জাকসু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি নয়া দিগন্ত

৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে  ১৮ সেপ্টেম্বর। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল। বাকি পাঁচটি পদের মধ্যে দুটি পদে জাতীয় ছাত্রশক্তি, দুটি স্বতন্ত্র এবং সহসভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু জয়ী হন। ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর জিতু বিএনপিতে যোগ দেন। জাকসু নির্বাচনে পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ ও তিনটি আংশিক প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয়ী হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট। 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি। পরের বছর জাকসু নির্বাচন হয়। তখন থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে নির্বাচন হয়েছে ৯ বার। তারপর ৩৩ বছর জাকসু নির্বাচন হয়নি। দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় গত বছর দশম জাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ও আশার সঞ্চার হয়। তবে দশম শিক্ষার্থী সংসদের মেয়াদ শেষে এখন জাকসুর  প্রাপ্তি ও সফলতা ও প্রত্যাশা পূরণের পথে প্রতিবন্ধকতা  কী তা অনেকটা পরিষ্কার।  শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জাকসুর ঘোষিত ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কী কী প্রতিবন্ধকতা, কোথায় থেকে সমস্যা তৈরি হয় তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।  চলছে হিসাব-নিকাশ, কতটা পূরণ হলো। কেউ বলছেন ক্যাম্পাস-সংশ্লিষ্ট ৪৬টি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মধ্যে ১৩টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩০টি বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। দুটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বাকি একটি প্রতিশ্রুতি স্বাস্থ্যবীমা আগেই চালু হয়েছে। যে ৩০টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে, সেগুলো মূলত কমিটি গঠন ও কমিটির সুপারিশ সিন্ডিকেটে উত্থাপনের অপেক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। আর কোনো কোনো প্রতিশ্রুতি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনায় আছে।  এর মধ্যে জাকসুর এক বছর  মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে জাকসুর জিএস ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম  বলেন, ইশতেহারে দেয়া বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে। যেগুলো বাকি আছে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কিছু কাজ হতে বিলম্ব হয়েছে।  
ইশতেহারে ছিল শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি। জাকসু  এক বছরে যেসব সংস্কার ও পরিবর্তন ও কল্যাণমূলক কাজ করেছে গত ১০ বছরে তা হয়নি। জাকসু শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কার এনেছে। থিসিসে বরাদ্দ ৭৫০ টাকা থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি করে ৭,৫০০ টাকা করায় জাকসু ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া জাকসু প্রায় ২,০০০ এর বেশি শিক্ষার্থীকে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেয়। এই কর্মসূচির মধ্যে ছিল গবেষণা, আইটি, সফট স্কিল, ল্যাঙ্গুয়েজ এবং আইইএলটিএস ট্রেনিং প্রোগ্রাম। সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার সংস্কারে ২৫ লাখ টাকার বরাদ্দের  ব্যবস্থা করা। জাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট, পরিবহন খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। যোগাযোগে নতুন বাসের ট্রিপ বাড়ানো, নতুন বাসসংখ্যা বৃদ্ধি, একই সাথে শিক্ষার্থীদের জন্য লাইভ ট্র্যাকিং অ্যাপস চালু করা হয়েছে ।  র‌্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস গড়া জাকসুর আর একটি সফলতা। প্রতিটি র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে। জাবির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি র‌্যাগিংয়ের বিচার নিষ্পত্তি করা হয়।  এ ছাড়া  জাকসু সারা বছর মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানে ছিল। ক্যাম্পাসে জাকসুর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করতে পারা এবং হলে প্রথম দিন সিট পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে জাকসু  কাজ করেছে। জাকসুর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি হলে কম্পিউটার বিতরণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি, প্রেস ক্লাবকেও কম্পিউটার উপহার দেয়া হয়েছে।     
শুধু তাই নয়, জাকসুর  মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি হলে ফিল্টার দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি হলে আট লাখ টাকা ব্যয়ে রিলিজিয়াস লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কল্যাণে টিউশন প্রোভাইডিং ও রক্তদানের অ্যাপ চালু করা হয়। সেই সাথে কেনাবেচার একটা অ্যাপ চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি স্থানে ফ্রি ওয়াইফাই জোন  চালু করা হয়েছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে । বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন  থেকে আশানুরূপ  সহযোগিতা না পেলেও মাত্র ১৫ লাখ টাকা বাজেটে জাকসু  যে কাজ করেছে যেটি অভূতপূর্ব। বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাকসু যে কাজ করেছে তা কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
জাকসুর এক বছর মেয়াদ শেষে  ঘোষিত প্রতিশ্রুতির  বাস্তবায়ন কতটুকু সফলতা হয়েছে, কী কী প্রতিবন্ধকতা আছে তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এ বিষয়ে জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের কিছু মৌলিক সমস্যা ছিল— অটোমেশন, একাডেমিক সংস্কার, ট্রান্সপোর্টেশনের সুবিধা এবং একই সাথে মেডিক্যালের একটা সংস্কার। এই চার জায়গায় জাকসু তার কন্ট্রিবিউশন রেখেছে। তবে নারী শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কিছু কাজ হলেও অনেক বড় প্রকল্প থমকে গেছে বাস্তবায়নের অভাবে। জাকসুর এক কার্যকরী সদস্য থেকে জানা যায়, প্রতিটি খাতে কাজগুলো আটকাচ্ছিল। কখনো প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব। কখনো বাজেট ঘাটতি। যখন নির্বাচিত সরকার এলো, তখন দেখা গেল যে দলীয়করণ হচ্ছে খুব জোরে। জাকসুর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে।  জাকসু সীমিত রিসোর্সের মধ্যে  সর্বোচ্চ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব বিষয় নিশ্চয় মূল্যায়ন করবেন। এগুলোর  ভালো-মন্দ বিচার করবেন। নির্বাচনে জয়ী ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস মাজহারুল ইসলামসহ অন্য সদস্যদের স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা শিক্ষার্থীদের নজর কেড়েছে।  তারা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া, মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন; যা আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরিতে উদাহরণ হিসাবে থাকবে বলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মনে করেন।
ছাত্র সংসদের সাফল্য মাপা উচিত কতজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি হয়েছে। তবে আশার কথা— জাকসুর অন্যতম একটি অর্জন হলো ৩৩ বছর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে একটি নির্বাচিত ছাত্র সংসদের পূর্ণ মেয়াদে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা। সহনশীলতা, পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, পরমতসহিষ্ণুতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করা ও ক্যাম্পাসের  শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখাও ছিল জাকসুর সাফল্যের সূচক। সব ছাত্রসংগঠন আগামীতেও যেন ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে এটিই সবার  প্রত্যাশা। 
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার 
ইমেইল : main706@gmail.com