ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সুতরাং পুলিশের গ্রেফতারের ক্ষমতা অসাংবিধানিক নয়; কিন্তু স্বেচ্ছাচারী, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা আইনবহির্ভূত গ্রেফতার অসাংবিধানিক।
সংবিধানের ৩৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব তার কারণ জানাতে হবে। নিজের পছন্দের আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। ৩৩(২) অনুচ্ছেদে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় যাত্রাসময় বাদ দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার নির্দেশ আছে। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন ছাড়া তাকে এর বেশি সময় আটক রাখা যায় না। তবে সংবিধান নিবর্তনমূলক আটক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি। ৩৩(৩) থেকে ৩৩(৬) অনুচ্ছেদে বিশেষ আইনের অধীনে এমন আটকের স্বীকৃতি থাকলেও মেয়াদ, কারণ জানানো, বক্তব্য দেয়ার সুযোগ এবং উপদেষ্টা বোর্ডের পর্যালোচনার বিধান আছে। তাই আইনগতভাবে সঠিক বক্তব্য হলো— সাধারণ গ্রেফতারকে অনির্দিষ্ট আটকে পরিণত করা যাবে না; নিবর্তনমূলক আটকও শুধু বিশেষ আইন ও সাংবিধানিক শর্তের অধীনে সম্ভব।
সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার দিয়েছে। বিচার বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে কাউকে আটক রাখা হলে বিচারপূর্ব আটক কার্যত শাস্তিতে পরিণত হয়। ৩৫(৪) অনুচ্ছেদ অভিযুক্তকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ নিষিদ্ধ করেছে। অর্থাৎ স্বীকারোক্তি আদায়ের ওপর নয়, তদন্তকে দাঁড়াতে হবে স্বাধীন সাক্ষ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর।
ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধিত বিধানগুলো গ্রেফতারকে এখন আরো জবাবদিহিমূলক করেছে। ধারা ৪৬ গ্রেফতারের পদ্ধতি ও শক্তি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করেছে। ধারা ৪৬(ক) থেকে ৪৬(ঙ) অনুযায়ী, গ্রেফতারকারী কর্মকর্তাকে পরিচয় প্রকাশ, গ্রেফতার স্মারক প্রস্তুত, স্বজনকে অবহিত, আঘাত থাকলে চিকিৎসা এবং আইনজীবী বা নিকটাত্মীয়ের সাথে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। গ্রেফতারের কারণ, অভিযোগকারী ও হেফাজতকারী কর্মকর্তার তথ্য নিবন্ধন ও সাধারণ ডায়েরিতে রাখতে হবে। হেফাজতে থাকা ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার।
ধারা ৪৭ থেকে ৪৯ পুলিশকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কোনো স্থানে প্রবেশ, অনুসন্ধান এবং আইনসম্মতভাবে প্রবেশের পর আটকেপড়া ব্যক্তিকে মুক্ত করার ক্ষমতা দিয়েছে। ধারা ৫০ বলেছে— পলায়ন রোধে যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে না। ধারা ৫১ থেকে ৫৩ দেহ তল্লাশি, নারীর শালীনতা রক্ষা এবং বিপজ্জনক অস্ত্র জব্দের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ গ্রেফতার ক্ষমতার প্রতিটি পর্যায় আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ।
পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতারের মূল ক্ষমতা রয়েছে সংশোধিত ধারা ৫৪-তে। পুলিশের সামনে আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলে গ্রেফতার করা যায়; কিন্তু সাত বছর পর্যন্ত দণ্ডযোগ্য অপরাধে শুধু অভিযোগ, এজাহারে নাম বা সাধারণ সন্দেহ যথেষ্ট নয়। পুলিশ কর্মকর্তার বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধটি করেছেন। পাশাপাশি গ্রেফতারটি আরো অপরাধ প্রতিরোধ, যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ রক্ষা, সাক্ষীকে প্রভাবিত করা বন্ধ অথবা আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় হতে হবে। গ্রেফতারের কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করাও বাধ্যতামূলক। গ্রেফতার প্রয়োজন না হলে সেই সিদ্ধান্তের কারণও লিখতে হবে।
সাত বছরের বেশি দণ্ডযোগ্য গুরুতর অপরাধেও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও সম্পৃক্ততার যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি প্রয়োজন। ধারা ৫৪(২) নিবর্তনমূলক আটকের উদ্দেশ্যে ৫৪ ধারার ক্ষমতা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ধারা ৫৪(ক) অনুযায়ী, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতারের সময়ই কারণ জানাতে হবে। ‘ওপরের নির্দেশ আছে’ বা ‘থানায় গেলে জানতে পারবেন’— এগুলো কোনো আইনসম্মত কারণ নয়।
ধারা ৫৫ থেকে ৫৯ নির্দিষ্ট সন্দেহজনক পরিস্থিতি, অভ্যাসগত অপরাধী, পরিচয় গোপনকারী, অন্য এলাকায় পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি এবং বেসরকারি ব্যক্তির সীমিত গ্রেফতার ক্ষমতা নির্ধারণ করেছে। ধারা ৬০ ও ৬১ অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিতে হবে। সেই সাথে ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ আদেশ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার বেশি পুলিশি হেফাজতে রাখা যাবে না। ধারা ৬২ ও ৬৩ গ্রেফতারের তথ্য প্রদান এবং বৈধভাবে মুক্তির পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। ধারা ৬৪ থেকে ৬৭ ম্যাজিস্ট্রেটের গ্রেফতার ক্ষমতা এবং হেফাজত থেকে পালানো ব্যক্তিকে পুনরায় গ্রেফতারের বিধান দিয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো ধারা ৬৭(ক)। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপনের পর ম্যাজিস্ট্রেটকে পরীক্ষা করতে হবে, গ্রেফতারসংক্রান্ত আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না। লঙ্ঘন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া যায়। অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা শুধু রিমান্ড অনুমোদন করা নয়; গ্রেফতারের বৈধতা স্বাধীনভাবে যাচাই করাও তার দায়িত্ব।
জামিনের ক্ষেত্রেও ভুল ধারণা দূর করা দরকার। জামিন মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি বা নির্দোষ ঘোষণা নয়; বিচারাধীন অবস্থায় শর্তসাপেক্ষ স্বাধীনতা। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ধারায় জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন অধিকার। ৪৯৭ ধারায় অজামিনযোগ্য অপরাধেও প্রমাণ, অপরাধের ভয়াবহতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় জামিন দেয়া যায়। অভিযোগের যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি না থাকলে কিংবা বিষয়টি অধিকতর অনুসন্ধানের পর্যায়ে থাকলে কাউকে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা ন্যায়বিচার নয়।
আবার জামিনে মুক্ত ব্যক্তি সাক্ষীকে ভয় দেখালে, প্রমাণ নষ্ট করলে, পালানোর চেষ্টা করলে বা পুনরায় অপরাধে জড়ালে রাষ্ট্র অসহায় নয়। ৪৯৭(৫) ধারায় জামিন বাতিল করে তাকে ফের হেফাজতে নেয়া যায়। ৪৯৮(২) ধারায় আদালত পলায়ন প্রতিরোধ ও সদাচরণ নিশ্চিত করতে ন্যায্য শর্ত আরোপ করতে পারেন। তাই পুলিশের উচিত সাধারণ ভাষায় জামিনের বিরোধিতা না করে অভিযুক্তের পলায়ন, সাক্ষী প্রভাবিত করা, প্রমাণ নষ্ট করা বা পুনরায় অপরাধের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি আদালতে উপস্থাপন করা।
মূল সঙ্কট আদালত ও পুলিশের মধ্যকার বিরোধ নয়; দুর্বল তদন্ত, অকার্যকর প্রসিকিউশন, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও জনশৃঙ্খলাজনিত দায়িত্বের চাপ। পুলিশকে রাজনৈতিক বিরোধ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাপক গ্রেফতারে ব্যস্ত রাখা হলে তার পেশাদার তদন্তক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তদন্তের শুরু থেকে যুক্ত না থাকলে অভিযোগপত্রের দুর্বলতা বিচারপর্যায়ে প্রকাশ পায়।
সমাধান হলো গ্রেফতারের সংখ্যা দিয়ে পুলিশের সাফল্য পরিমাপ বন্ধ করা; তদন্তকারী পুলিশকে জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দৈনন্দিন চাপ থেকে পর্যায়ক্রমে পৃথক করা; পুলিশ-প্রসিকিউশন সমন্বয় নিশ্চিত করা; বৈজ্ঞানিক তদন্ত ও সাক্ষী সুরক্ষা জোরদার করা এবং গুরুতর মামলায় তথ্যভিত্তিক জামিন-ঝুঁকি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা।
পুলিশের সাহস ও আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা নির্বিচার গ্রেফতারে নয়— এমন তদন্তে, যা আদালতে টিকে থাকে। আদালতের স্বাধীনতার মর্যাদাও শুধু জামিন দেয়ায় নয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জননিরাপত্তার মধ্যে প্রমাণভিত্তিক ভারসাম্য রক্ষায়।
রাষ্ট্রের শক্তি কাউকে কত দিন আটক রাখতে পারে— তাতে নয়; অপরাধকে কত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণসম্মতভাবে বিচারের আওতায় আনতে পারে, তাতে আইনের শাসনের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য
rtlbddhaka@yahoo.com







