
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীরা বর্তমানে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর সম্প্রতি দেশটিতে আবারো ভয়াবহ সঙ্ঘাত শুরু হলে হুথিরা সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখতে সৌদি আরব ইয়েমেনে ১০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের সীমান্ত এলাকা ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ড ও বেশ কিছু সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে। হুথিদের এই দ্রুত সফলতার একটি বড় কারণ হলো সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন। সরকারি বাহিনী যদি পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা আঘাত হানে, তবে হুথিদের এই অগ্রযাত্রা থমকে যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে, হুথিদের আকস্মিক ঝড়ের গতির আক্রমণ ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে নতুন করে এক ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে সেপ্টেম্বর মাসেই এ পর্যন্ত প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বাব আল-মানদাব প্রণালী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও অন্য বৈশ্বিক শক্তিগুলো হুথিদের রুখে দিতে বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
ইরান যুদ্ধের মোড়
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের এই অগ্রযাত্রা চলমান ‘ইরান যুদ্ধের’ মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়ার মতো বিশাল ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করেছে। লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বাব আল-মানদাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে হুথিরা তেহরানকে এমন এক অনন্য সুবিধা এনে দিয়েছে, যা এই যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যেই অবরুদ্ধ ও চরম সঙ্কটের মুখে রয়েছে। এখন হুথিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর, পেরিম দ্বীপসহ ছোট ছোট কয়েকটি দ্বীপ দখল করায় বিশ্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদাব প্রণালীও ইরানের অক্ষের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এর ফলে ইরান ও তার মিত্ররা চাইলে এখন একই সাথে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের দু’টি প্রধানতম ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রবেশদ্বার সম্পূর্ণ অচল করে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদি আরব তার তেল রফতানি সচল রাখতে বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের এই রুটটির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু হুথিরা উপকূল দখল করে সৌদি জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ ঘোষণা করায় রিয়াদের সেই বিকল্প পথও বন্ধের উপক্রম। উপরন্তু, হুথিরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই প্রতি ব্যারেলে ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি সৌদি আরবকে যুদ্ধের চেয়ে ইরানের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরে হুথিদের দমাতে হলে মার্কিন নৌবাহিনীকে সেখানে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েন করতে হবে, যা ইরানের মূল ফ্রন্ট থেকে মার্কিন মনোযোগ ও সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেবে। মধ্যপ্রাচ্যে এক সাথে দু’টি বড় ফ্রন্টে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সামরিক অগ্রগতির ফলে তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাথে যেকোনো কূটনৈতিক আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির শর্তে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। হুথিদের দমানোর বিনিময়ে ইরান নিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ অন্যান্য কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া
হুথিদের নৌ-অবরোধ এবং বাব আল-মানদাব প্রণালীর ওপর সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ ও সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানি করা পণ্যের দাম ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
লোহিত সাগরে হুথিদের অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রধানত যে ‘মুরবান ক্রুড’ আমদানি করে, তার দাম এক মাসের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলার থেকে লাফিয়ে ১১৯.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে এশিয়ার দেশগুলোতে তেল সরবরাহ করছিল। এখন হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ দেয়ায় সেই বিকল্প রুটটিও চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এর ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য এই নৌ-অবরোধ বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ইউরিয়া এবং ডিএপি সারের বড় অংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি করে। হুথিদের কারণে সারবাহী জাহাজের আগমন বিলম্বিত হচ্ছে এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে লোহিত সাগরের পরিবর্তে জাহাজগুলোকে এখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশের ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এর ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপ বা আমেরিকাগামী জাহাজগুলোর যাতায়াত দূরত্ব প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার বেড়ে গেছে। যাতায়াতের সময় ১৫ থেকে ৩০ দিন বেশি লাগছে। অতিরিক্ত জ্বালানি ও বীমা প্রিমিয়াম যুক্ত হওয়ায় জাহাজের ভাড়া ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং মোট রফতানির (প্রধানত তৈরী পোশাক) প্রায় ৭৭ শতাংশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল রুটের ওপর নির্ভরশীল। হুথিদের অবরোধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে সময়মতো পোশাক পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্রেতারা যথাসময়ে পণ্য না পেলে অর্ডার বাতিল করতে পারেন অথবা আকাশপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য করতে পারেন, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।
বড় বিপর্যয়
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যে প্রায় অবরুদ্ধ বা চরম সঙ্কটের মুখে রয়েছে। এই অবস্থায় বাব আল মানদাবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব হলো ইরান ও তার মিত্রদের হাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের দু’টি প্রধান ‘চোকপয়েন্ট’ (হরমুজ ও বাব আল-মানদাব) এর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক প্রকার জিম্মি করার ক্ষমতা পেয়েছে।
মক্কা জোট
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ‘মক্কা জোট’ সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে নামবে কি না, তা নির্ভর করছে হুথিদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা এই নতুন জোটের জন্য প্রথম বড় ‘অগ্নিপরীক্ষা’। এই জোট সরাসরি ইয়েমেনে সেনা পাঠাবে না, কারণ চুক্তিটি মূলত নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। হুথিরা যখন সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তীব্র করেছে তখন জোটের বাধ্যবাধকতা সক্রিয় হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের সঙ্ঘাত যদি সৌদি আরবের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে বা উসকানিমূলক আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে মক্কা চুক্তি নিশ্চিতভাবে কার্যকর হবে।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো ফ্রন্ট খুলতে চাচ্ছে না। হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সরাসরি বিমান সহায়তার অনুরোধ জানালেও হোয়াইট হাউজ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আমেরিকার এই পিছুটানের কারণেই সৌদি আরবের জন্য মক্কা জোটের কার্যকারিতা এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সমর্থন এখন অস্তিত্ব রক্ষার সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক নৌজোট
লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ মোকাবেলায় গঠিত আন্তর্জাতিক নৌজোটের (Multinational Maritime Defense Alliance বা MMDA) কার্যকারিতা এখন পর্যন্ত মিশ্র এবং গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হুথিদের নৌ-অবরোধ থেকে নৌপথ মুক্ত রাখতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরসহ ১৪টি দেশের সমন্বয়ে এই জোট গঠিত হয়।
এই জোটের প্রধান সফলতা হলো এটি পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। যৌথ টহল, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং উন্নত রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে জোটটি বেশ কিছু হুথি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হওয়ার হাত থেকে লোহিত সাগরের রুটটি আংশিক সচল রেখেছে। তদুপরি, রিয়াদের স্থায়ী সদর দফতর থেকে পরিচালিত এই সমন্বিত তৎপরতা সদস্য দেশগুলোর নৌবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারত্ব ও সহযোগিতা বৃদ্ধির পথ সুগম করেছে।
তবে এই জোটের সামরিক কার্যকারিতা চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে তথা হুথিদের আগ্রাসন সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে দিতে এখনো সফল হতে পারেনি। জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিজস্ব রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের এই জোটে অনুপস্থিতি এর সামগ্রিক শক্তি কিছুটা সীমিত করেছে। একই সাথে ইয়েমেনের স্থলভাগে হুথিদের ক্রমাগত সামরিক অগ্রযাত্রা এবং উপকূলীয় দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কারণে কেবল সমুদ্র থেকে বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে এই সঙ্কট সমাধান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনের ঝুঁকি ও বীমা খরচ কমানোর ক্ষেত্রে এই জোটের কার্যকারিতা এখনো প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার







