
পাকিস্তান কাঠামো থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। অথচ এই অর্ধশতকেও আমরা নিজেদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকপরম্পরা স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারিনি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পরও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কার্যকারণ নির্ণয়ের তাত্ত্বিক বিষয়টি এখনো অনেকের কাছে অস্পষ্ট। ফলে এ নিয়ে মাঝে মধ্যে নিরর্থক বাহাস চলে, যার কোনো কূলকিনারা মেলে না। এ ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে একশ্রেণীর অভিজাত মহল যেন ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিকপরম্পরা নাকি ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু! এই সময়সীমার ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত তারা সবার ওপর চাপিয়ে দিতে সদাসচেষ্ট।
অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। ইতিহাসকে যারা সরলরৈখিকভাবে দেখেন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিকপরম্পরা থেকে পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে খারিজ করে দিতে চান, তারা মূলত ঐতিহাসিক সত্যের বিপরীতে অবস্থান নিতে চান। বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার খাতিরে সবারই ঐতিহাসিক সঙ্গতির জায়গায় দাঁড়ানো দরকার।
সাতচল্লিশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এবং একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়— এ দু’টি ঘটনা যারা বিচ্ছিন্ন করে দেখেন, তাদের ধারণার বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী ঐতিহাসিক যুক্তি বিদ্যমান। এ দুই ধারা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; একটিকে অন্যটির কারণ ও পরিণতি হিসেবে বিবেচনা করলে কেবল ইতিহাসের গতিধারা স্পষ্ট হবে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে জিন্নাহর অবস্থান, পাকিস্তান আন্দোলনের যৌক্তিকতা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাই আমরাও ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে খতিয়ে দেখতে চাই, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কোনো প্রশাসনিক বা ভূরাজনৈতিক অবকাঠামো তৈরি হওয়া আদৌ সম্ভব ছিল কি না।
ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা ও সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার বীজ রোপিত হয়েছিল মূলত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে গঠিত নতুন প্রদেশটির মূল লক্ষ্য ছিল পিছিয়ে পড়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামাজিক উন্নয়ন। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দু ভূস্বামী, জমিদার, জোতদার, আইনজীবী ও কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ এ সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করে। উগ্রবাদী আদর্শে পরিচালিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলন’ নামে যে প্রতিবাদ গড়ে তোলা হয়, তাতে উচ্চবর্ণের হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণিস্বার্থ প্রকট ছিল।
সংখ্যাগরিষ্ঠের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে আত্মরক্ষা এবং অধিকার আদায়ের তাগিদে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে (তৎকালীন ইশরাত মঞ্জিল, যা বর্তমানে মধুর ক্যান্টিন নামে পরিচিত) নবাব সলিমুল্লাহর আহ্বানে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয়। নবগঠিত মুসলিম লীগ ঘিরে ভারতীয় মুসলমানদের মূল রাজনৈতিক ধারা আবর্তিত হতে থাকে, যা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে সার্থকতা পায়।
উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতা ও আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজ বঙ্গভঙ্গ রদ করে। এটি ছিল বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য একটি চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়। এ সিদ্ধান্ত তাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয়, অখণ্ড ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের অধীনে সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত হওয়া অসম্ভব। বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্ব স্বতন্ত্র রাজনীতির ধারা আরো জোরদার করে, যা নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এবং পরবর্তীতে পৃথক পাকিস্তান দাবির ভিত মজবুত করে।
কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ও সর্বভারতীয় ঐক্যের কথা বললেও কার্যত তাদের রাজনীতিতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আধিপত্যের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছিল। গান্ধীর অহিংস নীতির আড়ালে পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো শীর্ষ নেতারা এমন এক কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় জোর দিয়েছিলেন, যেখানে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ও স্বায়ত্তশাসন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের করুণায় নির্ভরশীল থাকার ঝুঁকিতে পড়ত। বর্তমান ভারতের দিকে তাকালেও তৎকালীন মুসলিম সম্প্রদায়ের সেই ভীতির সত্যতা পাওয়া যায়; ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর হাত ধরে মুসলিম নিগ্রহ এক চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে কংগ্রেসের একগুঁয়েমি ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী মনোভাবে মুসলমানদের স্বায়ত্তশাসন ও সাংবিধানিক নিশ্চয়তার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৩৮ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তি বা ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে ছিল কংগ্রেসের অনমনীয় অবস্থান। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে নিহিত আছে জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও পাকিস্তান আন্দোলনের যৌক্তিকতা। জিন্নাহ তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথমার্ধে ছিলেন ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’। লক্ষণীয় বিষয়, তাকে এ উপাধি কোনো মুসলিম নেতা দেননি; ১৯১৬ সালে সরোজিনী নাইডু জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ সম্পাদনে জিন্নাহর ভূমিকা ছিল অসামান্য। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে সরোজিনী নাইডু জিন্নাহর প্রশংসা করে নিবন্ধ লিখেন এবং ১৯১৮ সালে তার বক্তৃতা ও লেখার সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল— ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ : অ্যান অ্যাম্বাসেডর অব ইউনিটি’।
অথচ সেই জিন্নাহর স্থানও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের রাজনীতিতে হয়নি। কংগ্রেসের অনমনীয়তা এবং মুসলমানদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ভয় দেখে তিনি উপলব্ধি করেন, ব্রিটিশদের বিদায়ের পর উপমহাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন মূলত একদলীয় আধিপত্যে রূপ নেবে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তোলা হয়। পাকিস্তান আন্দোলন কোনো অন্ধ ধর্মীয় আবেগ ছিল না। এটি ছিল অবিভক্ত ভারতে আর্থ-রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও সুরক্ষার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। জিন্নাহর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করতে পেরেছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো— পাকিস্তান কাঠামো সৃষ্টি না হলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় কি আদৌ সম্ভব ছিল? ইতিহাস এক বৈপরীত্যময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। তবে এর অন্তর্নিহিত সত্য হলো— পূর্ব বাংলা যদি তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হতো, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম কোনো বাস্তব ভিত্তি পেত না। যদি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি না হয়ে পুরো ভারত অখণ্ড থাকত, তবে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে পূর্ব বাংলা ভারতের একটি প্রান্তিক প্রদেশ হিসেবে রয়ে যেত। কিংবা আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব বাংলা অখণ্ড ভারতের বিশাল সীমানায় বিলীন হয়ে যেত এবং বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক মর্যাদা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীতে পর্যবসিত হতো। অখণ্ড ভারতের সুদৃঢ় কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে ভূরাজনৈতিকভাবে আদৌ সম্ভব হতো না। যেটি কাশ্মির, নাগাল্যান্ড বা পাঞ্জাবের বেলায় দেখা গেছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে আসার ফলে পূর্ব বাংলা প্রথমবারের মতো একটি পৃথক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক একক হিসেবে নিজস্ব সীমানা পায়। ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং তার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা গড়ে ওঠে। পরে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ভাষা-সংস্কৃতির বৈরিতায় যে স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিক-প্রশাসনিক ভিত্তিতে ভর করে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান কাঠামোই বাঙালি মুসলমানকে নিজস্ব ভূখণ্ডে রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও প্রশাসনিক একক লাভের সুযোগ করে দিয়েছিল, যা স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আবেগপ্রসূত ঘটনাটি মূলত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাবোধের অভাবের উৎকট বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাস কখনো কোনো একক আবেগ বা বাইনারি সমীকরণে চলে না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অন্যতম স্থপতি, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারত বিভক্ত হয়ে আজকের বাংলাদেশের ভৌগোলিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল। একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরোধিতা করার অর্থ এ নয় যে, ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জিন্নাহর ভূমিকা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে।
ইতিহাসবিদদের মূল্যায়নেও এ সত্য ফুটে ওঠে। ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’ গ্রন্থের লেখক স্ট্যানলি উলপার্ট : ‘খুব কম মানুষই ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেন; আরো কম মানুষ বিশ্বের মানচিত্র বদলে দেন। এবং প্রায় কেউই একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব পান না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই তিনটি কাজই করেছেন।’
দ্য সোল স্পোকসম্যান গ্রন্থের লেখক ড. আয়েশা জালালের মূল্যায়ন, ‘জিন্নাহ আসলে ভারত বিভক্ত করতে চাননি; তিনি একটি বিকেন্দ্রীভূত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের একমুখী নীতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী মনোভাব শেষ পর্যন্ত দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে।’
পাকিস্তান অ্যাজ এ পিজেন্ট ইউটোপিয়ার লেখক তাজ হাশমির মতে— ‘১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলন বাঙালি মুসলমানদের জন্য কোনো ধর্মীয় ধর্মান্ধতা ছিল না। এটি ছিল হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের শোষণ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আর্থসামাজিক আন্দোলন। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে বাঙালি মুসলমানরা একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত ও রাজনৈতিক কেন্দ্র (ঢাকা) লাভ করেছিল, যা ১৯৭১ সালের ভিত্তি স্থাপন করে।’
‘পাকিস্তান : ফেইলুর ইন ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশন’ বইয়ের লেখক ড. রওনক জাহান মত হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তান নামে পৃথক প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার ফলে বাঙালি নেতৃত্ব স্বাধিকার আন্দোলন পরিচালনা করতে পেরেছিল। অখণ্ড ভারতের অধীনে থাকলে এমন জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হতো।’
‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইয়ের লেখক ও বিশিষ্ট বামতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের মতে, ‘১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু ও জমিদার শ্রেণীর অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা। কংগ্রেস ও উচ্চবর্ণের প্রবল বিরোধিতা বাঙালি মুসলমানদের বোঝাতে পেরেছিল যে, অখণ্ড বাংলায় তাদের বিকাশ অসম্ভব; যার স্বাভাবিক পরিণতি ছিল মুসলিম রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যবাদ।’
অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদের মূল্যায়ন— ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ১৯৪৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজ যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও নিজস্ব ভূখণ্ডের অধিকার লাভ করেছিল, তা-ই ক্রমান্বয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপ নেয়।’
ইতিহাসবিদদের এই মূল্যায়ন থেকে স্পষ্ট, মুক্তচিন্তা ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রস্থল ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করা এক ধরনের ঐতিহাসিক অসচেতনতার বহিঃপ্রকাশ। কোনো ব্যক্তির ছবি ভেঙে ফেলা বা মুছে ফেলার চেষ্টা দিয়ে তার ঐতিহাসিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। জিন্নাহর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা ভাষার ক্ষেত্রে যে নীতি তিনি নিয়েছিলেন তা ইতিহাস তার নিজের নিয়মে বিচার করবে; কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার সস্তা চেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
ইতিহাস এক নিরবচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্ম এবং একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, এগুলো— একই রাজনৈতিক মহাকাব্যের একেকটি ধারাবাহিক অধ্যায়। উচ্চবর্ণের হিন্দুশ্রেণী ও কংগ্রেসের রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। আর সেই পাকিস্তান কাঠামোর মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান তাদের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা লাভ করে, যা আজকের সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
সর্বশেষে বলা যায়, জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর বা পাকিস্তান আন্দোলনের গুরুত্বকে খাটো করে দেখা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের নিজেদের ঐতিহাসিক গোড়াপত্তন অস্বীকার করার নামান্তর। ইতিহাসের ভুল পাঠের প্রবণতা আমাদের আত্মমর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com







