
ডাকসুর বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন সাহসী ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। চব্বিশের পর তার খুলে দেয়া দরজা থেকে শুরু হয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা। এর ধারাবাহিকতায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর গঠিত হয় গণতান্ত্রিক সরকার।
ডাকসু নির্বাচন সরাসরি জাতীয় নির্বাচন ডেকে আনেনি, এটা সত্য; কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্যও অস্বীকার করার উপায় নেই— গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করতে হয় সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও। বিশ্ববিদ্যালয় সেই চর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখা গেছে সামনের সারিতে— ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্ত শাসন আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের বিপ্লব।
২০২৪ সালে এখান থেকে শুরু হয়েছিল কোটাবিরোধী আন্দোলন। সেই আন্দোলন পরিণত হয় বিপ্লবে। অবসান ঘটে ফ্যাসিবাদী রেজিমের। এরপর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডাকসুর আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়। সেই তীব্রতা ছড়িয়ে যায় রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা হবে, এর প্রভাব জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও তত বাড়বে। এখান থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসক, আইনজীবী, গবেষক, রাজনীতিক ও নাগরিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। তারা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখে বড় হন, যে ধরনের নেতৃত্ব ও জবাবদিহির অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, পরবর্তী জীবনে তার কিছু ছাপ সমাজে পড়ে।
চব্বিশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেমন ছিল, তা সবার জানা। গণরুম, গেস্টরুম কালচার ছিল। এতে শিক্ষার্থীদের সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতাদের অনুগত হয়ে থাকতে হতো। পড়ালেখা রেখে মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হতো। ‘শিবির’ তকমা দিয়ে নির্যাতন করা হতো শিক্ষার্থীদের। চব্বিশের পর সেই কালচারের পরিবর্তন হয়েছে। গেস্টরুম, গণরুম কালচার ছাড়াও যে ছাত্ররাজনীতি সম্ভব, তা দেখেছেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বেড়েছে রাজনীতিক সচেতনতা, প্রশ্ন করার প্রবণতা। ডাকসুর নির্বাচিত নেতাদের দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে।
ডাকসু নেতারা তাদের এক বছরের কর্মকাণ্ডের যে হিসাব দিয়েছেন, সেখানে পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং আইনি সহায়তার কথা আছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এক বছরে চার শতাধিক শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা, হলের পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করা হয়েছে।
এসব কাজের প্রতিটি সফল হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলাদা মূল্যায়ন হতে পারে। তাদের কাজে প্রশাসন অসহযোগিতা করেছে, সেই অভিযোগও করেছেন ডাকসু নেতারা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কিভাবে ভোটারদের কাছে ফিরে যাবেন। কাজের হিসাব দেবেন। সেই সংস্কৃতি তৈরি হওয়া।
১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান ডাকসু কমিটির এক বছর মেয়াদ শেষ হয়েছে; কিন্তু নতুন নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। নির্বাচন হবে বলে আশ্বাস দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন; কিন্তু কবে হবে তা কেউ জানেন না। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নেতারা সর্বোচ্চ আরো ৯০ দিন দায়িত্বে থাকতে পারবেন; কিন্তু এই অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকতে চান না বলে ঘোষণা দিয়েছেন ডাকসু নেতারা। তফসিল ঘোষণা হলে ডাকসু ভবন ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন তারা। মূলত ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হোক, এটাই তাদেরসহ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।
স্মরণে রাখা দরকার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হয় না। শুধু একটা নির্বাচন আয়োজন করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যায় না। নির্বাচন হতে হয় নিয়মিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। নির্বাচিত প্রতিনিধিকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হয়। নির্বাচন নিয়মিত হলে প্রতিনিধিদের মধ্যে জবাবদিহির ভয় থাকে। কারণ মেয়াদ শেষ হলে তাদের আবার সাধারণের কাতারে ফিরে যেতে হবে। নতুন নেতৃত্ব আসবে, পুরনো নেতৃত্ব বিদায় নেবে। পরাজিত পক্ষও ফল মেনে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হবে। এই ধারাবাহিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ফ্যাসিবাদ-উত্তর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক মিশন এই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত এবং প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সাথে কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, ভোটারকে চাপ প্রয়োগ, ভোট কেনার চেষ্টা এবং পর্যবেক্ষকদের কাজের ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে।
নির্বাচন কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলো, ভোটার কতটা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারলেন, প্রার্থীরা কতটা সমান সুযোগ পেলেন, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করল, গণনা ও ফল প্রকাশ কতটা স্বচ্ছ হলো এবং পরাজিত পক্ষ ফল ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কতটা মেনে নিলো— সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনী সংস্কৃতি তৈরি হয়।
গত সংসদ নির্বাচনে ফল ঘোষণার পরপর অনেক পরাজিত প্রার্থীকে দেখা গেছে বিজয়ীদের অভিনন্দন জানাতে। নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির; কিন্তু তিনি ভোটের হিসাবে হেরে যান। ফল পাওয়ার পরপরই বিজয়ী প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে স্ট্যাটাস দেন শিশির মনির। এটি বাংলাদেশর গণতন্ত্রে চমৎকার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। এভাবে একের পর এক উদাহরণ তৈরি করতে পারলে একসময় গণতন্ত্রের পরীক্ষায় আমরা স্থায়ীভাবে উতরে যেতে পারব।
এখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরো একটি পরীক্ষা। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এ নির্বাচনের শিকড় জড়িয়ে আছে প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন আর উপজেলায়। বাংলাদেশের গ্রাম্য রাজনীতি বা লোকাচারের জটিল মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আবুল মনসুর আহমেদের রচনা ‘ভিলেজ পলিটিক্স’-এর কথা বলতে হয়। এতে তিনি গ্রামে ক্ষমতার দাপট, মিথ্যা দলাদলি, হিংসা আর সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের চিত্র তুলে এনেছেন।
গ্রামীণ জনপদে ‘ভিলেজ পলিটিক্স’-এর কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হিংসাত্মক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সামনের নির্বাচনে এই ‘পলিটিক্স’ সামাল দেয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা, স্থানীয় প্রভাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং বহু বছরের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ। ফলে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে সঙ্ঘাত অনেকসময় ব্যক্তিগত হয়ে উঠতে পারে। সেই বাস্তবতায় এবারের স্থানীয় নির্বাচনে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করে নতুন সংস্কৃতি তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ভোটারদের দায়িত্বও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভোটারা যদি প্রার্থীর ব্যক্তিগত প্রভাব, আত্মীয়তা, ভয় কিংবা সাময়িক সুবিধার বাইরে গিয়ে তার পরিকল্পনা ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করেন, তাহলে স্থানীয় নির্বাচনও ধীরে ধীরে নীতিনির্ভর হতে পারে। ভোটারদের পুরো মেয়াদজুড়ে একজন নাগরিক হিসেবে সক্রিয় থাকতে হবে।
চ্যালেঞ্জ যত বড় হোক, ঠিকঠাকমতো এগিয়ে যেতে পারলে সেটি সামাল দেয়া অসম্ভব নয়। ওই যে শিশির মনিরের উদাহরণ, ডাকসুর উদাহরণ। এসব উদাহরণ সামনে রেখে এগিয়ে যেতে পারলে ধীরে ধীরে জটিলতা কাটতে শুরু করবে। জাতীয় নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক চর্চাকে মানুষের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ স্থানীয় নির্বাচন। এর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। দায়িত্ব আছে প্রশাসন, প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং ভোটারদের। সবার দায়িত্ব এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত হবে। প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফল নিয়ে বিরোধের সাংবিধানিক ও আইনগত পথ খোলা থাকতে হবে।
এ নির্বাচনে প্রার্থীরা চাইলে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেবেন, কিভাবে অর্থ খরচ করবেন, নাগরিকদের অভিযোগ কিভাবে শুনবেন— সবকিছুর স্পষ্ট পরিকল্পনা হাজির করতে পারেন ভোটারদের সামনে। এতে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেয়া সহজ হবে ভোটারদের। সেই সাথে নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সাথে জবাবদিহির প্রশ্নটি যুক্ত থাকবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নির্বাচন কমিশন। অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটনির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের সাহসিকতা, নিরপেক্ষতা এবং আইন প্রয়োগের সক্ষমতায়। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে এবং শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ করতে পারলে নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। আমাদের নির্বাচন কমিশনকেও সেই ভূমিকা পালন করতে হবে।
মনোনয়ন, প্রচার, ভোট গ্রহণ, ভোট গণনা, ফল ঘোষণা— প্রতিটি ধাপে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী প্রার্থী কিংবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠী যেন প্রশাসন বা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা-ও নিশ্চিত করা জরুরি।
এ নির্বাচনে অবশ্যই জনমতের সঠিক প্রতিফলন তুলে আনতে হবে। না হয় নতুন করে জেগে ওঠা গণতন্ত্র ফের কফিনে বন্দী হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। গণতন্ত্র আবার যদি কফিনে যায়, সেই কফিনে পেরেক মেরে দিতে দিল্লিতে বসে হাতুড়ি হাতে অপেক্ষা করছেন ‘তিনি’।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত







